logo

হোটেল রুমে ক্যামেরা লুকানো? স্মার্টফোনেই যেভাবে বুঝবেন

হোটেল রুমে ক্যামেরা লুকানো? স্মার্টফোনেই যেভাবে বুঝবেন
ছবি : টুডে ‍শো

ভ্রমণের সময় হোটেলে ওঠার পর ঘরটি নিরাপদ ও ব্যক্তিগত মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘরের কোনো অস্বাভাবিক জিনিসের আড়ালে যদি লুকানো ক্যামেরা থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত মুহূর্তও অন্যের নজরে চলে যেতে পারে। তাই নতুন কোনো হোটেল বা ভাড়া করা থাকার জায়গায় ওঠার পর কয়েক মিনিট সময় নিয়ে ঘরটি ভালোভাবে দেখে নেওয়া উপকারী।

লুকানো ক্যামেরা অনেক সময় ঘড়ি, ধোঁয়া শনাক্ত করার যন্ত্র, চার্জার, বৈদ্যুতিক সংযোগস্থল, আয়না বা অন্য সাধারণ জিনিসের মধ্যে রাখা হতে পারে। বাইরে থেকে এগুলো আলাদা করে চেনা কঠিন। তবে আপনার হাতের স্মার্টফোন দিয়েই কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা করা সম্ভব।

প্রথমেই ঘরটি ভালোভাবে দেখে নিন। লুকানো ক্যামেরা খোঁজার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো চোখ দিয়ে ঘরটি পরীক্ষা করা। বিশেষ করে এমন সব জিনিস আগে দেখুন, যেগুলো থেকে বিছানা, বাথরুম, পোশাক পরিবর্তনের জায়গা বা ঘরের ব্যক্তিগত অংশ পরিষ্কার দেখা যায়।

ঘড়ি, টেবিল ল্যাম্প, ধোঁয়া শনাক্ত করার যন্ত্র, টেলিভিশনের আশপাশ, ইউএসবি চার্জার, বৈদ্যুতিক সংযোগস্থল, সাজানোর সামগ্রী ও আয়নার দিকে নজর দিতে পারেন। কোনো জিনিস অস্বাভাবিক জায়গায় রাখা থাকলে বা তাতে ছোট ছিদ্র দেখা গেলে সেটি ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।

তবে অস্বাভাবিক দেখালেই সেটিকে ক্যামেরা ধরে নেওয়া উচিত নয়। হোটেলের বৈদ্যুতিক ও নিরাপত্তা সরঞ্জামও দেখতে অনেক সময় অচেনা লাগতে পারে।

ফোনের ফ্ল্যাশলাইট দিয়ে ক্যামেরার লেন্স খুঁজুন

লুকানো ক্যামেরা শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিগুলোর একটি হলো ফোনের ফ্ল্যাশলাইট ব্যবহার করা।

প্রথমে ঘরের আলো কিছুটা কমিয়ে দিন। এরপর ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের বিভিন্ন অংশে আলো ফেলুন। বিশেষ করে যেসব জিনিস ব্যক্তিগত জায়গার দিকে মুখ করে আছে, সেগুলো ভালোভাবে দেখুন।

ক্যামেরার লেন্স সাধারণত আলো প্রতিফলিত করতে পারে। তাই ফ্ল্যাশলাইটের আলো পড়লে ছোট একটি চকচকে বিন্দু বা অস্বাভাবিক ঝিলিক দেখা যেতে পারে।

এমন কোনো ঝিলিক দেখলে কাছে গিয়ে দেখুন সেটি সত্যিই কোনো লেন্স কি না। তবে কাচ, ধাতব অংশ, স্ক্রু বা অন্যান্য চকচকে জিনিস থেকেও একই ধরনের প্রতিফলন হতে পারে। তাই শুধু একটি ঝিলিক দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

ফোনের ক্যামেরা দিয়ে ইনফ্রারেড আলো খুঁজুন

অনেক ক্যামেরায় অন্ধকারে ছবি তোলার জন্য ইনফ্রারেড বা আইআর আলো ব্যবহার করা হয়। মানুষের চোখে এই আলো সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু কিছু স্মার্টফোনের ক্যামেরা সেন্সর এই আলো ধরতে পারে।

