স্বাস্থ্যকর হলেও রাতে খেলে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে যে ৩ খাবার

রাতে ভালো ঘুম না হওয়ার পেছনে শুধু দুশ্চিন্তা, মোবাইল ফোন বা চা-কফিই দায়ী নয়। রাতের খাবারে কী থাকছে, সেটিও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো খাবার খাওয়ার পর যদি গ্যাস, পেটফাঁপা, বদহজম বা অস্বস্তি হয়, তাহলে সেই অস্বস্তির কারণে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এমন কিছু খাবারও আছে যেগুলো সাধারণভাবে বেশ স্বাস্থ্যকর। কিন্তু রাতের খাবারে বা ঘুমানোর খুব কাছাকাছি সময়ে এগুলো খেলে কিছু মানুষের হজমের সমস্যা হতে পারে। ফলে ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব খাবার রাতে খেলেই সবার ঘুম নষ্ট হবে। শরীরের প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা। মূল বিষয় হলো, কোন খাবার আপনার শরীরে অস্বস্তি তৈরি করছে এবং কখন সেটি খাচ্ছেন।
ব্রকলি, ফুলকপি ও বাঁধাকপি
ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বক চয় ও ব্রাসেলস স্প্রাউটসের মতো সবজি পুষ্টিতে ভরপুর। এগুলোতে আঁশ ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় এসব সবজি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু রাতে বেশি পরিমাণে খেলে কারও কারও গ্যাস বা পেটফাঁপার সমস্যা হতে পারে। এই অস্বস্তি বিশেষ করে শোয়ার পর বেশি বিরক্তিকর মনে হতে পারে।
তাই রাতে এসব সবজি একেবারেই খাওয়া যাবে না, এমন নয়। যদি খাওয়ার পর আপনার গ্যাস বা পেটফাঁপা হয়, তাহলে পরিমাণ কমিয়ে দিনের আগের ভাগে খেয়ে দেখতে পারেন।
সবজিগুলো খুব বেশি তেল দিয়ে বা অতিরিক্ত মসলা দিয়ে রান্না করলে হজমের অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। তাই রাতের খাবারে এগুলো রাখলে হালকা রান্না করা ভালো।
শিম, বরবটি ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার
শিম, বরবটি, কড়াইশুঁটি, বিভিন্ন ধরনের বিনস ও ডালজাতীয় খাবার প্রোটিন ও আঁশের ভালো উৎস। পেট ভরা রাখতে এবং সুষম খাদ্যতালিকা তৈরিতে এগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
তবে বেশি পরিমাণে খেলে কিছু মানুষের গ্যাস ও পেটফাঁপা হতে পারে। কারণ এসব খাবারে থাকা আঁশ অন্ত্রে পৌঁছানোর পর জীবাণুর মাধ্যমে ভাঙার সময় গ্যাস তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ঘুমানোর মাত্র আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা আগে এ ধরনের খাবার খেলে অস্বস্তির সম্ভাবনা বাড়তে পারে। মূল প্রতিবেদনে তাই শিমজাতীয় খাবার দিনের আগের ভাগে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখানে খাবারের সময়ের পাশাপাশি পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। দুপুরে বেশি পরিমাণে শিম বা ডাল খেয়েও যদি আপনার গ্যাস হয়, তাহলে শুধু রাতে না খাওয়াই সমাধান নয়। বরং কোন পরিমাণে এবং কোন ধরনের খাবারে সমস্যা হচ্ছে, সেটি খেয়াল করা দরকার।
দুধ, দই ও পনির
ঘুমানোর আগে গরম দুধ খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। দুধে থাকা কিছু পুষ্টি উপাদান ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে দুধ খেলেই সবার ঘুম ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশেষ করে যাঁদের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দুধ, দই বা অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার খেলে গ্যাস, পেটফাঁপা, পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হতে পারে। রাতে এসব সমস্যা হলে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
আবার ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা না থাকলেও ঘুমানোর ঠিক আগে বেশি পরিমাণে দুধ, দই বা পনির খেলে কারও পেট ভার বা বদহজম হতে পারে।
তাই দুধ খেলে আপনার ঘুম ভালো হয় কি না, সেটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপরও নির্ভর করে।
স্বাস্থ্যকর খাবারেও কেন সমস্যা হতে পারে?
