logo
Advertisement

হাঁপানির রোগীদের জন্য রান্নাঘরের কোন চুলা ভালো

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ
হাঁপানির রোগীদের জন্য রান্নাঘরের কোন চুলা ভালো
ছবি: এনডিটিভি

রান্নাঘরের চুলা নিয়ে সাধারণত চিন্তা থাকে গ্যাসের বিল, রান্নার সময় বা চুলা পরিষ্কার করা নিয়ে। কিন্তু চুলার ধরন ঘরের বাতাস এবং শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গ্যাসের চুলায় রান্নার সময় নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন দূষক তৈরি হয়, যা শ্বাসনালিতে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে এবং হাঁপানির উপসর্গ বাড়াতে পারে।

Advertisement

সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল না, তাদের বাড়ির গ্যাসের চুলা সরিয়ে ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন চুলা বসানোর পর হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। একই সময়ে ঘরের ভেতরের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাও প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে।

তবে গবেষণাটি ছোট পরিসরের এবং এতে গ্যাসের চুলা ব্যবহার অব্যাহত রাখা কোনো নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না। তাই ইলেকট্রিক চুলা বদলালেই সবার হাঁপানি ভালো হবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। গবেষকেরাও দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়ন্ত্রিত গবেষণার প্রয়োজনের কথা বলেছেন।

গ্যাসের চুলায় কীভাবে দূষণ তৈরি হয়?

প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে রান্না করার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড বা NO₂ তৈরি হতে পারে। এটি একটি শ্বাসতন্ত্রের জ্বালাপ্রদায়ক দূষক।

রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে এই গ্যাস ঘরের ভেতরে জমতে পারে। ফলে রান্নার সময় বা রান্নার পরও পরিবারের সদস্যরা এর সংস্পর্শে আসতে পারেন। যাদের হাঁপানি বা অন্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তারা এ ধরনের দূষকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতে পারেন।

আগের গবেষণাতেও গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা বাড়িতে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করা বাড়ির তুলনায় ঘরের ভেতরের NO₂-এর মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। শিশুদের ক্ষেত্রেও ঘরের NO₂-এর সংস্পর্শের সঙ্গে হাঁপানির বিভিন্ন উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

নতুন গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

২০২৬ সালে Journal of Allergy and Clinical Immunology: In Practice-এ প্রকাশিত গবেষণায় হাঁপানিতে আক্রান্ত ৮৫ জন শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের সবার হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল না এবং তারা এমন বাড়িতে থাকতেন যেখানে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা হতো।

গবেষকেরা প্রতিটি বাড়ির গ্যাসের চুলা সরিয়ে ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন চুলা বসিয়ে দেন। চুলা বদলানোর আগে এবং দুই থেকে তিন মাস পর অংশগ্রহণকারীদের হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি ঘরের ভেতরের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাও মাপা হয়।

ছবি: শিকাগো ইএনটি
ছবি: শিকাগো ইএনটি

ফলাফলে দেখা যায়, হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের স্কোর গড়ে ২ দশমিক ৬ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ হয়েছে। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের হাঁপানির নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

গবেষণার আগে যেখানে অংশগ্রহণকারীদের গড়ে মাঝারি মাত্রার উপসর্গ ছিল, পরে তা হালকা মাত্রার দিকে নেমে আসে। একই সময়ে ঘরের ভেতরের NO₂-এর মাত্রা ২১ পিপিবি থেকে কমে ৬ দশমিক ৩ পিপিবিতে নেমে যায়, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ কমে।

জরুরি বিভাগে যাওয়া ও হাসপাতালে ভর্তি কমেছে

গবেষণার আরও একটি উল্লেখযোগ্য ফল হলো হাঁপানির কারণে জরুরি বিভাগে যাওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও কমেছে।

চুলা পরিবর্তনের আগের চার সপ্তাহে ১০ জন অংশগ্রহণকারী, অর্থাৎ ১১ দশমিক ৮ শতাংশের জরুরি বিভাগে যেতে হয়েছিল বা হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। চুলা পরিবর্তনের দুই থেকে তিন মাস পরের চার সপ্তাহে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩ জন বা ৩ দশমিক ৫ শতাংশে।

এ ছাড়া হাঁপানির কারণে কাজ বা স্কুলে অনুপস্থিত থাকার দিনও কমেছে।

তবে এই ফলাফলকে সরাসরি ইলেকট্রিক চুলার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ৭০ শতাংশ কমেছে বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। গবেষণাটিতে তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৫ জন। ফলে অন্যান্য কারণও ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু হাঁপানির রোগীরাই কি ঝুঁকিতে?

