আয়রন খাওয়ার পরও শরীরে ঘাটতি কমছে না, জানুন ৪ সম্ভাব্য কারণ

সারাদিনের ক্লান্ত, চুল পড়া, দুর্বলতা বা কাজে মনোযোগ দিতে না পারার পেছনে শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকতে পারে। এ ধরনের সমস্যায় অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া শুরু করেন। কিন্তু কয়েক মাস ওষুধ খাওয়ার পরও রক্ত পরীক্ষা করলে দেখা যায়, শরীরে আয়রনের পরিমান তেমন বাড়েনি। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, নিয়মিত আয়রন খাওয়ার পরও এমন হচ্ছে কেন? কোনো ঝামেলা হচ্ছে কি?
ভারতীয় পুষ্টিবিদ রাশি চৌধুরীর ব্যাখ্যা তুলে ধরে এনডিটিভির এক প্রতিবেদন জানায়, শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণ না হওয়ার পেছনে শুধু খাবারে আয়রনের অভাব দায়ী না। শরীর আয়রন ঠিকমতো শোষণ করতে পারছে কি না, নিয়মিত রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না এবং শরীরে প্রদাহ রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ফেরিটিন কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ফেরিটিন হলো এমন একটি প্রোটিন, যা শরীরে আয়রন সঞ্চয় করে জমা রাখে। সহজভাবে বললে, শরীরে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য যতটা আয়রন জমা রয়েছে, ফেরিটিন পরীক্ষা করলে তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।
খেয়াল রাখবেন, হিমোগ্লোবিন ও ফেরিটিনের কাজ এক নয়। তাই হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক থাকলেও কারও কারও শরীরে আয়রনের সঞ্চয় কম থাকতেই পারে।
আর ফেরিটিনের মাত্রা কম থাকলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা চুল পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গের অন্য অনেক কারণও আছে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে আয়রনের ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না।
আয়রনের সাপ্লিমেন্ট খেয়েও ফেরিটিন না বাড়ার ৪টি কারণ
শরীর আয়রন ঠিকমতো শোষণ করতে পারছে না
আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার অর্থ এই নয় যে শরীরের সব আয়রনই শোষিত হবে। খাবার, কিছু ওষুধ এবং পরিপাকতন্ত্রের নির্দিষ্ট সমস্যার কারণে আয়রন শোষণ কমে যেতে পারে।
যেমন, আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার কাছাকাছি সময়ে চা বা কফি পান করলে শরীরে আয়রন শোষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার বা সাপ্লিমেন্টের সঙ্গেও আয়রন খাওয়ার সময়ের ব্যবধান রাখা প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া পাকস্থলীর অ্যাসিড কমানোর কিছু ওষুধ আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে। সিলিয়াক রোগ বা অন্ত্রের কিছু সমস্যার কারণেও শরীর খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে না।
তাই আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার পরও ফেরিটিন না বাড়লে শুধু ওষুধের মাত্রা বাড়ানোর কথা না ভেবে কীভাবে ওষুধটি খাওয়া হচ্ছে এবং শোষণে কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
নিয়মিত রক্তক্ষরণের কারণে আয়রনের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না
শরীর থেকে নিয়মিত রক্তক্ষরণ হলে আয়রনের সঞ্চয় কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব নারীর মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, তাদের শরীর থেকে নিয়মিত আয়রন বেরিয়ে যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে যে পরিমাণ আয়রন শরীরে প্রবেশ করছে, তা চলমান ঘাটতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
এ ছাড়া পরিপাকতন্ত্রে আলসার বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে অল্প অল্প করে রক্তক্ষরণ হতে পারে। কখনও এই রক্তক্ষরণ চোখে দেখা যায় না। তাই দীর্ঘদিন আয়রনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজে দেখেন।
শরীরে প্রদাহ থাকলে আয়রনের ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হতে পারে
শরীরে প্রদাহ তৈরি হলে হেপসিডিন নামের একটি হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এই হরমোন শরীরে আয়রনের শোষণ ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
হেপসিডিনের মাত্রা বেড়ে গেলে অন্ত্র থেকে আয়রন রক্তে প্রবেশ করা এবং শরীরে সঞ্চিত আয়রন ব্যবহারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে আয়রন গ্রহণ করলেও শরীর প্রয়োজনমতো তা কাজে লাগাতে পারে না।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদ রাশি চৌধুরী পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস, কিছু অটোইমিউন রোগ এবং ফ্যাটি লিভারের মতো অবস্থার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।
তবে এসব রোগ থাকলেই যে ফেরিটিন কমবে বা আয়রন শোষণ বন্ধ হয়ে যাবে, তা নয়। ব্যক্তির উপসর্গ, পরীক্ষার ফল এবং চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনা করে চিকিৎসক বিষয়টি মূল্যায়ন করেন।
আয়রনের ঘাটতির মূল কারণ শনাক্ত হয়নি
আয়রনের ঘাটতি পূরণের জন্য শুধু সাপ্লিমেন্ট খাওয়াই যথেষ্ট নাও হতে পারে। ঘাটতির পেছনে কী কারণ রয়েছে, সেটিও জানা প্রয়োজন।
খাবারে আয়রনের অভাব, অতিরিক্ত মাসিকের রক্তপাত, অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের সমস্যা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগের কারণে ফেরিটিন কম থাকতে পারে। মূল কারণটি থেকে গেলে আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার পরও সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরও পরীক্ষার ফল উন্নত না হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
আয়রন শোষণ বাড়াতে কী করবেন?
আয়রনের ঘাটতি পূরণে কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে পারেন।
চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে ওষুধ খান: আয়রন সাপ্লিমেন্টের ধরন, মাত্রা ও খাওয়ার সময় ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা বাড়াবেন না বা পরিবর্তন করবেন না।
চা-কফি খাওয়ার সময় খেয়াল করুন: আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার কাছাকাছি সময়ে চা বা কফি পান না করাই ভালো। কতক্ষণ ব্যবধান রাখতে হবে, তা সাপ্লিমেন্টের ধরন ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করুন।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খান: মাছ, মাংস, ডাল, শিমজাতীয় খাবার এবং আয়রনসমৃদ্ধ শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে আয়রন শোষণে সাহায্য করতে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার, যেমন পেয়ারা, কমলা বা টমেটো খেতে পারেন।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান: ফেরিটিনের পাশাপাশি চিকিৎসক হিমোগ্লোবিন, অন্যান্য আয়রন পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রদাহ বা রক্তক্ষরণের কারণ খুঁজতে পরীক্ষা দিতে পারেন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
নিয়মিত আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরও ফেরিটিন না বাড়লে, ক্লান্তি বা দুর্বলতা না কমলে কিংবা চুল পড়ার সমস্যা চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পরীক্ষার ফল, ওষুধ খাওয়ার নিয়ম এবং সম্ভাব্য অন্তর্নিহিত সমস্যা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
অতিরিক্ত রক্তপাত, কালো আলকাতরার মতো পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এসব লক্ষণের কিছু গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
মনে রাখবেন, আয়রন শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অপ্রয়োজনে বা অতিরিক্ত মাত্রায় আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া নিরাপদ নয়। তাই পরীক্ষা ছাড়া নিজে থেকে আয়রন খাওয়া শুরু করা কিংবা মাত্রা বাড়ানো উচিত নয়।
আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার পরও ফেরিটিন না বাড়লে ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে ওষুধটি কাজ করছে না। শরীরে আয়রন শোষণে সমস্যা, নিয়মিত রক্তক্ষরণ কিংবা প্রদাহের মতো কারণ এর পেছনে থাকতে পারে।
সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করে তার উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকা সহজ হতে পারে।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে ‘Taking Iron Supplements But Ferritin Still Low?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।