logo

কাঠবাদাম খোসাসহ খাবেন, নাকি ছাড়িয়ে

কাঠবাদাম খোসাসহ খাবেন, নাকি ছাড়িয়ে
ছবি: জিওকিউআইআই (GOQii)

সকালে ঘুম থেকে উঠে ভেজানো বাদাম খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। কেউ সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে খোসা ছাড়িয়ে খান, আবার কেউ কেউ খোসাসহই খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু কাঠবাদাম খোসা কি সত্যিই শরীরের জন্য ক্ষতিকর? খোসা ছাড়িয়ে খেলে কি পুষ্টিগুণ বেশি পাওয়া যায়? আর প্রতিদিন কয়টাই বা কাঠ বাদাম খাওয়া ঠিক?

আমন্ড বা কাঠবাদাম প্রোটিন, আঁশ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ই এবং বিভিন্ন খনিজের ভালো উৎস। এর বাদামি খোসাতেও রয়েছে আঁশ ও উদ্ভিজ্জ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তাই বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে কাঠবাদাম খাওয়ার আগে খোসা ছাড়ানো বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় না।

তবে ব্যক্তির হজম ক্ষমতা, খাবারের পছন্দ এবং দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার ওপর নির্ভর করে খোসাসহ বা খোসা ছাড়িয়ে কাঠবাদাম খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।


আমন্ডের খোসায় কি পুষ্টিগুণ রয়েছে?

কাঠবাদামের বাদামি খোসায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। বিশেষ করে পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। খোসায় থাকা আঁশও খাবারের মোট আঁশের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে।

আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে, মলত্যাগে সহায়তা করতে এবং খাবার খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখে।

তবে শুধু কাঠবাদামের খোসা খেলেই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যাবে বা নির্দিষ্ট কোনো রোগ প্রতিরোধ হবে, এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে বৈজ্ঞানিক খেলে এর পুষ্টিগুণ থেকে উপকার পাওয়া সম্ভব।

কাঠবাদামের খোসা কি ছাড়িয়ে খাওয়া উচিত?

সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে কাঠবাদামের খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া বাধ্যতামূলক কিছু না। খোসাসহ খেলে আঁশ ও কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, খোসা ছাড়ানো আমন্ডের গঠন নরম হয় এবং যাদের শক্ত খাবার চিবাতে বা হজম করতে অসুবিধা হয়, তাদের জন্য এটি সুবিধাজনক হতে পারে।

কাঠবাদামের খোসায় ট্যানিনসহ কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। এসব যৌগ নিয়ে পুষ্টি শোষণের বিষয়ে আলোচনা থাকলেও সাধারণ পরিমাণে কাঠবাদাম খেলে খোসার কারণে শরীরে উল্লেখযোগ্য পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়, এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

তাই শুধু পুষ্টি শোষণের ভয় থেকে সবার কাঠবাদামের খোসা ছাড়িয়ে খাওয়ার প্রয়োজন নেই। যেভাবে খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেভাবেই খাবেন।

কাঠবাদাম কি সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়

কাঠবাদাম ভিজিয়ে খেলে সেটি নরম হয় এবং চিবানো সহজ হতে পারে। তবে পুষ্টিগুণ পাওয়ার জন্য সবার কাঠবাদাম সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে খাওয়া জরুরি, এমন বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা এখনো কোথাও নেই।

শুকনো কাঠবাদামও পুষ্টিকর। ভিজিয়ে খেতে চাইলে পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের তাপমাত্রায় না রেখে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করুন। ভেজানো কাঠবাদামে অস্বাভাবিক গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা নষ্ট হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলে সেটা আর না খাওয়াই ভালো।

ভেজানোর পর খোসা ছাড়াবেন কি না, তা আপনার পছন্দ এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হজমের সুবিধার ওপর নির্ভর করবে। খোসা ছাড়ালেই সব পুষ্টি বেশি পাওয়া যায়, বিষয়টা এমন না।

প্রতিদিন কতটি কাঠবাদাম খাওয়া ভালো

মনে রাখবেন, কাঠবাদাম পুষ্টিকর হলেও এতে ক্যালরির পরিমাণ বেশি। তাই খাওয়ার সময় পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

