জমির ভুয়া দলিল বাতিলের নিয়ম

জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে দলিলই মালিকানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। কিন্তু প্রতারণার উদ্দেশ্যে কেউ যদি অন্যের জমির ভুয়া বা জাল দলিল তৈরি করে মালিকানা দাবি করেন, দখল নেওয়ার চেষ্টা করেন কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে দলিল সম্পাদন করিয়ে নেন, তাহলে প্রকৃত মালিকের জন্য বিষয়টি বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু দলিলটি ভুয়া দাবি করলেই হবে না, আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেটি বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে জাল দলিল তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া যেতে পারে ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা।

কোনো মিথ্যা, বানোয়াট বা জাল দলিলের কারণে কারও জমির স্বত্ব বা স্বার্থ বিঘ্নিত হলে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে দলিল বাতিলের প্রতিকার চাওয়া যায়। আবার জাল দলিল তৈরি বা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতেও মামলা করা সম্ভব। জমির ভুয়া দলিল বাতিলের ক্ষেত্রে কীভাবে আইনি প্রতিকার পাওয়া যায়, তা জানা থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন।
দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মামলা
কেউ যদি প্রতারণার উদ্দেশ্যে আপনার জমির ভুয়া, মিথ্যা কিংবা জাল দলিল তৈরি করে আপনার জমির স্বত্ব দাবি করেন বা দখল করতে চান, কিংবা যার জমি বিক্রি করার অধিকার নেই, তিনি যদি ভুয়া দলিল তৈরি করেন অথবা প্রতারণার মাধ্যমে দলিল সম্পাদন করিয়ে নেন, তাহলে ওই দলিলের কারণে আপনার স্বত্ব বা স্বার্থ বিঘ্নিত হলে দলিল বাতিলের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করে প্রতিকার নিতে পারেন।
এ ছাড়া ফৌজদারি আদালতেও ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে মামলা করে প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে জাল দলিল তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭ থেকে ৪৭৩ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধারায় মামলা করা যায়।
দেওয়ানি আদালতে মামলার ক্ষেত্রে জাল দলিলটি আদালতে উপস্থাপন করে সেটি ভুয়া প্রমাণ করার উদ্যোগ নিতে হয়। আদালত দলিল বাতিলের আদেশ বা রায় দিলে ডিক্রির একটি কপি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠাতে হবে। এরপর ওই কপির ভিত্তিতে রেজিস্ট্রি অফিস দলিল বাতিলের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বালাম বইতে লিপিবদ্ধ করে রাখবে।
কখন দলিল বাতিলের মামলা করা যায়
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। আমাদের দেশে প্রচলিত সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় বলা আছে, কোনো দলিলকে বাতিল বা বাতিলযোগ্য বলে মনে হলে এবং ওই ভুয়া দলিল বাতিল না হলে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে দলিল বাতিলের ঘোষণার জন্য মামলা করা যায়।
এ আইনের ৪০ ধারা অনুসারে প্রতারণার উদ্দেশ্যে আংশিক দলিল সৃষ্টি হলে আংশিক বাতিলের মামলাও করা যাবে। আর কেউ যদি ভুয়া দলিলের কারণে জমি থেকে বেদখল হয়ে যান, তাহলে দলিল বাতিলের সঙ্গে সম্পত্তির দখল পাওয়ার মামলাও করতে পারবেন।
তবে এক্ষেত্রে তামাদি আইনের ৯১ নম্বর অনুচ্ছেদের বিষয়টি মনে রাখা জরুরি। জাল দলিল উদঘাটনের বিষয়টি যেদিন জানা যাবে, সেই জানার তারিখ থেকে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে ওই দলিল বাতিলের জন্য মামলা করতে হবে।
তবে এই সময় পার হয়ে গেলেও নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুসারে ডিক্লারেশন স্যুট বা ঘোষণামূলক মোকদ্দমা দায়ের করে প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। বাদী যদি নালিশি ভূমিতে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে বেদখল হন, তাহলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারানুযায়ী স্বত্বসহ খাস দখলের মামলা করতে পারেন। একই সঙ্গে আরজির প্রার্থনার দফায় দলিলটি বাতিলের আবেদন করা যায়। এর পাশাপাশি ৪২ ধারায় পৃথক ঘোষণাও চাওয়া যেতে পারে।
আদালত মনে করলে জাল দলিল সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের নির্দেশও দিতে পারেন। তবে এ ধরনের মামলায় প্রমাণের দায়িত্ব বাদীর। যিনি কোনো দলিলকে জাল বা জোরপূর্বক সম্পাদিত বলে দাবি করবেন, তাকে তার দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। এ বিষয়ে সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারায় বিধান রয়েছে। এ নিয়ে ২৬ ডিএলআরের ৩৯২ পৃষ্ঠায় উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তও রয়েছে।
শুধু দেওয়ানি আদালতেই নয়, ফৌজদারি মামলাও করা যায়
জাল দলিল তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে মামলা করা যায়। সংশ্লিষ্ট আমলী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক চাইলে মামলাটি সরাসরি আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিতে পারেন। আবার মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশের বিভিন্ন সংস্থার কাছে অথবা সরকারি কোনো কর্মকর্তার কাছেও পাঠাতে পারেন।
তদন্তে দলিল ভুয়া প্রমাণিত হলে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দিতে পারেন। তবে ভুয়া দলিলটি বাতিল করতে হলে দেওয়ানি আদালতেই যেতে হবে।
অর্থাৎ জাল দলিলের ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির উদ্যোগ নেওয়া গেলেও শুধু ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে দলিল বাতিল করা যাবে না। দলিল বাতিলের জন্য দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।
একই ঘটনায় দুই ধরনের মামলাও হতে পারে
যে ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় অপরাধ সংঘটিত হয়, সে ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি দুই আদালতেই দুই ধরনের মামলা চলতে পারে। এক্ষেত্রে আইনগতভাবে কোনো বাধা নেই। এ বিষয়ে ৫৭ ডিএলআরের ৭২৭ পৃষ্ঠায় উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
কাজেই কেউ জাল দলিল তৈরি করে জমির মালিকানা দাবি করলে বা প্রতারণার মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি একদিকে ফৌজদারি আদালতে মামলা করে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে পারেন, অন্যদিকে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে ভুয়া দলিল বাতিলের প্রতিকার চাইতে পারেন।
জমির ভুয়া বা জাল দলিল তৈরি হলে বিষয়টি অবহেলা করার সুযোগ নেই। এমন দলিলের কারণে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পারলে দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিস্থিতি অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিল ও দখল ফিরে পাওয়ার মামলা করার পাশাপাশি জাল দলিল তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা যেতে পারে। তবে মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই নিরাপদ।
লেখকের পরিচয়
সাইফুল ইসলাম ফকির
এলএলবি, এলএলএম
এমএ (তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