এটি পরীক্ষা করতে ঘরের আলো বন্ধ বা কমিয়ে দিন। এরপর ফোনের ক্যামেরা চালু করে ধীরে ধীরে ঘরের সন্দেহজনক জায়গাগুলোর দিকে তাকান।

স্ক্রিনে যদি ছোট সাদা, বেগুনি বা উজ্জ্বল বিন্দু দেখা যায়, তাহলে জায়গাটি আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। বিশেষ করে অন্ধকারে যে ধরনের আলো খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু ফোনের ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে, সেটি খেয়াল করার মতো বিষয়।

তবে সব ফোনে এই পদ্ধতি একইভাবে কাজ করবে না। ফোনের ক্যামেরার ইনফ্রারেড ফিল্টার এবং মডেলের ওপর ফলাফল নির্ভর করতে পারে। তাই কোনো আলো না দেখা গেলেই ঘরে ক্যামেরা নেই, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

ক্যামেরা শনাক্ত করার অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন

স্মার্টফোনের জন্য বিভিন্ন ক্যামেরা শনাক্ত করার অ্যাপ পাওয়া যায়। কিছু অ্যাপ ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে ইনফ্রারেড আলো শনাক্ত করার চেষ্টা করে। আবার কিছু অ্যাপ চৌম্বকীয় ক্ষেত্র বা অন্য ধরনের সংকেত পরীক্ষা করার দাবি করে।

তবে এসব অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার। একটি অ্যাপ কোনো ডিভাইস শনাক্ত করেছে মানেই সেটি লুকানো ক্যামেরা, এমন নয়। আবার কোনো অ্যাপ কিছু শনাক্ত না করলেও ঘরে ক্যামেরা থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।

তাই অ্যাপকে সহায়ক উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু একমাত্র পরীক্ষার পদ্ধতি হিসেবে নয়।

হোটেলের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক পরীক্ষা করুন

অনেক লুকানো ক্যামেরা ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে ভিডিও পাঠাতে পারে। তাই হোটেলের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে অপরিচিত কোনো ডিভাইস দেখা যাচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল করা যেতে পারে।

কিছু নেটওয়ার্ক স্ক্যানিং অ্যাপ একই নেটওয়ার্কে যুক্ত ডিভাইসগুলোর তালিকা দেখাতে পারে। সেখানে ক্যামেরা, আইপি ক্যামেরা বা অপরিচিত কোনো ডিভাইসের নাম দেখা গেলে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

তবে এই পদ্ধতিরও সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক হোটেল অতিথিদের ডিভাইস একে অপরের থেকে আলাদা রাখে। আবার কোনো ক্যামেরা ওয়াই-ফাই ব্যবহার না করে মেমোরি কার্ডে ভিডিও সংরক্ষণ করতে পারে। ফলে নেটওয়ার্কে অপরিচিত ডিভাইস না পাওয়া মানেই ঘর সম্পূর্ণ নিরাপদ, এমন নয়।

আয়না নিয়েও সতর্ক থাকুন

আয়না নিয়ে লুকানো ক্যামেরার বিভিন্ন কথা অনলাইনে ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে দুই দিক থেকে দেখা যায় এমন আয়না নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।

তবে শুধু আঙুল দিয়ে আয়না পরীক্ষা করে সেটি দ্বিমুখী আয়না কি না, নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আলো, কাচের পুরুত্ব এবং আয়নার নির্মাণের কারণে এই পরীক্ষায় ভুল ফল আসতে পারে।

তাই আয়নায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে ঘরের আলো, আয়নার পেছনের কাঠামো এবং সেটির অবস্থান পর্যবেক্ষণ করুন। সন্দেহ থাকলে হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানান।

কোন জায়গাগুলো আগে পরীক্ষা করবেন?

