বাসন মাজা বা ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখার শব্দে অনেকের অস্বস্তি হয় কেন

কখনো কি এমন হয়েছে, বাসন মাজার সময় স্টিলের থালাবাসনের ঝনঝন শব্দে গা শিরশির করে ওঠে? আবার কখনো কাচের গ্লাসে ছুরি বা চামচ ঘষার আওয়াজ বা ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখার খসখস শব্দেও অস্বস্তি হয়। কারও দাঁতে অদ্ভুত অনুভূতি হয়, আবার কেউ অস্বস্তিতে কান চেপে ধরেন। এমনকি শব্দগুলো কল্পনা করলেও অনেকের শরীরে শিরশিরে অনুভূতি বা অস্বস্তি তৈরি হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ কিছু শব্দে আমাদের শরীর এমন প্রতিক্রিয়া দেখায় কেন? এর পেছনে কি কেবল শব্দের তীব্রতা দায়ী, নাকি আমাদের মস্তিষ্কেরও বিশেষ কোনো ভূমিকা আছে? বিজ্ঞানের মতে, এ ধরনের অনুভূতির সঙ্গে আমাদের শ্রবণশক্তি, মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ আর শব্দের কম্পাঙ্ক জড়িত থাকে।
কোন শব্দগুলো শুনলে বেশি অস্বস্তি হয়?
সব শব্দ মানুষের কানে একই রকম অনুভূতি তৈরি করে না। কিছু শব্দ শুনতে ভালো লাগে, আবার কিছু শব্দ শুনলেই বিরক্তি তৈরি হয়। যেমন-
• ব্ল্যাকবোর্ডে চক ঘষার শব্দ।
• কাচের গ্লাসে ছুরি বা কাঁটাচামচ ঘষার আওয়াজ।
• স্টিলের থালায় চামচ ঘষার শব্দ।
• নখ দিয়ে কোনো খসখসে পৃষ্ঠ আঁচড়ানোর আওয়াজ।
• ধাতব কোনো বস্তু অন্য ধাতব বস্তুর সঙ্গে ঘষা লাগার শব্দ।
এসব শব্দের মধ্যে সাধারণত তীক্ষ্ণতা ও খসখসে একটা ভাব থাকে। ফলে এগুলো আমাদের শ্রবণতন্ত্রকে বেশি উদ্দীপ্ত করতে পারে।
শব্দগুলো এত বিরক্তিকর লাগে কেন?
বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের শব্দগুলো অস্বস্তি তৈরি করার অন্যতম কারণ হলো শব্দের কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি। বিশেষ করে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার হার্টজের মধ্যবর্তী কম্পাঙ্কের শব্দ মানুষের কানে বেশি অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।
২০১১ সালে অ্যাকোস্টিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকার একটি গবেষণায় ব্ল্যাকবোর্ডে চক ঘষার শব্দ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, এই শব্দের নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কগুলো মানুষের কানে বিরক্তিকর অনুভূতি তৈরি করে। বিশেষ করে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার হার্টজের মধ্যের শব্দগুলো বাদ দিলে অস্বস্তির মাত্রা কিছুটা কমে যায়। এর একটি বিশেষ কারণ হলো, মানুষের কানের গঠন এই কম্পাঙ্কের কিছু শব্দকে তুলনামূলক বেশি জোরে অনুভব করতে সাহায্য করে। ফলে সাধারণের চেয়ে শব্দটি বেশি তীক্ষ্ণ ও বিরক্তিকর মনে হতে পারে।
তবে কম্পাঙ্ক ছাড়াও শব্দের খসখসে ধরন ও তীব্রতাও অস্বস্তির মাত্রাকে প্রভাবিত কতে পারে।
মস্তিষ্কের কোন অংশ এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে?
শুধু কান দিয়ে শব্দ শুনলেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। শব্দ শোনার পর মস্তিষ্ক সেটিকে বিশ্লেষণ করে ও সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা অস্বস্তিকর শব্দ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, এ ধরনের শব্দ শোনার সময় মস্তিষ্কের দুটি অংশের মধ্যে বিশেষ যোগাযোগ তৈরি হয়। একটি হলো অডিটরি কর্টেক্স- এটি শব্দ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত। অন্যটি অ্যামিগডালা, যা ভয়, বিরক্তি ও নেতিবাচক আবেগের মতো অনুভূতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অপছন্দের কোনো শব্দ কানে পৌঁছালে অ্যামিগডালা অডিটরি কর্টেক্সের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। এতে শব্দটি আমাদের কাছে আরও বিরক্তিকর মনে হয় ও অস্বস্তি তৈরি করে।
অর্থাৎ, কোনো শব্দ কানে পৌঁছানোর পাশাপাশি মস্তিষ্ক সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করছে, তার ওপর আমাদের অস্বস্তির মাত্রা নির্ভর করে।
শব্দ শুনে দাঁত শিরশির করে কেন?
