logo
Advertisement

কুকুর কামড়ানোর পর কত দ্রুত টিকা নিতে হবে, জানুন সঠিক সময়

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
কুকুর কামড়ানোর পর কত দ্রুত টিকা নিতে হবে, জানুন সঠিক সময়
ছবি: এনডিটিভি

কুকুর কামড়ানোর পর অনেকের প্রথম প্রশ্ন থাকে, কত ঘণ্টার মধ্যে জলাতঙ্কের টিকা নিতে হবে? ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, নাকি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে? কেউ কেউ আবার ক্ষত ছোট হলে কয়েক দিন অপেক্ষা করেন। কিন্তু জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে এমন নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বা WHO-এর পরামর্শ হলো, জলাতঙ্কে আক্রান্ত হতে পারে এমন কোনো প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নিতে হবে। ক্ষত দ্রুত সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলতে হবে এবং প্রয়োজন হলে পোস্ট এক্সপোজার প্রফাইল্যাক্সিস বা PEP শুরু করতে হবে। এতে জলাতঙ্কের টিকা এবং ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা RIG লাগতে পারে।

২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার কোনো নিয়ম আছে?

জলাতঙ্কের টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টাকে নিরাপদ শেষ সময় ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বরং যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, তত ভালো।

সিডিসি’র বর্তমান নির্দেশনায় সম্ভাব্য জলাতঙ্ক সংস্পর্শের পর PEP যত দ্রুত সম্ভব শুরু করার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রাণীটি কী ছিল, কামড় বা আঁচড়ের ধরন, ক্ষত কোথায় হয়েছে এবং ওই ব্যক্তির আগে জলাতঙ্কের টিকা নেওয়া হয়েছিল কি না, এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়।

তাই কামড়ের পর কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও টিকা নেওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে, এমন ভাবার কারণ নেই। বরং দেরি হয়ে থাকলেও দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। সিডিসি জানাচ্ছে, জলাতঙ্কের লক্ষণ শুরু হওয়ার আগে চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে এবং সম্ভাব্য সংস্পর্শের পর চিকিৎসা শুরু করা উচিত যত দ্রুত সম্ভব।

কুকুর কামড়ালে প্রথম কাজ কী?

কামড়ের পর সরাসরি টিকা নেওয়ার জন্য ছুটে যাওয়ার পাশাপাশি প্রথম কাজ হলো ক্ষত ভালোভাবে পরিষ্কার করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী-

  • ক্ষতস্থান সঙ্গে সঙ্গে প্রবাহিত পানি ও সাবান দিয়ে ধুতে হবে।
  • প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ভালোভাবে ধুতে হবে।
  • সাবান না থাকলে শুধু প্রচুর পানি দিয়েও ক্ষত ধুতে হবে।
  • পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়োডিনযুক্ত বা ভাইরাসনাশক দ্রবণ ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • এরপর দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।

ক্ষত ধোয়ার এই ধাপকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। WHO বলছে, দ্রুত ও ভালোভাবে ক্ষত পরিষ্কার করা জলাতঙ্ক প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ক্ষত ছোট হলেও কি টিকা লাগতে পারে?

হ্যাঁ, লাগতে পারে।

অনেকে মনে করেন, দাঁতের দাগ খুব সামান্য হলে বা রক্ত না বের হলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি নেই। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার exposure category অনুযায়ী রক্তপাত না হওয়া ছোট আঁচড় বা ত্বকের ওপরের সামান্য ক্ষতও সম্ভাব্য exposure হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ধরনের Category II exposure-এ ক্ষত ধোয়া এবং দ্রুত টিকা নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।

আর ত্বক ভেদ করে কামড় বা আঁচড়, কিংবা ক্ষতস্থানে প্রাণীর লালা লাগলে তা গুরুতর Category III exposure হতে পারে। তখন ক্ষত পরিষ্কারের পাশাপাশি টিকার সঙ্গে র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা RIG প্রয়োজন হতে পারে।

কখন র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রয়োজন হতে পারে?

RIG সাধারণত গুরুতর Category III exposure-এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এটি টিকার মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ তৈরি করে না। বরং টিকা শরীরে কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করার আগ পর্যন্ত ক্ষতস্থানে দ্রুত সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়।

CDC-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, আগে জলাতঙ্কের টিকা না নেওয়া ব্যক্তির প্রয়োজন হলে PEP-এর অংশ হিসেবে RIG এবং টিকা দেওয়া হয়। RIG সাধারণত ক্ষতস্থানের চারপাশে প্রয়োগ করা হয় এবং প্রথম টিকার সঙ্গে একই সিরিঞ্জ বা একই শারীরিক স্থানে দেওয়া হয় না।

তবে RIG লাগবে কি না এবং কীভাবে দিতে হবে, সেটি চিকিৎসক exposure-এর ধরন দেখে ঠিক করবেন।

টিকার কতগুলো ডোজ লাগে?

