আইন অনুযায়ী মায়ের সম্পত্তিতে ছেলে, মেয়ে ও স্বামীর অংশ কতটুকু জানুন

মায়ের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি সন্তানরা কারা কতটুকু পাবেন, এ নিয়ে পরিবারে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিশেষ করে ছেলে, মেয়ে ও স্বামীর মধ্যে সম্পত্তি ভাগের নিয়ম নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণাই আসলে পুরোপুরি সঠিক নয়।
ধর্মভেদে উত্তরাধিকার আইনের নিয়মও আলাদা। মুসলিম আইনে সন্তান ও স্বামীর অংশ নির্ধারণের পদ্ধতি এক রকম, আবার হিন্দু আইনে নারীর সম্পত্তির ধরন ও উত্তরাধিকারীর সম্পর্ক অনুযায়ী বণ্টনের নিয়ম ভিন্ন।
তাই মায়ের সম্পত্তিতে ছেলে, মেয়ে বা বাবার অংশ কত হবে, তা বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন এবং সম্পত্তির ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। এ সংক্রান্ত আইনি সহায়তা সম্পর্কে বই লিখেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)।
বইয়ের নাম ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৮ নম্বর পৃষ্ঠায় মুসলিম ও হিন্দু আইনে মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের মূল নিয়মগুলো কি তা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

মুসলিম আইন অনুযায়ী বণ্টন ব্যবস্থা
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তি পুরুষ নাকি নারী তা বিবেচনা করা হয় না। উভয় ক্ষেত্রেই সন্তানরা একই নিয়মে সম্পত্তির অধিকার পান। মায়ের মৃত্যুর পর তার স্বামী (সন্তানদের বাবা) দুটি নিয়মে অংশ পাবেন-
- মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে স্বামী পাবেন চার ভাগের এক ভাগ (১/৪)।
- মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকলে স্বামী পাবেন দুই ভাগের এক ভাগ (১/২)।
স্বামীর অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বন্টন করা হয়। অর্থাৎ, একজন ছেলে যে পরিমাণ অংশ পাবে, একজন মেয়ে পাবে তার অর্ধেক। কোনো মেয়ে না থাকলে অবশিষ্টাংশ সম্পূর্ণ ছেলে পাবে।
একজন মেয়ে প্রধানত তিনটি নিয়মে তার মা বা বাবার সম্পদ পেয়ে থাকে। তাহলো-
একজন মাত্র মেয়ে থাকলে: তিনি অবশিষ্ট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবেন।
একাধিক মেয়ে (কোনো ছেলে না থাকলে): সব মেয়ে মিলে অবশিষ্ট সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগ (২/৩) পাবেন।
ছেলে ও মেয়ে উভয়ই থাকলে: ছেলে যে পরিমাণ সম্পত্তি পাবে, মেয়ে পাবে তার অর্ধেক।
কাজেই ‘মায়ের সম্পত্তিতে মেয়েরা বেশি পাবে’, এই ধারণাটি পুরোপুরি ভুল।
হিন্দু আইন অনুযায়ী বণ্টন ব্যবস্থা
হিন্দু আইন অনুযায়ী কোনো পুরুষ মারা গেলে তার সম্পত্তির ওপর সর্বগ্রে অধিকার থাকে পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র ও বিধবার। এদের অনুপস্থিতিতে পর্যায়ক্রমে কন্যা, দৌহিত্র, পিতা, মাতা, ভ্রাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্রগণ উত্তরাধিকারী হন।

তবে কোনো হিন্দু নারী মারা গেলে তার স্বার্জিত বা প্রাপ্ত সম্পত্তি বণ্টনের দুটি প্রধান নিয়ম রয়েছে।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি: কোনো নারী যদি উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিক হন, তবে তার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি যার কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন, আবার তার নিকট-আত্মীয়দের কাছেই ফিরে যাবে।
অন্যান্য উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি: উত্তরাধিকার ব্যতিত অন্য কোনো উপায়ে (যেমন: ক্রয় বা দান) সম্পত্তির মালিক হলে, তা মালিকানার ধরন অনুযায়ী তার নিজস্ব উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন হবে।
১৯৩৭ সালের হিন্দু আইন অনুযায়ী মেয়েরা বাবার সম্পত্তির সাধারণ উত্তরাধিকারী ছিলেন না; শুধুমাত্র বিধবা অবস্থায় সন্তান নাবালক থাকলে বসতবাড়ির ভোগের অধিকার পেতেন। দীর্ঘ ৮৩ বছর পর, ২০২০ সালের ১ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করে যে, হিন্দু বিধবারা স্বামীর সব সম্পত্তির (কৃষি ও অকৃষি) উত্তরাধিকারী হবেন। তবে এই সম্পত্তি তিনি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না, কেবল ভোগদখল করতে পারবেন।
মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ছেলে, মেয়ে ও স্বামীর অধিকার নিয়ে ভুল ধারণা থাকলে পরিবারে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ তৈরি হতে পারে। মুসলিম ও হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার পাওয়ার নিয়ম এক নয়। আবার সম্পত্তিটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারী কারা, তার ওপরও বণ্টনের হিসাব নির্ভর করতে পারে।
তাই শুধু প্রচলিত কথা বা সামাজিক ধারণার ওপর নির্ভর না করে আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করা জরুরি। সম্পত্তি ভাগের আগে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বা আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে ভুল বোঝাবুঝি ও ভবিষ্যতের বিরোধ এড়ানো সম্ভব।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।




