logo
Advertisement

ফ্রোজেন না তাজা, কোন সবজিতে পুষ্টি বেশি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ফ্রোজেন না তাজা, কোন সবজিতে পুষ্টি বেশি
শুধু তাজা বা হিমায়িত শব্দ দেখে সবজির পুষ্টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ছবি : সংগৃহীত

সবজি কিনতে গেলে আমাদের বেশির ভাগেরই প্রথম পছন্দ থাকে টাটকা সবজি। বাজার থেকে সদ্য কেনা শিম, মটরশুঁটি, গাজর, ফুলকপি কিংবা পালংশাক দেখলেই মনে হয়, এগুলোই নিশ্চয় বেশি পুষ্টিকর। অন্যদিকে হিমায়িত সবজি দেখলে অনেকের মনে হয়, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলে এতে হয়তো পুষ্টিগুণ কমে গেছে।

Advertisement

কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়। সবজি কখন তোলা হয়েছে, কত দিন সংরক্ষণ করা হয়েছে, কত দূর থেকে বাজারে এসেছে এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, এসবের ওপরও পুষ্টিগুণ অনেকটাই নির্ভর করে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদ দীপশিখা জৈন তাজা ও হিমায়িত সবজির তুলনা করে দেখিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে হিমায়িত সবজিও পুষ্টির দিক থেকে ভালো বিকল্প হতে পারে।

তাজা সবজি কি সব সময় বেশি পুষ্টিকর?

তাজা সবজি নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যকর। তবে বাজারে যে সবজিকে আমরা তাজা বলছি, সেটি সব সময় ক্ষেত থেকে সরাসরি আমাদের রান্নাঘরে আসছে না।

ক্ষেত থেকে সবজি তোলার পর সেটি বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে। এরপর দোকানে কয়েক দিন পড়ে থাকতে পারে। বাড়িতে আনার পরও অনেক সময় কয়েক দিন ফ্রিজে রাখা হয়। এই পুরো সময়ে কিছু পুষ্টি উপাদান ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।

বিশেষ করে কিছু ভিটামিন সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় কমে যেতে পারে। তাই সদ্য তোলা সবজি এবং কয়েক দিন ধরে সংরক্ষণ করা তাজা সবজির পুষ্টিগুণ এক নাও হতে পারে।


হিমায়িত সবজির ক্ষেত্রে কী হয়?

হিমায়িত সবজি তৈরির সময় সাধারণত ফসল তোলার পর তুলনামূলক দ্রুত তা প্রক্রিয়াজাত করে হিমায়িত করা হয়। ফলে ক্ষেত থেকে তোলার পর দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি কমে যাওয়ার সুযোগ কম থাকে।

এ কারণেই কিছু ক্ষেত্রে কয়েক দিন ধরে বাজার বা ফ্রিজে রাখা তাজা সবজির তুলনায় হিমায়িত সবজিতে কিছু পুষ্টি উপাদান ভালোভাবে ধরে থাকতে পারে। বিশেষ করে ক্যারোটিনয়েডের মতো উদ্ভিজ্জ উপাদান ধরে রাখার ক্ষেত্রে হিমায়িত সবজি ভালো ফল দিতে পারে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সব হিমায়িত সবজি সব সময় তাজা সবজির চেয়ে বেশি পুষ্টিকর। আসল বিষয় হলো, সবজিটি কখন সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কত সময় পর খাওয়া হচ্ছে।

হিমায়িত করার সময় কি পুষ্টি নষ্ট হয়?

কিছুটা হতে পারে। বেশির ভাগ সবজি হিমায়িত করার আগে অল্প সময়ের জন্য গরম পানিতে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে ব্লাঞ্চিং বলা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সবজির রং, স্বাদ ও গঠন ভালো রাখা এবং কিছু ক্ষতিকর জীবাণু কমানো।

তবে এই প্রক্রিয়ায় কিছু পুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে। আবার সব পুষ্টি উপাদান একইভাবে প্রভাবিত হয় না। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও চর্বির মতো প্রধান পুষ্টি উপাদান সাধারণত হিমায়িত করার ফলে খুব বেশি পরিবর্তিত হয় না। ভিটামিন ও খনিজের ক্ষেত্রে পরিবর্তন নির্ভর করে সবজিটি কীভাবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করা হয়েছে তার ওপর।

তাই হিমায়িত মানেই পুষ্টিহীন, এমন ধারণা ঠিক নয়।

তাহলে তাজা না হিমায়িত, কোনটি ভালো?

এর এক কথার উত্তর নেই। যদি ক্ষেত থেকে সদ্য তোলা সবজি খুব অল্প সময়ের মধ্যে রান্না করে খাওয়া যায়, তাহলে তাজা সবজি দারুণ পছন্দ। কিন্তু বাজার থেকে কেনা সবজি যদি কয়েক দিন পড়ে থাকে এবং তারপর খাওয়া হয়, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে ভালোভাবে হিমায়িত করা সবজি পুষ্টির দিক থেকে সমান বা আরও ভালো অবস্থায় থাকতে পারে।

অর্থাৎ শুধু তাজা বা হিমায়িত শব্দ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

হিমায়িত সবজির আরেকটি সুবিধা, কম অপচয়

তাজা সবজি দীর্ঘদিন রাখা যায় না। কয়েক দিন পর অনেক সবজি নরম হয়ে যায়, পচতে শুরু করে বা স্বাদ ও গুণমান হারায়। ফলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনলে ফেলে দিতে হতে পারে।

