logo
ধর্ষণ-হত্যা

সাক্ষ্যগ্রহণে যে বর্ণনা দিলেন রামিসার বাবা-মা

সাক্ষ্যগ্রহণে যে বর্ণনা দিলেন রামিসার বাবা-মা
ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভিন বেগম ও বোন রাইসা আক্তারসহ ১০ জন।

মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে সাক্ষ্য দেন তারা।

রামিসার বাবা বলেন, ৯ মে সকাল সাড়ে ৯টায় আমি অফিসে যাওয়ার উদ্দেশে বের হই। অফিস বনানীর কাকলী। ১০টা থেকে সোয়া ১০টার মধ্যে আমার স্ত্রী পারভীনা আক্তারের ফোন পাই। আমাকে বাসায় আসতে বলে। বাসায় এসে দেখি মেইন গেটের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। এরপর আমি দৌড় দিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে যাই। সেখানেও অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে।

তিনি বলেন, আমার স্ত্রী পাশের ফ্ল্যাটেরদরজার কড়া নাড়ছে। সবাই মিলে ডাকাডাকি করছে। তখন আমি নিচে গিয়ে একটা হাতুড়ি আনি। ডোর লক হাতুড়ি দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করি। তাতে লকটা ভেঙে খুলে যায়। সবাই মিলে পুরো দরজাটাই ভেঙে ফেলি। পরে সবাই ভেতরে যাই। ঢুকেই দেখি ফ্ল্যাটের কমন রুমের ফ্লোরে সামান্য অল্প একটু রক্ত পড়ে রয়েছে। তখন স্বপ্না চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু বলছিল না। একপর্যায়ে তাদের বেডরুমের দরজা সবাই মিলে ভাঙি। টয়লেটে বালতিতে মেয়ের বিচ্ছিন্ন মাথা দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর কী হয়, আর কিছু বলতে পারি না।

রামিসার মা পারভিন বেগম বলেন, ‘আনুমানিক ১০টা, আমি তখন রান্না করছিলাম। দুই মেয়ের চাচার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। গিয়েছে কি না আমি বুঝতে পারিনি। এরপর রান্নাঘর থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। আমি মনে করি, পাশের ফ্ল্যাটে কোনো বাচ্চা হয়তো চিৎকার দিচ্ছে। আমি অপেক্ষা করছি রামিসা এখনো আসছে না কেন। কখন আসবে। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে একাই বাসায় ফিরে। আমি ওকে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, রামিসা আমার সঙ্গে যায়নি।

তিনি বলেন, পরে আশপাশের রামিসার খোঁজ করা শুরু করি। নিচে একটা অফিসের কাজ চলছিল। সেখানে ঢুকে দেখি, মেয়ে আছে কি না। এরপর দোতলায় খুঁজি। সেখানেও নেই। আমার পাশের ফ্ল্যাটে দরজায় কড়া নাড়ি। কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। হঠাৎ চোখ পড়ে দরজার সামনে মেয়ের একটা স্যান্ডেল। তখন আমার ভাবনায় আসে, মেয়েকে কি এখানে আটকে রেখছে। আমার শব্দ শুনে পাঁচতলা থেকে আসমা নামের এক নারী নেমে আসেন। ধীরে ধীরে আশপাশের লোকজনও চলে আসে। তাদেরকে জানাই রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার স্বামীকেও ফোন দেই। অনেকে চেয়ার নিয়ে ওপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না।

পারভিন বেগম বলেন, পরে দরজা ভেঙে সবাই ভেতরে ঢুকি। তখন রাজু নামের একটি ছেলে ভিডিও করছিল। স্বপ্না হাঁটাহাঁটি করছিল। বেডরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলে বাথরুমে অসংখ্য রক্ত দেখতেই পাই। এরপর রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথাও দেখি। পুলিশ এসে রামিসার জামা ও মরদেহ উদ্ধার করে। স্বপ্নাকে আমি অনেকবার বলেছি, বোন দরজাটা খুইলা দে, খুইলা দে। কিন্তু ও খোলে নাই। আমি ওকে কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি। উপস্থিত লোকজনই ওকে প্রশ্ন করেছে। পরে আমি তাদের কাছ থেকে শুনতে পাই, সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালাইছে।

এদিন সকাল পৌনে ৯টায় আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়।

সোমবার (১ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন গ্রেপ্তার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ২৪ মে পুলিশ প্রতিবেদন আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের জন্য ১ জুন দিন ধার্য করা হয়েছিল।

মামলায় বলা হয়েছে, নিহত রামিসা রাজধানীর পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে বাসা থেকে বের হয়। কিছুক্ষণ পর তাকে খুঁজতে থাকেন তার মা। পরে একপর্যায়ে প্রতিবেশী একটি ফ্ল্যাটের সামনে তার একটি স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হয় পরিবারের সদস্যদের।

এরপর দরজায় ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে সোহেল রানার শোয়ার ঘরে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমে একটি বালতির ভেতর তার মাথা পাওয়া যায় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনার খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা দায়ের করেন নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। গ্রেপ্তারের পর ২০ মে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সোহেল রানা।