ভারী খাবারের পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করে, অভ্যাস নাকি পেছনে অন্য কারণ

দাওয়াত, বিয়ে বাড়ি বা নিজের বাড়িতেই হোক, ভরপেট খাওয়ার পর মিষ্টি কিছু না খেলে বাঙালির খাবারের ব্যাপারটা ঠিক জমে ওঠে না। খাবার খাওয়ার পর পেট ভরে গেলেও অনেকেরই মিষ্টি, চকোলেট বা মিষ্টিজাতীয় কিছু খেতে ইচ্ছা করে । বিশেষ করে, দুপুর বা রাতের ভারী খাবারের পর মিষ্টি খাওয়ার এই প্রবণতাকে অনেকে সাধারণ অভ্যাস বলে মনে করেন।
কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, পেট ভরা থাকলেও কেন মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে হয়? এটা কি শুধুই অভ্যাস, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে?
পুষ্টিবিদদের মতে, খাবারে পুষ্টিগুণের ঘাটতি, রক্তে শর্করার ওঠানামা বা দীর্ঘদিনের মানসিক অভ্যাসের কারণে এমনটা হতে পারে।
খাবারের পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছা হওয়ার কারণ
বারবার খাবারের পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছা হওয়ার কারণ জেনে নিন-

রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামা: ভাত, রুটি বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। তখন শরীর ইনসুলিন নিঃসরণ করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে কিছু ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। এর ফলে শরীরে ক্লান্তি আসে বা শক্তির অভাব অনুভূত হয়। তাই এ সময় দ্রুত শক্তির উৎস হিসেবে মিষ্টি খাবার খেতে ইচ্ছা করে।
খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার এই অবস্থাকে ‘রিঅ্যাক্টিভ হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলা হয়। তবে খাবারের পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করলেই যে এই সমস্যা আছে, তা না।
খাবারে প্রোটিন ও ফাইবারের ঘাটতি: শুধু ভাত বা রুটি খেয়ে পেট ভরলেও, এ ধরনের খাবার থেকে শরীর সব প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার না থাকলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি হয় না। ফলে খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবার অন্য কিছু খেতে ইচ্ছা করতে পারে।

প্রোটিন হজমের প্রক্রিয়াকে ধীর করে আর পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাবারে ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি।
দীর্ঘদিনের খাবারের অভ্যাস: অনেকের ছোটবেলা থেকেই দুপুর বা রাতের খাবারের পর মিষ্টি কিছু খাওয়ার অভ্যাস থাকে। পরিবারের সঙ্গে খাবারের পর ডেজার্ট খাওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট সংযোগ তৈরি করে।
ফলে পেট ভরা থাকলেও খাবার শেষ হওয়ার পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করতে পারে। এটি সব সময় শরীরের পুষ্টির চাহিদার কারণে হয় না, দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকেও এমনটা হতে পারে।
মিষ্টি খাওয়ার ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা: ওজন নিয়ন্ত্রণ বা সুস্থ থাকার জন্য অনেকে খাবারের তালিকা থেকে মিষ্টি পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন। কিন্তু কোনো খাবার খাওয়ার ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা দিলে সেটির প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই মিষ্টি একেবারে বাদ না দিয়ে পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব: মানুষের অন্ত্রে থাকা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া হজম প্রক্রিয়া ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া মানুষ যা খায় তার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চিনি ও সাধারণ কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার ফলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে।
মানসিক আনন্দের সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক: মিষ্টি খাবার খেলে সাময়িকভাবে ভালো লাগতে পারে। মিষ্টি খেলে অনেকের ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ হয়, যা মনকে খুশি রাখে। মস্তিষ্কের পুরস্কার বা রিওয়ার্ড ব্যবস্থার সঙ্গে মিষ্টি খাবারের সম্পর্ক আছে। ফলে মন খারাপ, একঘেয়েমি বা মানসিক চাপের সময় কারও কারও মিষ্টির প্রতি আগ্রহ বেড়ে যেতে পারে।

খাবারের পর মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা কমাবেন যেভাবে
খাবারের পর মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা কমাতে প্রথমেই প্রতিদিনের খাবারের দিকে নজর দিতে হবে।
- প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখুন।
- শুধু ভাত বা রুটির ওপর নির্ভর না করে খাবারের তালিকায় মাছ, ডিম, ডাল ও শাকসবজি রাখতে পারেন।
- দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকবেন না। ক্ষুধা অনুযায়ী নিয়মিত ও সুষম খাবার গ্রহণ করুন।
- মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা হলে সঙ্গে সঙ্গে না খেয়ে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে ইচ্ছেটি কমে যায় কি না, খেয়াল করুন।
- মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা হলেই নিজেকে কঠোরভাবে বাধা দেবেন না। বরং পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

খাবারের পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করা কি চিন্তার কারণ?
খাবারের পর অল্প মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করা সব সময় কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ না। অনেক সময় এটি স্বাভাবিক অভ্যাস বা ব্যক্তিগত পছন্দের কারণেও হতে পারে।
তবে মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ যদি খুব বেশি হয় এবং এর সঙ্গে অতিরিক্ত ক্ষুধা, কাঁপুনি, ঘাম, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করতে পারেন।
সূত্র: TV9 Bangla, Nutritionist Resource