ঘরে ঢোকার পর সবকিছু খুঁজে দেখার প্রয়োজন নেই। আগে সেই জায়গাগুলো দেখুন যেখান থেকে ব্যক্তিগত অংশ পরিষ্কার দেখা যায়। বিশেষ করে পরীক্ষা করতে পারেন-

  • বিছানার দিকে মুখ করা ঘড়ি
  • ধোঁয়া শনাক্ত করার যন্ত্র
  • টেবিল ল্যাম্প
  • ইউএসবি চার্জার
  • বৈদ্যুতিক সংযোগস্থল
  • টেলিভিশনের আশপাশ
  • আয়না
  • দেয়ালের ছোট ছিদ্র
  • সাজানোর সামগ্রী
  • বাথরুমের আশপাশ
  • বায়ু চলাচলের ভেন্ট

লুকানো ক্যামেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর দেখার দিক। তাই ব্যক্তিগত জায়গার দিকে সরাসরি তাক করা কোনো অস্বাভাবিক যন্ত্র বা বস্তু আগে পরীক্ষা করা যুক্তিযুক্ত।

ক্যামেরা সন্দেহ হলে কী করবেন?

কোনো জিনিসে ক্যামেরা থাকার সন্দেহ হলে সেটি খুলে দেখার চেষ্টা করবেন না। বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা দেয়ালের ভেতরের কোনো অংশ নাড়াচাড়া করাও নিরাপদ নয়।

প্রথমে নিরাপদ জায়গা থেকে সন্দেহজনক বস্তুটির ছবি বা ভিডিও রাখতে পারেন। এরপর হোটেল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। পরিস্থিতি গুরুতর মনে হলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

যদি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকে, তাহলে ওই ঘরে অবস্থান না করে নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়াই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

ফোন দিয়ে পরীক্ষা করলেই কি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়?

না। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশলাইট, ক্যামেরা, অ্যাপ বা ওয়াই-ফাই পরীক্ষা কিছু সন্দেহজনক ডিভাইস খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটি দিয়েই একটি ঘর সম্পূর্ণভাবে ক্যামেরামুক্ত বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

ক্যামেরা যদি ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার না করে, ওয়াই-ফাইয়ে যুক্ত না থাকে বা এমনভাবে লুকানো থাকে যে লেন্সের প্রতিফলন সহজে দেখা যায় না, তাহলে সাধারণ ফোন পরীক্ষায় সেটি ধরা নাও পড়তে পারে।

উচ্চ ঝুঁকির পরিস্থিতিতে পেশাদার সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

ভ্রমণের আগে আরও কিছু সতর্কতা

হোটেলে ওঠার পর শুধু ক্যামেরা খোঁজাই নয়, নিজের সামগ্রিক গোপনীয়তার দিকেও নজর রাখা উচিত।

ঘরে ঢোকার পর অচেনা বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা অস্বাভাবিক বস্তু চোখে পড়লে তা লক্ষ্য করুন। ব্যক্তিগত তথ্য বা সংবেদনশীল ছবি কোনো অচেনা ডিভাইসে পাঠাবেন না। হোটেলের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা ভালো।

নতুন কোনো থাকার জায়গায় কয়েক মিনিটের একটি সাধারণ গোপনীয়তা পরীক্ষা অনেক সময় অস্বাভাবিক কিছু দ্রুত চোখে পড়তে সাহায্য করতে পারে।

হোটেল রুমে লুকানো ক্যামেরার কথা ভাবলে অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক। তবে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ঘরে ঢোকার পর কয়েক মিনিট সময় নিয়ে চোখে দেখে নেওয়া, ফোনের ফ্ল্যাশলাইট দিয়ে সন্দেহজনক জায়গা পরীক্ষা করা এবং ফোনের ক্যামেরায় ইনফ্রারেড আলোর সম্ভাব্য উৎস খোঁজা প্রাথমিকভাবে কাজে আসতে পারে। ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কেও অপরিচিত ডিভাইস আছে কি না দেখা যেতে পারে।

তবে কোনো একটি পদ্ধতিকে শতভাগ নির্ভরযোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সন্দেহজনক কিছু পেলে সেটি নিজে খুলে বা নষ্ট না করে নিরাপদভাবে প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই সবচেয়ে ভালো উপায়।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া