ব্ল্যাকবোর্ডে চক ঘষার শব্দ শুনলে আমাদের অনেকেরই দাঁতে শিরশিরে অনুভূতি হয়। আবার কারও চোয়াল শক্ত হয়ে আসে বা সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
এর কারণ হলো, মস্তিষ্ক শব্দের তীক্ষ্ণতা ও ঘর্ষণের শব্দকে প্রক্রিয়া করার সময় শরীরে অস্বস্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে। শব্দের প্রতি আবেগগত প্রতিক্রিয়াও এই অনুভূতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই এমন শব্দ শুনে দাঁত শিরশির করলেই যে দাঁতের কোনো সমস্যা আছে তা ভাববেন না। অনেক ক্ষেত্রে এটি শব্দের প্রতি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে।
সবাই কি একই শব্দে অস্বস্তি অনুভব করেন?
না। একই শব্দে যেমন একজনের প্রচণ্ড অস্বস্তি হতে পারে, তেমনি অন্যজনের কাছে সেটিকে একেবারেই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে-
শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা: মানুষের শ্রবণশক্তি ও শব্দ গ্রহণের ক্ষমতা এক রকম না। কেউ তীক্ষ্ণ শব্দ সহজেই সহ্য করতে পারেন, আবার কেউ সামান্য শব্দেও বিরক্ত হন।
আগের অভিজ্ঞতা: কোনো শব্দের সঙ্গে খারাপ অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি জড়িয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে সেই শব্দ শুনলেও অস্বস্তি হতে পারে।
শব্দের তীব্রতা ও ধরন: শব্দ কতটা জোরে হচ্ছে, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে আর কতটা খসখসে বা তীক্ষ্ণ, তার ওপরও অস্বস্তি নির্ভর করে।
মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া: প্রত্যেক মানুষের মস্তিষ্ক শব্দ ও আবেগকে একইভাবে গ্রহণ করে না। তাই শব্দের প্রতি প্রতিক্রিয়াও ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
মিসোফোনিয়া কী?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শব্দের প্রতি বিরক্তি আর সাধারণ অস্বস্তির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং কিছু শব্দ শুনলে তীব্র রাগ, উদ্বেগ বা মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়। এ ধরনের অবস্থাকে মিসোফোনিয়া (Misophonia) বলা হয়।
যেমন- কারও কাছে অন্যের খাবার চিবানোর শব্দ, বারবার নাক টানার শব্দ, কলম টোকানোর শব্দ বা জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দকেও অসহনীয় মনে হতে পারে।
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া সাধারণ বিরক্তির চেয়ে বেশি তীব্র হতে পারে, এমনকি মানসিক সমস্যায়ও রূপ নিতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সব অস্বস্তিকর শব্দের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়াকেই মিসোফোনিয়া বলা যায় না।
অস্বস্তিকর শব্দ থেকে স্বস্তি পেতে কী করবেন?
কোনো শব্দে অস্বস্তি হলে প্রথমেই সম্ভব হলে সেখান থেকে দূরে সরে যান। পাশাপাশি কিছু বিষয় অনুসরণ করতে পারেন-
• দীর্ঘক্ষণ তীক্ষ্ণ ও বিরক্তিকর শব্দের মধ্যে থাকবেন না।
• প্রয়োজন হলে শব্দের উৎস থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন।
• কাজের পরিবেশে অতিরিক্ত শব্দ হলে উপযুক্ত শ্রবণ সুরক্ষা ব্যবহার করতে পারেন।
• শব্দের কারণে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অর্থাৎ, বাসন মাজা, ধাতব বস্তু ঘষা বা ব্ল্যাকবোর্ডে চক লেখার শব্দে অস্বস্তি হওয়ার পেছনে শুধু কানের ভূমিকা নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শব্দের কম্পাঙ্ক, মস্তিষ্কের শব্দ প্রক্রিয়াকরণ ও আবেগের প্রতিক্রিয়া। তাই কোনো কোনো শব্দ আমাদের কাছে সাধারণ মনে হলেও মস্তিষ্ক সেটিকে অস্বস্তিকর সংকেত হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
তথ্যসূত্র
Healthline: Understanding Misophonia: When Everyday Sounds Cause Distress
Newcastle University: Nasty noises: Why do we recoil at unpleasant sounds?
TV9 Bangla
