অবাধ্য সন্তানকে ত্যাজ্য ঘোষণা, সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে আইন কী বলে
-8139ea-720x405.webp)
আমাদের সমাজে রাগের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করা কিংবা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার হুমকি একটি বহুল প্রচলিত ঘটনা। কিন্তু আইনগতভাবে ‘ত্যাজ্য’ বলতে আদৌ কি কিছু আছে? নাকি এটি কেবলই লোকমুখে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা?
জমি-জমার চূড়ান্ত মালিকানা পেতে আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৮ ও ৪৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘অবাধ্য সন্তানকে ত্যাজ্য ঘোষণা করলেই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয় কি-না?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

বাস্তব জীবনের একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। করিম ও রুনা একে অপরকে ভালোবাসে। নিজেদের ভালোবাসাকে পরিণতি দিতে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। দেশের আইন অনুযায়ী সাবালক ও সাবালিকা হিসেবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। সেই অধিকারের ভিত্তিতে তারা স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। তবে বিপত্তি ঘটে দুই পরিবারকে ঘিরে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উভয় পরিবারের অভিভাবক ও আত্মীয়স্বজন তাদের ‘ত্যাজ্য পুত্র-কন্যা’ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার কথা জানান। এমন দৃশ্য আমাদের সমাজে বেশ পরিচিত। এমনকি অনেকে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা তৈরি করে সন্তানকে ত্যাজ্য ঘোষণা করার মতো ব্যর্থ চেষ্টাও করে থাকেন।
মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান
মুসলিম পারিবারিক আইনে স্পষ্ট বলা রয়েছে কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন। এই আইন অনুযায়ী, একজন সন্তান জন্মসূত্রে পরিবারের সম্পত্তিতে অধিকার অর্জন করেন এবং এই অধিকার থেকে তাকে কোনোভাবেই বঞ্চিত করা যায় না। তবে কোনো মা-বাবা চাইলে জীবদ্দশায় দান, বিক্রয় বা উইলের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তি যে কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। তবে উইলের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, মুসলিম আইনে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল করা যায় না।
এই উইল কার্যকর হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর পর। জীবদ্দশায় কোনো মা-বাবা যদি নিয়ম মেনে অন্য কাউকে সম্পত্তি দান বা বিক্রি করে না যান, তবে মৃত্যুর পর তাদের সন্তানেরা অবধারিতভাবেই সেই রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশীদার হবেন - তা অতীতে যতই ত্যাজ্য ঘোষণা দেওয়া হোক না কেন।
আদালতে বাটোয়ারা মামলা ও আইনি প্রতিকার
আইন বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেকোনো দলিল সম্পাদন কিংবা হলফনামার মাধ্যমে সন্তানকে ত্যাজ্য ঘোষণা করা সম্পূর্ণ অচল এবং তা আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করার কোনো সুযোগ নেই। মা-বাবা ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করে গেছেন - এই অজুহাতে অন্য অংশীদারেরা যদি কোনো সন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেন, তবে ভুক্তভোগী সন্তান আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। এক্ষেত্রে ১৮৯৩ সালের বাটোয়ারা আইন অনুযায়ী মাত্র ৫০০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা (বণ্টন) মামলা করার সুযোগ রয়েছে।
সুতরাং, কোনো মা-বাবা যদি অবাধ্য সন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতেই চান, তবে জীবদ্দশাতেই সেই সম্পত্তি অন্য কারও নামে দান বা বিক্রি করে দখল ছেড়ে দিতে হবে। তা না করে মা-বাবা নিজের নামে যেটুকু সম্পত্তিই রেখে যাবেন, মৃত্যুর পর তাদের বৈধ উত্তরাধিকারীরা আইনত তার অংশীদার হবেন।
উত্তরাধিকার হারানোর ব্যতিক্রমী কারণ
আইনে কিছু নির্দিষ্ট অপরাধ বা কারণ ছাড়া উত্তরাধিকার অধিকার রদ করা যায় না।
মুসলিম আইন: কোনো ব্যক্তি যদি সম্পত্তির মূল মালিককে ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত হত্যা করে (নরহত্যাজনিত অপরাধ) কিংবা ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ (ধর্মান্তরিত) করে, তবেই কেবল সে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
হিন্দু আইন: এই আইনে ধর্মান্তরিত হওয়া, দুশ্চরিত্র হওয়া, শারীরিক বা মানসিকভাবে অসমর্থ হওয়া, হত্যাকারী হওয়া কিংবা সন্ন্যাস গ্রহণ করার মতো ক্ষেত্রে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
অতএব, আবেগ বা রাগের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করার আইনি কোনো ভিত্তি নেই। লোকমুখে প্রচলিত এই ধারণাটি কেবলই একটি সামাজিক বিভ্রান্তি। সন্তানের আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন করে অভিভাবকরা সাময়িক তৃপ্তি পেতে পারেন, তবে আদালতের কাঠগড়ায় এমন ঘোষণার মূল্য শূন্য। আইন অনুযায়ী, সন্তান তার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার থেকে কখনোই স্বাভাবিক নিয়মে বঞ্চিত হয় না। তাই বিভ্রান্তিকর হলফনামা বা প্রতিবেশীদের ভুল পরামর্শে কান না দিয়ে, সম্পত্তি সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপে মা-বাবা ও সন্তান - উভয় পক্ষকেই প্রচলিত ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইনের সুস্পষ্ট বিধান জেনে পথ চলাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


