চুক্তিমূলে কবলা পেতে বা চুক্তি বাস্তবায়নে যে মামলা করবেন
-18f677-720x405.webp)
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের পর তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে কীভাবে তাকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করা যায়, অর্থাৎ এনফোর্সমেন্ট অব কনট্রাক্ট বিষয়ে আইনে কী বলা আছে, তা জানা জরুরি। বিশেষ করে জমি বায়না করার পর বিক্রেতা জমি রেজিস্ট্রি করে না দিলে কিংবা ক্রেতা বায়নার অবশিষ্ট টাকা পরিশোধ করে জমি লিখে নিতে গড়িমসি করলে আইনি প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আপনি জমি বায়না করেছেন, কিন্তু এখন বিক্রেতা জমি রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন না, নানারকম তালবাহানা করছেন। এ ক্ষেত্রে বায়না দলিল অনুযায়ী তাকে জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে বাধ্য করা কিংবা ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়। আবার অনেকেই জানতে চান, জমির বায়নানামা হয়েছে, কিন্তু তা রেজিস্ট্রি হয়নি, শুধু স্ট্যাম্পে বায়নানামা লেখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও আইনি সমাধানের সুযোগ রয়েছে।
জমি-জমার চূড়ান্ত মালিকানা পেতে আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৩৭, ১৩৮ ও ১৩৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘চুক্তিমূলে কবলা পেতে বা চুক্তি বাস্তবায়নে কি মামলা করবেন’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

অন্যদিকে জমির বায়নানামা করার পর গ্রহীতা বাকি টাকা পরিশোধ করে জমি লিখে নিতে গড়িমসি করলে জমির দাতা চুক্তি রদ করতে পারবেন এবং ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন। ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ১২ থেকে ২১ ধারার অধীনে চুক্তিমূলে কবলা পাওয়ার মামলা করতে হয়।
চুক্তি ভঙ্গ হলে কী করবেন
জমি বায়নানামা করার পর অর্থাৎ চুক্তি সম্পাদনের পর কোনো পক্ষ যদি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বা চুক্তি অস্বীকার করে, তাহলে ভুক্তভোগী পক্ষ সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ১২ ধারা অনুযায়ী আদালতে চুক্তি প্রবলের মামলা করতে পারেন।
তবে মনে রাখতে হবে, এ ধরনের মামলা করতে হলে চুক্তি সম্পাদনের তারিখ থেকে অথবা চুক্তি অস্বীকারের তারিখ থেকে এক বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। এ আইনের ২১এ ধারার বিধান অনুসারে আদালতের মাধ্যমে চুক্তি বলবৎ করতে হলে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
১. চুক্তি বা বায়নানামাটি লিখিত ও রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। নতুবা আদালতের মাধ্যমে চুক্তি প্রবলের মামলা বলবৎ করা যাবে না।
২. বায়নার অবশিষ্ট টাকা আদালতে জমা না করলে এ মামলা দায়ের করা যাবে না।
২০০৫ সালের ১ জুলাইয়ের আগে বায়না দলিল রেজিস্ট্রি না করলেও চলত। কাজেই বায়না দলিল রেজিস্ট্রি না করলেও মামলা করে তা বলবৎ করা যেত।
বায়নানামা রেজিস্ট্রি না হলেও বিকল্প ব্যবস্থা
তবে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বায়না দলিল রেজিস্ট্রি না হলেও বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। আপনি ফৌজদারি আদালতে দণ্ডবিধি আইনে মামলাও করতে পারেন। যেমন, প্রতারণার উদ্দেশ্যে চুক্তি প্রতিপালন না করা হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা করা যায়। এ মামলায় আসামিকে জেল ও জরিমানা দেওয়া যেতে পারে।

