logo

ভ্রমণে বমি হয় মোশন সিকনেসের কারণে, থাকছে সহজ প্রতিকার

ভ্রমণে বমি হয় মোশন সিকনেসের কারণে, থাকছে সহজ প্রতিকার

গাড়ি, বাস, ট্রেন বা নৌকায় উঠলেই অনেকের মাথা ঘোরা শুরু হয়, বমি বমি লাগে বা বমি হয়ে যায়। ভ্রমণের আনন্দ তখন একেবারেই মাটি হয়ে যায়। এই সমস্যাটি খুবই পরিচিত এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় মোশন সিকনেস।

কেন ভ্রমণের সময় এমন হয়, শরীরের কোন অংশ এর জন্য দায়ী এবং কীভাবে এই সমস্যা কমানো যায়, তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

মোশন সিকনেস কী

মোশন সিকনেস এমন একটি অবস্থা, যেখানে ভ্রমণের সময় মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, অস্থিরতা এবং বমি বমি ভাব দেখা দেয়। অনেক সময় বমিও হয়ে যায়। এই সমস্যা গাড়ি, বাস, ট্রেন, জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজে ভ্রমণের সময় হতে পারে। পাহাড়ি পথে চলার সময় অনেকের সমস্যা আরও বেড়ে যায়।

সমুদ্র বা আকাশপথে যে মোশন সিকনেসের অস্বস্তি হয়, সড়কপথের সমস্যার সঙ্গেও তার মিল রয়েছে।

ভ্রমণের সময় কেন এমন হয়

চিকিৎসকদের মতে, ভ্রমণের সময় চোখ, কান ও শরীরের ভারসাম্য রক্ষাকারী অংশ থেকে মস্তিষ্কে ভিন্ন ভিন্ন সংকেত যায়। এই সংকেতগুলোর মধ্যে মিল না থাকলেই সমস্যা শুরু হয়।

যেমন, আপনি যদি গাড়িতে বসে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন বা বই পড়েন, তখন চোখ মস্তিষ্ককে জানায় যে শরীর স্থির আছে। কিন্তু কানের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষাকারী অংশ ঠিকই বুঝতে পারে যে, শরীর নড়াচড়া করছে। এই দ্বন্দ্বে মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

মস্তিষ্ক তখন ভুলভাবে ধরে নেয় যে, শরীরে ক্ষতিকর কিছু ঢুকেছে। শরীরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বমি বমি ভাব বা বমি শুরু হয়। এটিই মোশন সিকনেসের মূল কারণ।

জানালা দিয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ ও কানের সংকেতের মধ্যে মিল আসে। এতে অস্বস্তি অনেকটাই কমে।

শরীরের ভেতরে কী ঘটে

চিকিৎসকদের ভাষায়, আমাদের শরীরে কিছু বিশেষ সেন্সর বা রিসেপটর আছে। এগুলো শরীরের নড়াচড়া ও অবস্থান সম্পর্কে মস্তিষ্ককে তথ্য দেয়। ভ্রমণের সময় চোখ, কানের ভেতরের ব্যালেন্স সিস্টেম এবং পেশি থেকে আসা তথ্য একে অপরের সঙ্গে না মিললে মস্তিষ্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

ফলে মস্তিষ্কের কিছু অংশ সক্রিয় হয়ে মাথা ঘোরা, অস্বস্তি এবং বমির অনুভূতি তৈরি করে।

ভ্রমণে বমি বমি ভাব বাড়ে কেন

সবার ক্ষেত্রে এই সমস্যা এক রকম নয়। কেউ যাত্রা শুরুর পরপরই অস্বস্তি অনুভব করেন, আবার কারও দীর্ঘ সময় পর সমস্যা শুরু হয়।

উঁচু-নিচু রাস্তা, পাহাড়ি পথ, গাড়ির ঝাঁকুনি, ভেতরের বাজে গন্ধ এবং অতিরিক্ত গরম এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে বলে জানাচ্ছে বিবিসি বাংলা-এর একটি প্রতিবেদন।

চিকিৎসকদের মতে, ভ্রমণের সময় মস্তিষ্কের ভেতরের তরল পদার্থ নড়াচড়া করে। এতে ভারসাম্যে সমস্যা হয় এবং গলা ও মাথার মাধ্যমে অস্বস্তি বাড়তে থাকে। সহ্যসীমা ছাড়ালে বমি হয়ে যায়।

পাকস্থলীর অবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। খালি পেটে ভ্রমণ করলে বা আবার খুব ভারী খাবার খেয়ে রওনা হলে বমির আশঙ্কা বেড়ে যায়। এ কারণে ভ্রমণের আগে হালকা খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

মোশন সিকনেস কখনো কখনো অন্য রোগের লক্ষণ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে। খুব বেশি বা নিয়মিত বমি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ভ্রমণে বমি এড়াতে যা করবেন

- ভ্রমণের আগে খুব ভারী খাবার খাবেন না।

- একেবারে খালি পেটেও ভ্রমণ করবেন না। হালকা খাবার বা স্ন্যাকস খেতে পারেন।

- প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বমি প্রতিরোধক ওষুধ নিতে পারেন।

- চলন্ত গাড়িতে বই পড়া বা মোবাইল ফোন বেশি ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।

- জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকুন।

- মাথা, ঘাড় ও শরীর যতটা সম্ভব স্থির রাখুন।

- সামনের আসনে বসার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে নিজে গাড়ি চালান।

- ধূমপান বা নিকোটিন এড়িয়ে চলুন।

- হালকা ও মন ভালো করা গান শুনলে অনেকের অস্বস্তি কমে।

- বমি বমি লাগলে সুযোগ পেলে গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন।

- ক্রমাগত বমি হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।

নারীদের মধ্যে কি এই সমস্যা বেশি

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

নারীদের রক্তচাপ সাধারণত পুরুষদের তুলনায় কম থাকে। কম রক্তচাপে মোশন সিকনেসের লক্ষণ দ্রুত দেখা দিতে পারে। অনেক নারী দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করেন, এতে হঠাৎ রক্তচাপ কমে গিয়ে মাথা ঘোরা ও বমি বমি ভাব বাড়তে পারে।

এ ছাড়া নারীদের শরীরে নিয়মিত হরমোনের পরিবর্তন হয়। মাসিকের সময় লবণ ও পানির ভারসাম্য বদলে যায়, কখনো রক্তচাপ আরও কমে যেতে পারে। এসব কারণেও মোশন সিকনেসের ঝুঁকি বাড়ে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

ভ্রমণে বমি হওয়া খুব সাধারণ একটি সমস্যা। তবে কেন এটি হয় এবং কীভাবে এড়ানো যায়, তা জানা থাকলে ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সহজ কিছু অভ্যাস, সঠিক খাবার এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভ্রমণ হতে পারে অনেক বেশি আরামদায়ক।