একটি খাবার স্বাস্থ্যকর কি না, সেটি আর সেই খাবার আপনার শরীরে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, দুটি আলাদা বিষয়।
ব্রকলি বা শিমে থাকা আঁশ শরীরের জন্য উপকারী। কিন্তু কারও হজমতন্ত্র যদি বেশি আঁশে সংবেদনশীল হয়, তাহলে গ্যাস বা পেটফাঁপা হতে পারে।
একইভাবে দুধ পুষ্টিকর হলেও ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু ব্যক্তির জন্য তা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
তাই শুধু খাবারটি স্বাস্থ্যকর কি না, তা দেখলে হবে না। আপনার শরীর সেটি কীভাবে গ্রহণ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রাতে খাবারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কখন খাচ্ছেন সেটিও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘুমানোর একেবারে আগে ভারী খাবার খেলে হজমের অস্বস্তি ও অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। শুয়ে পড়ার পর পাকস্থলীর খাবার ও অ্যাসিড ওপরের দিকে উঠে আসা সহজ হয়। এতে বুকজ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি হয়ে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে ভারী খাবার শেষ করা অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে খাবার ও শোয়ার মধ্যে পর্যাপ্ত সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
রাতে আর কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন?
শুধু ব্রকলি, শিম বা দুধ নয়, ঘুমের কাছাকাছি সময়ে আরও কিছু খাবার ও পানীয় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অতিরিক্ত ঝাল খাবার
ঝাল খাবার কিছু মানুষের বুকজ্বালা, বদহজম ও অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়াতে পারে। বিশেষ করে রাতে খেয়ে দ্রুত শুয়ে পড়লে সমস্যা বেশি হতে পারে।
ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার
বেশি চর্বিযুক্ত খাবার হজম হতে সময় নিতে পারে। রাতে ভারী খাবার খেলে পেট ভার লাগা ও অস্বস্তির কারণে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।
চা, কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত খাবার
ঘুমানোর আগে চা বা কফি পান করলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। শুধু পানীয় নয়, চকোলেট ও কিছু কোমল পানীয়তেও ক্যাফেইন থাকে। Sleep Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগেও ক্যাফেইন গ্রহণ কিছু মানুষের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে।
অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার
বেশি চিনি ও পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবারের সঙ্গে ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই রাতে মিষ্টি, কেক বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস ভালো নয়।
তাহলে রাতে কী খাবেন?
রাতে খাবার বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণে পরিমিত এবং সহজে সহ্য হয় এমন খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
ভাত বা রুটির সঙ্গে মাছ, ডিম বা অন্য কোনো পরিমিত প্রোটিন এবং আপনার সহ্য হয় এমন সবজি রাখা যেতে পারে। অতিরিক্ত তেল, ঝাল ও মসলা কমিয়ে রান্না করলে হজমের অস্বস্তির সম্ভাবনাও কমতে পারে।
যাঁদের রাতে হালকা ক্ষুধা লাগে, তাঁরা ব্যক্তিগত সহনশীলতা অনুযায়ী হালকা খাবার বেছে নিতে পারেন। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো।
নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝুন
একই খাবার একজনের জন্য সমস্যা তৈরি করলেও অন্যজন সেটি সহজেই হজম করতে পারেন। তাই শুধু অন্যের অভিজ্ঞতা দেখে খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ধরুন, আপনি রাতে ফুলকপি খেলে নিয়মিত পেটফাঁপা অনুভব করেন। তাহলে সেটি দুপুরে খেয়ে দেখতে পারেন। একইভাবে দুধ খাওয়ার পর যদি গ্যাস বা পেটের অস্বস্তি হয়, তাহলে দুধের পরিমাণ কমিয়ে বা অন্য সময়ে খেয়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে পারেন।
তবে কোনো খাবার খেলেই নিয়মিত পেটব্যথা, ডায়রিয়া, তীব্র বুকজ্বালা বা অন্য কোনো উপসর্গ হলে বিষয়টি শুধু খাবারের সমস্যা ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
ঘুম ভালো রাখতে আরও কিছু অভ্যাস
রাতের খাবারের পাশাপাশি কয়েকটি সাধারণ অভ্যাসও ঘুমের মান ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার চেষ্টা করুন। রাতে ক্যাফেইন কমান। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন। শোয়ার ঠিক আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে না থাকাও উপকারী হতে পারে।
যাঁদের অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে রাতের খাবার ও ঘুমের মধ্যে অন্তত কয়েক ঘণ্টা ব্যবধান রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিমজাতীয় খাবার কিংবা দুধ, কোনোটিই অস্বাস্থ্যকর খাবার নয়। বরং এগুলোর অনেকগুলোই সুষম খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে রাতে বা ঘুমানোর খুব কাছাকাছি সময়ে খেলে যাঁদের গ্যাস, পেটফাঁপা, বদহজম বা বুকজ্বালা হয়, তাঁদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। মূল প্রতিবেদনের তিনটি খাবারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সবার জন্য একই নয়।
তাই ঘুম ভালো রাখতে খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার আগে খেয়াল করুন, কোন খাবার আপনার শরীরে অস্বস্তি তৈরি করছে এবং কখন সেটি খাচ্ছেন। রাতের খাবার পরিমিত রাখুন এবং সম্ভব হলে ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে শেষ করুন।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



