logo
Advertisement

অসামাজিক নাকি অ্যান্টিসোশ্যাল, দুটির মধ্যে পার্থক্য জানেন তো

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
অসামাজিক নাকি অ্যান্টিসোশ্যাল, দুটির মধ্যে পার্থক্য জানেন তো
ছবি : সংগৃহীত

অনেকেই ‘অসামাজিক’ (Asocial) এবং ‘অ্যান্টিসোশ্যাল’ (Antisocial) শব্দ দুটি একই অর্থে ব্যবহার করেন। কিন্তু বাস্তবে এই দুটি এক নয়। দুটোর মধ্যে কিছু মিল থাকলেও তাদের কারণ, আচরণ এবং অন্যদের ওপর প্রভাবের ক্ষেত্রে রয়েছে বড় পার্থক্য।

Advertisement

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অসামাজিক মানুষ সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করেন এবং সামাজিক মেলামেশার প্রতি তাদের আগ্রহ কম থাকে। অন্যদিকে অ্যান্টিসোশ্যাল আচরণ বলতে এমন প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে অন্যের অধিকার, অনুভূতি বা সামাজিক নিয়ম-কানুনের প্রতি উদাসীনতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

অসামাজিক ব্যক্তির লক্ষণ

অসামাজিক মানুষের মধ্যে সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন-

  • একা সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা
  • সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আগ্রহ কম থাকা
  • মানুষের সঙ্গে সহজে কথোপকথন শুরু করতে না পারা
  • সামাজিক ইঙ্গিত বা সংকেত বুঝতে অসুবিধা হওয়া
  • সামাজিক পরিবেশে অস্বস্তি, উদ্বেগ বা নার্ভাস অনুভব করা
  • অন্যের বিচার বা সমালোচনার ভয় থাকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অসামাজিক মানুষ সাধারণত অন্যের ক্ষতি করতে চান না। তারা সামাজিক নিয়ম মেনে চলেন এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন। তাদের একা থাকার প্রবণতা মূলত ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য বা সামাজিক অস্বস্তি থেকে আসে।

অ্যান্টিসোশ্যাল ব্যক্তির লক্ষণ

অ্যান্টিসোশ্যাল আচরণের বৈশিষ্ট্যগুলো অনেকটাই ভিন্ন। এর মধ্যে থাকতে পারে-

  • আইন ভঙ্গ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া
  • হঠকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া
  • দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ
  • সহিংসতা বা আক্রমণাত্মক প্রবণতা
  • প্রতারণা করা
  • প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ
  • চুরি বা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা
  • অন্যের কষ্ট বা অনুভূতির জন্য অনুশোচনা না থাকা
  • ব্যক্তিগত স্বার্থে সম্পর্ক ব্যবহার করা

মনোবিজ্ঞানীরা জানান, অ্যান্টিসোশ্যাল আচরণ প্রায়ই এমন এক মানসিক প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে ব্যক্তি নিজের স্বার্থকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন এবং অন্যদের ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন না।

অসামাজিক ও অ্যান্টিসোশ্যাল আচরণের মূল পার্থক্য

দুই ধরনের আচরণের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো তাদের উদ্দেশ্য।

অসামাজিক মানুষ একা থাকতে পছন্দ করেন কারণ তারা এতে স্বস্তি পান। এটি অনেক সময় সামাজিক উদ্বেগ, লাজুক স্বভাব বা অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তারা অন্যদের অপছন্দ করেন এমন নয়, বরং একা থাকলে নিজেদের বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

অন্যদিকে অ্যান্টিসোশ্যাল ব্যক্তির একা থাকার প্রবণতা অনেক সময় অন্যের অনুভূতির প্রতি উদাসীনতা বা নিজের স্বার্থসিদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখতে সমস্যাও দেখা যায়।

অসামাজিক আচরণ

  • সামাজিক উদ্বেগ থেকে তৈরি হতে পারে
  • একা থাকতে ভালো লাগে
  • লাজুক বা অন্তর্মুখী হতে পারেন
  • দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম

অ্যান্টিসোশ্যাল আচরণ

  • অন্যদের প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা থাকতে পারে
  • নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়
  • অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে
  • দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সমস্যায় পড়ে

কোথায় মিল রয়েছে?

