অ্যাপল সিডার ভিনেগার খাওয়ার আগে সতর্ক হোন, ৭ ধরনের মানুষের ঝুঁকি বেশি

ওজন কমানো, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ বা হজম ভালো রাখার আশায় অনেকেই নিয়মিত অ্যাপল সিডার ভিনেগার বা ACV পান করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শে এটিকে অনেক সময় দ্রুত ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবেও তুলে ধরা হয়। কিন্তু অ্যাপল সিডার ভিনেগার কোনো ঝুঁকিহীন স্বাস্থ্যকর পানীয় নয়।
এতে থাকা অ্যাসিটিক অ্যাসিডের কারণে অতিরিক্ত বা ভুলভাবে খেলে নানা সমস্যা হতে পারে। বিশেষ কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
অ্যাপল সিডার ভিনেগার কী
আপেল গাঁজন করে তৈরি করা হয় অ্যাপল সিডার ভিনেগার। এতে প্রধানত অ্যাসিটিক অ্যাসিড থাকে। খাবারে অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা এবং স্বাস্থ্য উপকারের আশায় নিয়মিত পান করা এক বিষয় নয়।
অ্যাপল সিডার ভিনেগারের ওজন কমানো বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মতো সম্ভাব্য উপকার নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট উচ্চমানের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা নেই। একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায়ও বলা হয়েছে, মানুষের ওপর অ্যাপল ভিনেগারের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
তাই শুধু ওজন কমানোর আশায় প্রতিদিন অ্যাপল সিডার ভিনেগার পান করাকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
অ্যাপল সিডার ভিনেগারের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে পারে
অ্যাপল সিডার ভিনেগার অ্যাসিডিক হওয়ায় বারবার দাঁতের সংস্পর্শে এলে দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ বা এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে দাঁত শিরশির করা, সংবেদনশীলতা বাড়া এবং দীর্ঘমেয়াদে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যাদের দাঁতের এনামেল আগে থেকেই ক্ষয় হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এমন অবস্থায় নিয়মিত ACV পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
পেটের অস্বস্তি ও বমিভাব হতে পারে
অ্যাপল সিডার ভিনেগার কিছু মানুষের পেটে জ্বালা, বমিভাব, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বেশি পরিমাণে পান করলে এসব সমস্যা বাড়তে পারে।
খালি পেটে খেলে সবার সমস্যা হবে এমন নয়, তবে যাদের হজমের সমস্যা বা অ্যাসিডিটির প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
খাবার পাকস্থলী থেকে বের হতে দেরি হতে পারে
অ্যাপল সিডার ভিনেগার পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি ধীর করতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর ফলে পেট দীর্ঘ সময় ভরা লাগা, বমিভাব বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যা হতে পারে।
বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই পাকস্থলী খালি হওয়ার সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গলা ও খাদ্যনালিতে জ্বালা হতে পারে
অ্যাপল সিডার ভিনেগার সরাসরি পান করলে এর অ্যাসিডিক উপাদান গলা ও খাদ্যনালিতে জ্বালা তৈরি করতে পারে। ঘন বা বেশি পরিমাণে পান করলে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
তাই সরাসরি বোতল থেকে ACV পান করা নিরাপদ অভ্যাস নয়।
অতিরিক্ত ব্যবহারে পটাশিয়াম কমে যেতে পারে
অতিরিক্ত ও দীর্ঘদিন অ্যাপল সিডার ভিনেগার গ্রহণের সঙ্গে রক্তে পটাশিয়াম কমে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে রিপোর্ট রয়েছে। তবে এটি সাধারণ ব্যবহারে কতটা ঘটে, সে বিষয়ে প্রমাণ সীমিত।
পটাশিয়াম খুব কমে গেলে দুর্বলতা, পেশিতে টান, ক্লান্তি বা হৃদ্স্পন্দনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা পটাশিয়াম কমাতে পারে এমন ওষুধ খান, তাদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
কারা অ্যাপল সিডার ভিনেগার এড়িয়ে চলবেন
সবাইকে অ্যাপল সিডার ভিনেগার পুরোপুরি বাদ দিতে হবে এমন নয়। তবে কিছু শারীরিক সমস্যা বা ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি না খাওয়াই ভালো হতে পারে।
অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা অতিরিক্ত অম্বল থাকলে: যাদের নিয়মিত বুকজ্বালা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা পেটে অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অ্যাপল সিডার ভিনেগার উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর অ্যাসিডিক প্রকৃতি খাদ্যনালিতে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
গ্যাস্ট্রাইটিস বা পাকস্থলীর আলসার থাকলে: গ্যাস্ট্রাইটিস বা পাকস্থলীর আলসারে পাকস্থলীর আবরণ আগে থেকেই সংবেদনশীল থাকে। এ অবস্থায় অ্যাসিডিক ভিনেগার পান করলে জ্বালা বা অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ACV পান করা উচিত নয়।
দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ থাকলে: ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরের পানি ও বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। এ কারণে নিয়মিত কোনো ধরনের স্বাস্থ্য-সাপ্লিমেন্ট বা বিকল্প স্বাস্থ্যপণ্য ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাপল সিডার ভিনেগার নিয়ে কিডনি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা-প্রমাণ নেই। তাই কিডনি রোগ থাকলে নিজে থেকে নিয়মিত ACV শুরু না করাই নিরাপদ।
ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করলে: অ্যাপল সিডার ভিনেগার রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। ফলে ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত রক্তে শর্করা কমার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প হিসেবে কখনোই অ্যাপল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করা উচিত নয়। ডায়াবেটিসে কোনো সাপ্লিমেন্ট বা বিকল্প পণ্য ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ।
ডাইইউরেটিক বা প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ খেলে: কিছু ডাইইউরেটিক ওষুধ শরীর থেকে পটাশিয়াম বের করে দিতে পারে। অতিরিক্ত অ্যাপল সিডার ভিনেগার গ্রহণের সঙ্গে পটাশিয়াম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দুটির সম্মিলিত প্রভাব ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডিগক্সিন বা কিছু হৃদ্রোগের ওষুধ সেবন করলে: ডিগক্সিনের মতো কিছু ওষুধের কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সঙ্গে শরীরের পটাশিয়াম মাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। তাই এ ধরনের ওষুধ গ্রহণের সময় নিজের সিদ্ধান্তে নিয়মিত ACV পান করা ঠিক নয়।
নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে যেকোনো নতুন সাপ্লিমেন্ট বা স্বাস্থ্যপণ্য শুরু করার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানানো ভালো।
দাঁতের এনামেল আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হলে: দাঁতের এনামেল একবার উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। তাই দাঁতের সংবেদনশীলতা বা এনামেল ক্ষয়ের সমস্যা থাকলে অ্যাসিডিক পানীয় নিয়মিত পান করার বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
অ্যাপল সিডার ভিনেগার খেলে কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়
যারা চিকিৎসকের পরামর্শে বা খাবারের অংশ হিসেবে অল্প পরিমাণে অ্যাপল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করেন, তারা কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন।
প্রথমত, এটি সরাসরি বা ঘন অবস্থায় পান না করাই ভালো। পানি দিয়ে পাতলা করে নেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত পরিমাণে বা বারবার পান করার অভ্যাস করা উচিত নয়। দাঁতের সংস্পর্শ কমাতে স্ট্র ব্যবহার করা যেতে পারে এবং পান করার পর পানি দিয়ে মুখ কুলকুচি করা ভালো।
তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ সবার জন্য নিরাপদ এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। বয়স, রোগ, ওষুধ এবং ব্যক্তিগত সহনশীলতার ওপর ঝুঁকি নির্ভর করতে পারে।
ওজন কমাতে অ্যাপল সিডার ভিনেগার কি জরুরি?
না। ওজন কমানোর জন্য অ্যাপল সিডার ভিনেগার প্রয়োজনীয় কোনো খাবার নয়। গবেষণায় এর কিছু সম্ভাব্য বিপাকীয় উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও প্রমাণ এখনো সীমিত এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে বরং মোট ক্যালরি গ্রহণ, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
অ্যাপল সিডার ভিনেগার খাওয়ার পর তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, গিলতে সমস্যা, তীব্র বুকজ্বালা বা রক্তে শর্করা খুব কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, প্রাকৃতিক হলেই কোনো খাবার বা পানীয় সবার জন্য নিরাপদ হবে এমন নয়। অ্যাপল সিডার ভিনেগার খাবারে অল্প পরিমাণে ব্যবহারের বিষয়টি এবং প্রতিদিন স্বাস্থ্য উপকারের আশায় পান করার বিষয়টি এক নয়। বিশেষ করে অ্যাসিড রিফ্লাক্স, গ্যাস্ট্রাইটিস, আলসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা নিয়মিত ওষুধ সেবনের মতো পরিস্থিতি থাকলে এটি শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: এনডিটিভি



-98d327.jpg)