হার্ভার্ডের পুষ্টিবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৮ গ্রাম বা এক আউন্স কাঠবাদামে আনুমানিক কম-বেশি ২৩টি বাদাম থাকে। এতে প্রায় ১৬৫ ক্যালরি, ৬ গ্রাম প্রোটিন এবং ৩ গ্রাম আঁশ পাওয়া যায়।

প্রতিদিন ২০ থেকে ২৩টি আমন্ড অনেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য একটি সাধারণ পরিমাল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক পরিমাণ না। আপনার মোট ক্যালরির চাহিদা, অন্যান্য খাবার, শারীরিক কার্যকলাপ এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর আপনি কতটা বাদাম খাবেন, তার পরিমাণ নির্ভর করে।

যদি প্রতিদিন অন্য বাদাম, বীজ বা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারও খান, সেক্ষেত্রে কাঠবাদামের পরিমাণ সেই অনুযায়ী ঠিক করে নিন। অতিরিক্ত খাওয়ার বদলে সুষম খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।

কাঠবাদাম খাওয়ার কী কী উপকারিতা

কাঠবাদামে থাকা পুষ্টি শরীরের বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রাখে।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যে সহায়ক: কাঠবাদামে অসম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে। স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি এমন খাবারের পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে কাঠবাদাম খেলে রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যায়।

পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে: কাঠবাদামে থাকা প্রোটিন, আঁশ ও চর্বি তৃপ্তির অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগার ভাব কম হয়।

ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে: কাঠবাদামে ভিটামিন ই, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এগুলো শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।

আঁশের চাহিদা পূরণে সহায়তা করে: খোসাসহ কাঠবাদাম খেলে কিছু অতিরিক্ত আঁশ পাওয়া যায়, যা সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।

তবে বুঝতে হবে, কাঠবাদাম কোনো রোগের ওষুধ না। এর উপকার পেতে নিয়মিত অন্যান্য সুষম খাবার, শারীরিক কার্যকলাপ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি এটি খেতে হবে।

কারা কাঠবাদাম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

আমন্ড সাধারণত পুষ্টিকর খাবার হলেও সবার জন্য উপযুক্ত নয়।

বাদামে অ্যালার্জি থাকলে: কাঠবাদা খাওয়ার পর চুলকানি, ফোলা, শ্বাসকষ্ট বা অন্য অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে খাওয়া বন্ধ করে আগে চিকিৎসা নিন। শ্বাসকষ্ট বা গলা ফুলে যাওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে, তা খেয়াল রাখবেন।

হজমে অস্বস্তি হলে: কাঠবাদাম খাওয়ার পর পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হলে পরিমাণ কমিয়ে দেখুন। প্রয়োজনে খোসা ছাড়িয়েও খেয়ে দেখতে পারেন।

ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে: পুরো কাঠবাদাম ছোট শিশুদের শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বয়স অনুযায়ী নিরাপদভাবে গুঁড়া বা মিহি করে দেওয়া যেতে পারে।

বিশেষ খাদ্যনিয়ন্ত্রণ থাকলে: কিডনির রোগসহ কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট পুষ্টি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে কাঠবাদাম খাওয়ার পরিমাণ ঠিক করুন।

কাঠবাদামের খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া বাধ্যতামূলক না। খোসাসহ আমন্ডে আঁশ ও কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। আর খোসা ছাড়ানো কাঠবাদামও পুষ্টিকর। তাই কোন পদ্ধতিতে খেলে আপনার বেশি সুবিধা হয়, তা নিজেই বেছে নিতে পারেন।

প্রতিদিন প্রায় এক আউন্স বা ২০ থেকে ২৩টি কাঠবাদাম অনেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাধারণ পরিমাণ হতে পারে, তবে ব্যক্তিভেদে পরিমাণ বদলাতে পারে। কাঠবাদাম খাওয়ার ক্ষেত্রে বাদাম পরিষ্কার রাখা, অ্যালার্জির বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং অতিরিক্ত না খাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিভি ৯ বাংলাতে ‘Almond Nutrition: আমন্ড বাদামের খোসা কি খাওয়া উচিত?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেল থেকে নেওয়া।