গ্যাসের চুলা থেকে তৈরি NO₂ শুধু হাঁপানির রোগীদের জন্যই আলোচনার বিষয় নয়। এই দূষক শ্বাসনালিতে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হাঁপানি বা অন্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে দূষিত ঘরের বাতাস শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকে চাপ বা শোঁ শোঁ শব্দের মতো উপসর্গ বাড়াতে পারে। শিশুদের ওপর করা আগের গবেষণাতেও ঘরের NO₂-এর মাত্রার সঙ্গে হাঁপানির বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গ্যাসের চুলা থাকলে কী করবেন?

সবার পক্ষে গ্যাসের চুলা বদলে ইলেকট্রিক চুলা কেনা সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুতের সংযোগ, রান্নাঘরের অবকাঠামো এবং চুলার খরচ অনেক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তাই গ্যাসের চুলা ব্যবহার করলেও রান্নাঘরের বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ভালো রাখা জরুরি। রান্নার সময় সম্ভব হলে রান্নাঘরের জানালা খুলে রাখা বা বাইরে বাতাস বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

রান্নার সময় অতিরিক্ত ধোঁয়া তৈরি না করা এবং চুলা ও রান্নাঘর পরিষ্কার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ এক্সহস্ট ফ্যান বা হুড কতটা কার্যকর হবে, তা তার ধরন ও বাইরে বাতাস বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে।

আগের একটি গবেষণায় গ্যাসের চুলার বদলে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করলে ঘরের NO₂-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। একই গবেষণায় নির্দিষ্ট ধরনের এয়ার পিউরিফায়ারও কিছুটা NO₂ কমাতে পেরেছিল।

ইলেকট্রিক চুলা কি হাঁপানির চিকিৎসা?

না। ইলেকট্রিক চুলায় পরিবর্তন করা হাঁপানির চিকিৎসার বিকল্প নয়।

হাঁপানির রোগীদের চিকিৎসকের দেওয়া ইনহেলার বা অন্য ওষুধ নির্ধারিত নিয়মে চালিয়ে যেতে হবে। ধুলো, ধোঁয়া, পরাগরেণু, সিগারেটের ধোঁয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো অন্য ট্রিগার থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে। গবেষণার লেখকেরাও বলেছেন, চুলা পরিবর্তন হাঁপানির নিরাময় নয় এবং এটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে।

বাংলাদেশের রান্নাঘরের ক্ষেত্রে বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে অনেক পরিবার গ্যাস, এলপিজি বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করে রান্না করে। ফলে ঘরের ভেতরের বায়ু চলাচল এবং রান্নার ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নতুন গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা ৮৫ জন হাঁপানি রোগীর ওপর পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশের রান্নাঘর, জ্বালানি ব্যবহারের ধরন, ঘরের আকার ও বায়ু চলাচলের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাই গবেষণার ফলাফল সরাসরি বাংলাদেশের সব পরিবারের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এমনটা বলা যায় না।

ছবি: কনজিউমার রিপোর্টস
ছবি: কনজিউমার রিপোর্টস

তারপরও একটি বিষয় পরিষ্কার, রান্নার সময় ঘরের ভেতরে তৈরি দূষক শ্বাসযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই হাঁপানির রোগী থাকা পরিবারে রান্নাঘরের বায়ু চলাচল ভালো রাখা এবং ধোঁয়া ও দূষকের সংস্পর্শ কমানোর চেষ্টা করা উপকারী।

হাঁপানির রোগীর জন্য কোন বিষয়গুলো বেশি জরুরি?

গ্যাসের চুলা বদলানোর সুযোগ থাকলে তা একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে, বিশেষ করে হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে না থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। তবে এর পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁপানির ওষুধ ব্যবহার করা
  • রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা
  • সিগারেটের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকা
  • ঘরের ধুলা ও ধুলিকণা নিয়ন্ত্রণ করা
  • হাঁপানির ব্যক্তিগত ট্রিগারগুলো চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলা
  • বারবার শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা

গ্যাসের চুলা শুধু রান্নার জন্য ব্যবহৃত একটি যন্ত্র নয়, এটি ঘরের ভেতরের বায়ুর মানকেও প্রভাবিত করতে পারে। নতুন একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, গ্যাসের চুলার বদলে ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহারের পর ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত না থাকা হাঁপানির রোগীদের উপসর্গ কমেছে এবং ঘরের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে।

তবে গবেষণাটি ছোট এবং এতে নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না। তাই এই ফলাফলকে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বা হাঁপানির নতুন চিকিৎসা হিসেবে দেখা যাবে না। বরং গবেষণাটি ঘরের বায়ুদূষণ এবং হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কের দিকে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যাদের হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে নেই, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রান্নার ধোঁয়া ও গ্যাসের চুলা থেকে তৈরি দূষকের সংস্পর্শ কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা যেতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি