অনলাইনে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করবেন যেভাবে, কী লাগবে আবেদনে

ব্যাংক হিসাব খোলা, সঞ্চয়পত্র কেনা, ব্যবসা, ভিসার আবেদন কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে অনেকেই ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন নিয়ে থাকেন। কিন্তু পরে সেই প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলেও টিআইএন সক্রিয় থেকে যায়। তখন আয়কর রিটার্নসহ বিভিন্ন করসংক্রান্ত কাজ নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে শুধু টিআইএন আর ব্যবহার করছেন না, এমন কারণেই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। নির্দিষ্ট কারণ ও শর্ত পূরণ হলে টিআইএন নিবন্ধন বাতিলের জন্য আবেদন করা যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সার্কেলের উপকর কমিশনার আবেদন, পরিদর্শন বা শুনানির ভিত্তিতে টিআইএনের কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন।
কোন ক্ষেত্রে টিআইএন বাতিল করা যায়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের FAQ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির আয় আয়কর আরোপযোগ্য সীমার নিচে নেমে গেলে এবং নিকট ভবিষ্যতেও তার আয় ন্যূনতম আয়কর প্রদানের আওতায় আসবে না বলে মনে হলে টিআইএন বাতিলের জন্য আবেদন করা যেতে পারে।
এ ছাড়া ব্যবসা বা আয়ের উৎস স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, ভুল করে একাধিক টিআইএন তৈরি হওয়া বা অন্য কোনো বৈধ কারণে টিআইএন আর প্রয়োজন না থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্ত ও নথি আলাদা হতে পারে।
অনলাইনে টিআইএন বাতিলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
অনলাইনে টিআইএন বাতিলের বিষয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সরাসরি অনলাইন ফর্ম পূরণ করে বাতিলের কথা বলা হচ্ছে। তবে এনবিআরের নিজস্ব FAQ-তে টিআইএন বাতিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের উপকর কমিশনারের কাছে কারণ ব্যাখ্যা করে আবেদন করার কথা বলা হয়েছে। উপকর কমিশনার আবেদন, পরিদর্শন বা শুনানির মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারেন।
তাই অনলাইনে কোনো আবেদন অপশন দেখা গেলেও সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে টিআইএন বাতিল হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। আবেদন অনুমোদিত হয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
টিআইএন বাতিলের জন্য কীভাবে আবেদন করবেন
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি এভাবে এগিয়ে নিতে পারেন।
নিজের টিআইএন ও কর সার্কেল খুঁজে নিন
আপনার টিআইএন সার্টিফিকেটে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল ও সার্কেলের তথ্য থাকে। টিআইএন বাতিলের আবেদন করার সময় এই তথ্য প্রয়োজন হবে। এনবিআর জানিয়েছে, অনলাইনে টিআইএন নিবন্ধনের সময় করদাতার সনদের সঙ্গে কর অঞ্চল ও কর সার্কেলের তথ্যও দেওয়া হয়।
টিআইএন বাতিলের কারণ নির্ধারণ করুন
কেন টিআইএন বাতিল করতে চান, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। যেমন, করযোগ্য আয় না থাকা বা ভবিষ্যতে ন্যূনতম আয়কর প্রদানের আওতায় আসার সম্ভাবনা না থাকা।
শুধু রিটার্ন জমা দেওয়ার ঝামেলা এড়ানোর জন্য টিআইএন বাতিলের আবেদন করলেই তা অনুমোদিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন
আবেদনের ধরন অনুযায়ী টিআইএন সার্টিফিকেট, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট কারণের সমর্থনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগতে পারে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে ব্যবসা বন্ধের প্রমাণ বা অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতি থাকলে তার প্রমাণও প্রয়োজন হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারের কাছে আবেদন করুন
এনবিআরের FAQ অনুযায়ী, টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট সার্কেলের উপকর কমিশনারের কাছে কারণ ব্যাখ্যা করে আবেদন করতে হয়। এরপর আবেদনটি যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিদর্শন বা শুনানি হতে পারে।
আবেদন অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করুন
শুধু আবেদন জমা দেওয়াই টিআইএন বাতিলের শেষ ধাপ নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদন অনুমোদন করে টিআইএনের কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করলে তবেই বিষয়টি সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরা যাবে।
অনলাইনে রিটার্ন আর টিআইএন বাতিল এক বিষয় নয়
অনেকেই মনে করেন, অনলাইনে রিটার্ন দেওয়া বন্ধ করে দিলেই টিআইএন বাতিল হয়ে যাবে। বিষয়টি এমন নয়।
এনবিআরের e-Return ব্যবস্থায় অনলাইনে রিটার্ন জমা, টিআইএন সার্টিফিকেট, রিটার্নের রেকর্ড ও ট্যাক্স সার্টিফিকেট ডাউনলোডের মতো সুবিধা রয়েছে। কিন্তু রিটার্ন দাখিল বন্ধ করা আর টিআইএন নিবন্ধন বাতিল করা আলাদা বিষয়।
তাই টিআইএন প্রয়োজন না থাকলে নিয়ম মেনে বাতিলের আবেদন করা ভালো।
রিটার্ন বাকি থাকলে কী হবে
টিআইএন বাতিলের আবেদন করার আগে আগের কোনো রিটার্ন বা করসংক্রান্ত দায়িত্ব বাকি আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। কারণ টিআইএন বাতিলের আবেদন করলেই আগের করসংক্রান্ত দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল না করলে আইন অনুযায়ী জরিমানার বিধান রয়েছে।
তাই দীর্ঘদিন রিটার্ন না দিয়ে থাকলে আগে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিজের অবস্থান জেনে নেওয়া নিরাপদ।
মৃত ব্যক্তির টিআইএন কি বাতিল করা যায়
কোনো করদাতার মৃত্যু হলে তার টিআইএন বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে। এনবিআর বলছে, টিআইএন আর প্রয়োজন না থাকলে উত্তরাধিকারীরা সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারের কাছে বাতিলের আবেদন করতে পারেন। তবে মৃত ব্যক্তির নামে ব্যবসা বা অন্য কোনো কার্যক্রম থাকলে টিআইএন বাতিলের আগে বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।
টিআইএন বাতিলের আগে যেসব বিষয় দেখবেন
টিআইএন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করে নিন।
- বর্তমানে আপনার করযোগ্য আয় আছে কি না
- ভবিষ্যতে টিআইএন প্রয়োজন হতে পারে কি না
- কোনো ব্যবসা বা পেশাগত কার্যক্রম টিআইএনের সঙ্গে যুক্ত আছে কি না
- আগের কোনো আয়কর রিটার্ন বা করসংক্রান্ত কাজ বাকি আছে কি না
- কোনো সরকারি বা বেসরকারি সেবায় টিআইএন প্রয়োজন হচ্ছে কি না
- আপনার টিআইএনের অধীনে কোনো ব্যবসা বা সম্পদসংক্রান্ত বিষয় রয়েছে কি না
বিশেষ করে ভবিষ্যতে টিআইএন প্রয়োজন হতে পারে এমন পরিস্থিতি থাকলে আগে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কোথায় তথ্য পাবেন
টিআইএন, আয়কর রিটার্ন এবং করসংক্রান্ত সেবার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে পারেন। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্য এনবিআরের e-Return ব্যবস্থাও রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিআইএন বাতিলের আবেদন করা এবং টিআইএন বাতিল হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। আপনার আবেদন সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে কি না, সেটি নিশ্চিত করার পরই টিআইএন বাতিল হয়েছে বলে ধরে নিন।
সূত্র
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর FAQ, ইংরেজি সংস্করণ