হিমায়িত সবজি তুলনামূলক দীর্ঘ সময় রাখা যায়। ফলে একবারে বেশি কিনে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে ব্যবহার করা সম্ভব। এতে খাবারের অপচয়ও কম হতে পারে। পুষ্টিবিদ দীপশিখা জৈনও হিমায়িত সবজির দীর্ঘ সংরক্ষণকালকে এর অন্যতম সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ব্যস্ত পরিবারে এই সুবিধাটি বেশ কাজে লাগতে পারে।

খরচের দিক থেকেও সুবিধা থাকতে পারে

হিমায়িত সবজি অনেক সময় তুলনামূলক সাশ্রয়ী হতে পারে, বিশেষ করে মৌসুমি সবজির বাইরে অন্য সময়ে কিছু সবজি কিনলে।

তবে বাংলাদেশে তাজা সবজি ও হিমায়িত সবজির দাম এক নয় এবং অঞ্চল, মৌসুম ও ব্র্যান্ডভেদে বড় পার্থক্য থাকতে পারে। তাই স্থানীয় বাজারের দামের সঙ্গে তুলনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।

রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ

সবজি তাজা না হিমায়িত, এই প্রশ্নের পাশাপাশি কীভাবে রান্না করছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকক্ষণ ধরে প্রচুর পানিতে সবজি সেদ্ধ করলে পানিতে দ্রবণীয় কিছু ভিটামিন কমে যেতে পারে। তাই অতিরিক্ত সেদ্ধ না করে অল্প পানিতে রান্না করা বা ভাপে রান্না করা তুলনামূলক ভালো পদ্ধতি হতে পারে।

যে পানিতে সবজি সেদ্ধ করা হয়েছে, সেটি যদি রান্নার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে পানিতে চলে যাওয়া কিছু পুষ্টি উপাদানও খাবারে রাখা সম্ভব।

হিমায়িত সবজি কিনলে কী দেখবেন?

সব হিমায়িত সবজি একই ধরনের নয়। সাধারণ হিমায়িত সবজি এবং অতিরিক্ত লবণ, সস বা অন্যান্য উপাদান মেশানো প্রস্তুত খাবারের মধ্যে পার্থক্য আছে।

তাই সম্ভব হলে এমন হিমায়িত সবজি বেছে নেওয়া ভালো, যাতে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা সস নেই।

শুধু সবজি থাকলে সেটি নিজের মতো করে রান্না করা সহজ হয় এবং খাবারে কতটা তেল, লবণ বা মসলা দেবেন, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সবজি যত বেশি খাবেন, ততই ভালো

তাজা না হিমায়িত, এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যেন হারিয়ে না যায়। প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত সবজি রাখা।

যে কারণে তাজা সবজি কিনে কয়েক দিন পর নষ্ট হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না, তার চেয়ে ভালো মানের হিমায়িত সবজি নিয়মিত খাওয়া অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

একইভাবে, স্থানীয় বাজার থেকে টাটকা সবজি কিনে দ্রুত রান্না করে খাওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিও চমৎকার পছন্দ।

অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষেত্রে সব সময় একটি পদ্ধতিকেই সেরা ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশের জন্য কোনটি বেশি সুবিধাজনক?

বাংলাদেশে বেশির ভাগ সবজি সারা বছরই তাজা অবস্থায় বাজারে পাওয়া যায়। মৌসুমি সবজিও তুলনামূলক সহজে পাওয়া যায়। তাই স্থানীয় বাজার থেকে তাজা সবজি কিনে দ্রুত রান্না করে খাওয়ার সুযোগ থাকলে সেটি ভালো বিকল্প।

তবে কর্মব্যস্ত মানুষ, ছোট পরিবার কিংবা যাদের একসঙ্গে বেশি সবজি কিনে রাখলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাদের জন্য হিমায়িত সবজি সুবিধাজনক হতে পারে।

বিশেষ করে মটরশুঁটি, ভুট্টা, মিশ্র সবজি বা কিছু নির্দিষ্ট সবজি হিমায়িত করে রাখলে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যায়।

তাজা সবজি স্বাস্থ্যকর, কিন্তু হিমায়িত সবজি মানেই পুষ্টি কম, এই ধারণা ঠিক নয়। ক্ষেত থেকে তোলার পর দ্রুত হিমায়িত করা হলে অনেক পুষ্টি উপাদান ভালোভাবে ধরে রাখা সম্ভব। অন্যদিকে তাজা সবজি দীর্ঘ সময় পরিবহন ও সংরক্ষণ করলে কিছু পুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে।

তাই কোনটি খাবেন, সেটি নির্ভর করবে সবজিটি কতটা তাজা, কত দিন সংরক্ষণ করা হয়েছে, কীভাবে রান্না করা হচ্ছে এবং আপনার জীবনযাত্রার জন্য কোনটি সুবিধাজনক তার ওপর।

সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে, সুযোগ থাকলে তাজা সবজি খান, আর প্রয়োজন হলে ভালো মানের হিমায়িত সবজিও খাবারের তালিকায় রাখুন। কারণ তাজা না হিমায়িত, শেষ পর্যন্ত নিয়মিত ও বৈচিত্র্যময় সবজি খাওয়াটাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সূত্র: এনডিটিভি