চুক্তি প্রবলের মামলা ছাড়াও অন্যভাবে বিভিন্ন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যেমন, দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেতে পারে।
বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হওয়া যাক। ধরুন, রহিম সাহেব করিমের কাছে ৫ বিঘা জমি বিক্রির জন্য বায়না করলেন। পরে দেখা গেল, রহিম ৪ বিঘা জমির মালিক। বাকি ১ বিঘা জমির মালিক তার ভাই কালাম। এখন দেওয়ানি আদালতে মামলা করলে আদালত ৫ বিঘা জমি করিমকে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য রায় দিতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে ৪ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য রায় দিতে পারেন এবং বাকি ১ বিঘা জমির ব্যাপারে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন।
আর চুক্তি প্রবলের মামলা করলে আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলিল রেজিস্ট্রি করিয়ে দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। আদেশ অনুযায়ী দলিল করে না দিলে আদালতের তরফ থেকে দলিল রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
চুক্তি প্রবল বা চুক্তি রদের মামলা করতে খরচ কত
এখন জানার বিষয় হলো, এ মামলা করতে কত টাকা খরচ হবে। কোর্ট ফি অ্যাক্ট, ১৮৭০-এর ৯ ধারার ১০ উপধারা অনুযায়ী, চুক্তি প্রবলের মামলায় চুক্তিকৃত পণ বা দাম অনুসারে মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে।
এখানে একটি বিষয় উভয় পক্ষেরই জেনে রাখা দরকার। চুক্তি প্রবলের জন্য যেমন মামলা করা যায়, তেমনি প্রয়োজন হলে চুক্তি রদের জন্যও মামলা করা যায়। জমির মালিক ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৫ ধারায় চুক্তি রদের মামলা করতে পারেন।
তবে এ মামলা করতে হবে বায়নানামার গ্রহীতা জমির বাকি টাকা পরিশোধ করে জমি লিখে নিতে গড়িমসি করছে, এ বিষয়টি জানার বা বুঝতে পারার তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে।
কিন্তু বর্তমান বায়নানামার সংশোধিত আইন অনুযায়ী, বায়নানামা রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে এর বায়নার মেয়াদ হবে ৬ মাস। আর মামলা দায়েরের সময় হবে আরও ৬ মাস পর। সব মিলিয়ে আপনি মামলা করার সময় পাবেন অতিরিক্ত আরও ১ বছর।

ক্রেতার ব্যর্থতার কারণে চুক্তিতে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ক্রেতা জমি কবলা রেজিস্ট্রি করে নিতে ব্যর্থ হলে চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং বায়নার টাকা বিক্রেতার অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে।
কোন আদালতে মামলা করবেন
মামলাটি করতে হয় নালিশি জমিটি যে থানার অধীনে অবস্থিত, সেই এলাকার আদালতের এখতিয়ারে। যদি বায়নানামায় বর্ণিত জমিতে একাধিক তফসিল থাকে এবং সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন থানার অধীনে হয়, তাহলে একাধিক আদালতের মধ্যে যেকোনো একটি আদালতে এ মামলা করা যায়।
কোন আদালতে মামলা করবেন, তা নির্ভর করে নালিশি সম্পত্তির মূল্যমানের ওপর। জমির মূল্যমান ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে সহকারী জজ আদালতে মামলাটি আনয়ন করতে হয়। ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এবং এর বেশি মূল্যের মোকদ্দমা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দাখিল করতে হয়। যদিও অধিক্ষেত্রের এ সংশোধনী বর্তমানে রিট মামলায় স্থগিত আছে।
কারা হবেন মামলার পক্ষ
এ মামলায় বাদী হবেন তিনি বা তারা, যারা নালিশি সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য বায়নানামা করেছেন। অর্থাৎ বায়নানামার গ্রহীতারা সবাই বাদী হবেন।
অন্যদিকে বিবাদী হবেন তিনি বা তারা, যারা বায়নানামায় স্বাক্ষর করে দাতা হিসেবে চুক্তিতে যুক্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ১৯৭২ সালে ১৪২ নম্বর অধ্যাদেশ অনুযায়ী চুক্তিমূলে কবলা পাওয়ার মামলায় সরকারকে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত করতে হয়।
একই জমি অন্যের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করলে
সর্বশেষ আরেকটি বিষয় জেনে রাখা দরকার। চুক্তি করার পর চুক্তির শর্ত পালন না করে অন্য কারও সঙ্গে একই রকমের চুক্তি সম্পাদন করলেও পরবর্তী চুক্তিটির কাজ করা থেকে বিরত রাখার জন্য দেওয়ানি আদালতে নিষেধাজ্ঞা প্রার্থনা করে দরখাস্ত করা যেতে পারে।
চুক্তি করার পর কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে বা চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে আইনগতভাবে প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। তবে চুক্তি প্রবল, চুক্তি রদ, ক্ষতিপূরণ কিংবা নিষেধাজ্ঞা, কোন প্রতিকার প্রযোজ্য হবে তা নির্ভর করবে চুক্তির ধরন, দলিলের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির ওপর। বিশেষ করে বায়নানামা রেজিস্ট্রি, অবশিষ্ট টাকা পরিশোধ এবং মামলা করার সময়সীমার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চুক্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করে মামলা করা জরুরি।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।


