logo

নবজাতকের শরীরে হাড় থাকে প্রায় ৩০০টি, বড় হলে কমে যায় কেন?

নবজাতকের শরীরে হাড় থাকে প্রায় ৩০০টি, বড় হলে কমে যায় কেন?
ছবি: দ্য বাম্প. কম

একটি নবজাতক শিশুর শরীর কতটা ছোট, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, জন্মের সময় শিশুর শরীরে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি হাড় থাকে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে সাধারণত ২০৬টি হাড় থাকলেও নবজাতকের শরীরে থাকে প্রায় ২৭০ থেকে ৩০০টি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা কমে আসে। কিন্তু হাড়গুলো কি সত্যিই হারিয়ে যায়?

আসলে তা নয়। শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের কিছু ছোট ও আলাদা হাড় একে অপরের সঙ্গে জোড়া লেগে বড় হাড় তৈরি করে। পাশাপাশি জন্মের সময় শিশুর কঙ্কালের অনেক অংশে তরুণাস্থি থাকে, যা ধীরে ধীরে শক্ত হাড়ে রূপ নেয়। এই পরিবর্তন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শারীরিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জন্মের সময় শিশুর শরীরে কতটি হাড় থাকে?

নবজাতকের শরীরে প্রায় ৩০০টি হাড় থাকে বলে সাধারণভাবে বলা হয়। তবে সব শিশুর হাড়ের সংখ্যা এক নয়। কোনো কোনো চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সূত্রে জন্মের সময় হাড়ের সংখ্যা প্রায় ২৭০ থেকে ৩০০ বলা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে সাধারণত ২০৬টি হাড় থাকে।

এই পার্থক্যের প্রধান কারণ হলো, শিশুর শরীরের কিছু হাড় জন্মের সময় আলাদা অবস্থায় থাকে। বড় হওয়ার সময় সেগুলোর অনেকগুলো একসঙ্গে জোড়া লেগে যায়। তাই হাড়ের সংখ্যা কমলেও এর অর্থ এই নয় যে শরীর থেকে হাড় হারিয়ে যাচ্ছে।

শিশুর শরীরে বেশি হাড় থাকে কেন?

শিশুর শরীর দ্রুত বাড়ে। এই বৃদ্ধি সহজ করতে তার কঙ্কালের গঠনও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় আলাদা থাকে। জন্মের সময় শরীরের কিছু হাড় পুরোপুরি জোড়া লাগানো থাকে না। ফলে কঙ্কালের বিভিন্ন অংশে আলাদা হাড় বা হাড়ের অংশ দেখা যায়।

বিশেষ করে শিশুর মাথার খুলির হাড়গুলো জন্মের সময় পুরোপুরি জোড়া লাগে না। এতে প্রসবের সময় শিশুর মাথার আকৃতিতে সামান্য পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ থাকে। পরে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে খুলির হাড়গুলো ধীরে ধীরে শক্ত ও সুসংবদ্ধ হয়।

জন্মের সময় শিশুর সব হাড় কি শক্ত থাকে?

না। জন্মের সময় শিশুর কঙ্কালের কিছু অংশ পুরোপুরি শক্ত হাড়ে পরিণত হয় না। এর অনেক অংশে থাকে তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ। এটি একধরনের শক্ত কিন্তু নমনীয় সংযোজক কলা। নাক ও কানের কিছু অংশেও এই ধরনের কলা থাকে।

শিশুর কঙ্কালের এই নমনীয়তা স্বাভাবিক বিকাশে ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তরুণাস্থির অনেক অংশ ধীরে ধীরে শক্ত হাড়ে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অস্থিকরণ বা ওসিফিকেশন।

গর্ভাবস্থার শুরুর দিকেই শিশুর হাড় গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গর্ভে থাকতেই কঙ্কালের বিকাশ চলতে থাকে এবং জন্মের পরও তা অব্যাহত থাকে।

শিশুর মাথার নরম অংশ কেন থাকে?

নবজাতকের মাথার ওপরের দিকে বা পেছনের দিকে নরম অংশ অনুভব করা যেতে পারে। এই অংশগুলোকে বলা হয় ফন্টানেল বা মাথার নরম জায়গা। এগুলো খুলির হাড়গুলোর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা, যেখানে হাড়গুলো তখনও পুরোপুরি জোড়া লাগেনি।

এই নরম জায়গাগুলো স্বাভাবিক শারীরিক গঠনের অংশ। এগুলো শিশুর মাথার খুলির বিকাশের সুযোগ দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খুলির হাড় বড় হয় এবং নরম জায়গাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে। মাথার সামনের বড় নরম জায়গাটি সাধারণত জীবনের প্রথম এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বন্ধ হয়, যদিও শিশুভেদে সময়ের কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।

শিশুর মাথার নরম অংশে জোরে চাপ দেওয়া উচিত নয়। তবে স্বাভাবিকভাবে শিশুকে কোলে নেওয়া, গোসল করানো বা মাথায় আলতোভাবে হাত দেওয়া নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। নরম জায়গাটি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকলে, বিশেষ করে শিশুর জ্বর বা অসুস্থতার সঙ্গে এমন হলে, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কখন শিশুর হাড়গুলো জোড়া লাগে?

শিশুর হাড় জোড়া লাগার প্রক্রিয়া একসঙ্গে বা নির্দিষ্ট কোনো দিনে শেষ হয় না। শরীরের বিভিন্ন হাড় বিভিন্ন সময়ে বড় হয়, শক্ত হয় এবং একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিছু হাড়ের জোড়া লাগার প্রক্রিয়া শৈশবেই এগোয়, আবার কিছু হাড়ের বিকাশ কৈশোর পেরিয়েও চলতে পারে।

সাধারণভাবে বলা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর কঙ্কাল আরও পরিণত হয়। তবে সব হাড় একই বয়সে পুরোপুরি পরিণত হয় না। তাই জন্মের সময় প্রায় ৩০০টি হাড় থাকা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে সাধারণত ২০৬টি হাড়ে পৌঁছানোর বিষয়টি একটি ধীরে চলা স্বাভাবিক বিকাশপ্রক্রিয়া।

শিশুর হাড় সুস্থ রাখতে কী প্রয়োজন?

শিশুর হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য পুষ্টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড়ের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুষ্টি, বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর বয়স ও খাওয়ানোর ধরন অনুযায়ী পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে। তাই নবজাতক বা ছোট শিশুকে ভিটামিন ডি কিংবা ক্যালসিয়ামের সম্পূরক দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিজের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত সম্পূরক দেওয়া ঠিক নয়।

জন্মের সময় শিশুর শরীরে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় বেশি হাড় থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। শিশুর কঙ্কালের অনেক অংশ তখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু হাড় জোড়া লাগে, তরুণাস্থি শক্ত হাড়ে রূপ নেয় এবং কঙ্কাল আরও পরিণত হয়।

অর্থাৎ, শিশুর শরীরে থাকা অতিরিক্ত হাড় হারিয়ে যায় না। বরং সেগুলোর অনেকগুলো একত্র হয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পরিচিত কঙ্কাল তৈরি করে। এটি মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের একটি আকর্ষণীয় দিক।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হেল্থলাইনে ‘How Many Bones Are Babies Born With and Why Do They Have More Than Adults?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।