দুই ধরনের মানুষের মধ্যেই একটি মিল দেখা যায়। তারা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে পারেন বা একা থাকতে পছন্দ করতে পারেন।

তবে কারণ এক নয়।

অসামাজিক ব্যক্তি একা থাকেন কারণ তিনি তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অ্যান্টিসোশ্যাল ব্যক্তি একা থাকতে পারেন কারণ তিনি অন্যের অনুভূতির গুরুত্ব দেন না বা নিজের লক্ষ্য পূরণে সেটিকে সুবিধাজনক মনে করেন।

ফলে বাইরে থেকে দুজনকে একই রকম মনে হলেও তাদের মানসিক প্রেরণা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

বাস্তব জীবনের কিছু উদাহরণ

সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডার আমন্ত্রণ

কোনো অসামাজিক ব্যক্তি অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে বাইরে আড্ডায় যেতে অনাগ্রহী হতে পারেন, কারণ তিনি কর্মক্ষেত্রের বাইরের সামাজিক মেলামেশায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অন্যদিকে অ্যান্টিসোশ্যাল ব্যক্তি আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন এমনভাবে, যাতে অন্যরা কষ্ট পেলেও তিনি তা নিয়ে ভাবেন না।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে

অসামাজিক ব্যক্তি বড় কোনো পার্টিতে যাওয়ার পরিবর্তে সঙ্গীর সঙ্গে বাসায় সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারেন। অন্যদিকে অ্যান্টিসোশ্যাল ব্যক্তি সঙ্গীকে পার্টিতে যেতে বাধা দিতে পারেন, অপরাধবোধ তৈরি করতে পারেন বা অনুষ্ঠানে গিয়ে অন্যদের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করতে পারেন।

অসামাজিক আচরণের জন্য কী করা যেতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অসামাজিক আচরণ যদি দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উপকারী হতে পারে। চিকিৎসা বা সহায়তার কিছু উপায় হলো-

  • পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন
  • কাউন্সেলিং বা থেরাপি
  • সামাজিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ
  • সহায়ক গ্রুপে অংশগ্রহণ

থেরাপির মাধ্যমে সামাজিক উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা অন্যান্য অন্তর্নিহিত সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা এবং সেগুলো মোকাবিলার কৌশল শেখা সম্ভব।

অ্যান্টিসোশ্যাল আচরণের ক্ষেত্রে কী করা হয়?

অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যও মনোচিকিৎসা কার্যকর হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজের আচরণকে সমস্যা হিসেবে মনে করেন না। ফলে স্বেচ্ছায় চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক কম।

তবে কৈশোর থেকেই সঠিক পারিবারিক যত্ন, ইতিবাচক যোগাযোগ এবং আচরণগত নিয়ন্ত্রণ অ্যান্টিসোশ্যাল প্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সামাজিক পরিস্থিতি সামলানোর উপায়

সামাজিক পরিবেশ অনেকের জন্যই চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কিছু অভ্যাস সাহায্য করতে পারে-

  • সামাজিকতা ও একাকী সময়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা
  • ধীরে ধীরে সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
  • স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া
  • মেডিটেশন বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করা
  • ডায়েরি লেখা বা নিজের অনুভূতি লিপিবদ্ধ করা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিবাচক ও সহায়ক মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়াই সুস্থ মানসিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

সংক্ষেপে বলা যায়, অসামাজিক হওয়া মানেই অ্যান্টিসোশ্যাল হওয়া নয়। একজন ব্যক্তি একা থাকতে পছন্দ করতেই পারেন, কিন্তু সেটি তাকে অন্যের প্রতি ক্ষতিকর বা দায়িত্বহীন করে তোলে না। তাই এই দুই ধারণার পার্থক্য বোঝা জরুরি, যাতে মানুষের আচরণকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়।

সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড