logo

রহস্যময় শিল্পী ‘ব্যাংকসি’র পরিচয় জানা গেল

রহস্যময় শিল্পী ‘ব্যাংকসি’র পরিচয় জানা গেল

বিপর্যস্ত এক ছোট্ট মেয়ে হাত বাড়িয়ে রয়েছে, তার সামনে দিয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে ভালোবাসা আকৃতির একটা লাল বেলুন। দুনিয়া কাঁপিয়ে দেওয়া এ ছবি কোনো ক্যানভাসে নয়, আঁকা ছিল রাস্তার ধারে এক দেয়ালে। নাম ছিল—গার্ল উইথ বেলুন। কে, কখন, কীভাবে দেয়ালে এই ছবি এঁকে দিয়ে গেল, জানা যায়নি। শিল্পীর পরিচয় জানা যায়নি বহু বছর ধরে, শুধু একটা নামই থাকত- ব্যাংকসি। 

তিন দশকের মতো সময় বিশ্বের অজস্র দেশে বিভিন্ন শহরে রাজনৈতিক বার্তাসমৃদ্ধ শিল্পকর্ম রেখে চলা এই শিল্পীর পরিচয় এক সুদীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা গেছে বলে দাবি করছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। 

এই অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ব্যাংকসির আসল নাম রবিন গানিংহাম, যার জন্ম ১৯৭৩ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে। তদন্তে আরও দেখা গেছে, গানিংহাম পরে আইনিভাবে নিজের নাম পরিবর্তন করে ডেভিড জোনস রাখেন। রয়টার্স নিশ্চিত করেছে, জোনস নামের পরিচয় ব্যবহারকারী একজন ব্যক্তি ২০২২ সালের শেষদিকে ইউক্রেনে ভ্রমণ করছিলেন। সে সময় সেখানে ব্যাংকসির বেশ কিছু দেয়ালচিত্র দেখা যায়।
 
রয়টার্স যে প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে ২০০০ সালের একটি পুলিশ রিপোর্ট ও আদালতের নথি। সেখানে বলা হয়, নিউইয়র্কে একটি বিলবোর্ডে ভাঙচুরের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া একজন ব্যক্তি গানিংহামের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়।

 ওই রিপোর্টে উল্লেখ আছে, তিনি অপরাধ স্বীকার করেন এবং নিজের ঠিকানা হিসেবে কার্লটন আর্মস হোটেলের নাম দেন। তবে গানিংহামে নাম কিন্তু এর আগেও ব্যাংকসির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ গানিংহামই যে ব্যাংকসি—এই দাবি আগেও করা হয়েছিল। তবে তার পক্ষে সেভাবে যুক্তি-প্রমাণ আনা যায়নি। ২০০৮ সালে দ্য মেইল অন সানডে পত্রিকার এক প্রতিবেদনে তার প্রতিবেশী ও কিছু ছবির ভিত্তিতে একই দাবি করা হয়েছিল, যদিও তার বাবা তখন তা অস্বীকার করেছিলেন।

রবিন গানিংহাম পরে নিজের নাম পরিবর্তন করে ডেভিড জোনস রাখার পর আবার নাম পরিবর্তন করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। ব্যাংকসির দীর্ঘদিনের আইনজীবী মার্ক স্টিফেন্স এই প্রতিবেদনের বিষয়ে বলেছেন, ‘এই অনুসন্ধানে যে অনেক তথ্য দেওয়া হয়েছে, শিল্পী সেগুলো সঠিক বলে মানেন না, তবে তিনি সরাসরি পরিচয় নিশ্চিতও করেননি, কিংবা অস্বীকারও করেননি। 

ব্যাংকসির সাবেক ম্যানেজার স্টিভ ল্যাজারাইডস রয়টার্সকে বলেন, ‘তোমার আসলে একটা প্রেতাত্মার পেছনে ধাওয়া করে যাচ্ছো। রবিন গানিংহাম বলে কেউ নেই। যে নামটা তোমরা পেয়েছ, সেটা বহুদিন আগেই আমি নিজে নিশ্চিহ্ন করেছি। কাজেই তাকে কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

‘ব্যাংকসি’ দীর্ঘদিন ধরেই নিজের পরিচয় গোপন রেখে বিশ্বজুড়ে দেয়ালে স্টেনসিল আর্ট তৈরি করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার অনেক শিল্পকর্ম নিলামে মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকসির পরিচয় প্রকাশ পেলেও তার শিল্পজগতের প্রভাব খুব একটা বদলাবে না। ব্যাংকসির বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে গার্লস উইথ বেলুন (Girl with Balloon), দাভ ইজ ইন দ্য এয়ার (Love Is in the Air) এবং ডেভেলপমেন্ট পার্লামেন্ট (Devolved Parliament)। 

২০১৪ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া এইচএম রিডিং কারাগার থেকে পালানোর জন্য টাইপরাইটারের কাগজ ব্যবহার করে একজন বন্দীর ছবিটি এঁকেছিলেন ব্যাংকসি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালে নিউইয়র্কে একটি ভবনের ছাদে উঠে মার্ক জেকবসের একটি বিলবোর্ডে আঁকিবুঁকি করার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে সোথেবির এক নিলামে ‘গার্লস উইথ বেলুন’ বিক্রির সময় ছবিটি হঠাৎ একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কেটে যায়। সে সময় আর্ট ডিলার রবার্ট ক্যাস্টারলাইন রয়টার্সকে জানান, অদ্ভুত ধরনের চশমা পরা এক ব্যক্তি দর্শকদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিলেন। পরে সেই ঘটনার ভিডিও ব্যাংকসির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়।

ব্যাংকসির পরিচয় প্রকাশের বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন ব্র্যান্ডলার আর্ট গ্যালারির ডিরেক্টর জন ব্র্যান্ডলার। তার মতে, ব্যাংকসির পরিচয় প্রকাশ না হওয়া উচিত, তিনি অচেনা থেকে গেলেই সেটা সবার জন্য ভালো। তাতে করে তিনি নিশ্চিন্তে রাস্তায় হেঁটে যেতে পারবেন, মানুষজনও বিভিন্ন সময় তার কাজ দেখতে পারবে।
 
সূত্র: রয়টার্সের ‘ইন সার্চ অব ব্যাংকস ‘ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবলম্বনে অনূদিত।