আগে জলাতঙ্কের টিকা নেওয়া হয়েছে কি না এবং কোন দেশের বা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রোটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে, তার ওপর PEP-এর সূচি ভিন্ন হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে সিডিসি’র বর্তমান নির্দেশনায় আগে টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য চার ডোজের একটি টিকা সূচি রয়েছে, যা প্রথম দিন বা Day 0, এরপর 3, 7 ও 14তম দিনে দেওয়া হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পঞ্চম ডোজও প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যদিকে আগে পূর্ণাঙ্গ জলাতঙ্ক টিকা নেওয়া থাকলে PEP-এর ধরন আলাদা হতে পারে। তাই নিজের মতো করে ডোজের সংখ্যা ঠিক না করে চিকিৎসকের দেওয়া সূচি অনুসরণ করা জরুরি।

কুকুরটি পোষা হলে কি টিকা লাগবে না?

পোষা কুকুর হলেও নিজের সিদ্ধান্তে টিকা বাদ দেওয়া ঠিক নয়।

কুকুরটি নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা পেয়েছে কি না, তার বর্তমান স্বাস্থ্য কেমন, কামড়ের পরিস্থিতি কী ছিল এবং স্থানীয় জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা কী বলছে, এসব বিবেচনা করে চিকিৎসক ঝুঁকি মূল্যায়ন করবেন। সিডিসিও পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রে তার জলাতঙ্কের টিকা আপডেট আছে কি না, সেই তথ্য চিকিৎসককে জানানোর পরামর্শ দেয়।

কিছু ক্ষেত্রে কামড়ানো কুকুরকে নিরাপদভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কিন্তু কেবল কুকুরকে ১০ দিন দেখা হবে বলে চিকিৎসা নেওয়া পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্ভাব্য exposure হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দেয়।

কুকুর কামড়ালে যেসব ভুল করবেন না

জলাতঙ্কের ভয় থেকে অনেকে ক্ষতস্থানে বিভিন্ন ঘরোয়া উপাদান লাগান। এগুলো উপকারের বদলে ক্ষতি করতে পারে।

WHO ক্ষতস্থানে মরিচের গুঁড়া, গাছের রস, অ্যাসিড বা ক্ষারজাতীয় কোনো জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন পদার্থ না লাগানোর পরামর্শ দেয়। ক্ষত ভালোভাবে পরিষ্কার করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করাও ঠিক নয়। কামড়ের ক্ষত থেকে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, টিটেনাসসহ অন্য সমস্যার ঝুঁকি আছে কি না, চিকিৎসক সেটিও মূল্যায়ন করবেন।

জলাতঙ্ক এত ভয়ংকর কেন?

জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ভাইরাসটি স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে ক্লিনিক্যাল লক্ষণ তৈরি করার পর রোগটি প্রায় সর্বদাই প্রাণঘাতী। তবে লক্ষণ শুরু হওয়ার আগে যথাযথ PEP নিলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা যায়।

এই কারণেই জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে অপেক্ষা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এত গুরুত্বপূর্ণ।

কামড়ের পর অনেক দেরি হয়ে গেলে কী করবেন?

কামড়ের পর কয়েক ঘণ্টা, এক দিন বা তার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সিডিসি জানাচ্ছে, সম্ভাব্য exposure-এর পর আগে টিকা না নেওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে PEP দেওয়া হয়, এবং exposure ও চিকিৎসা শুরুর মধ্যবর্তী সময় পেরিয়ে গেলেও, যতক্ষণ জলাতঙ্কের উপসর্গ শুরু হয়নি, PEP দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

তাই দেরি হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় ভুল হবে আরও অপেক্ষা করা। দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে পুরো ঘটনা জানাতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি কথা, কুকুর কামড়ানোর পর জলাতঙ্কের টিকা নেওয়ার জন্য ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার কোনো নির্দিষ্ট নিরাপদ সময়সীমা ধরে বসে থাকা উচিত নয়। কামড় বা সম্ভাব্য exposure হলে ক্ষত সঙ্গে সঙ্গে অন্তত ১৫ মিনিট সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক PEP-এর অংশ হিসেবে জলাতঙ্কের টিকা এবং RIG দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, কুকুরের কামড়ের ক্ষত ছোট হলেও ঝুঁকি একেবারে নেই ধরে নেওয়া যাবে না। জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করা বিপজ্জনক, কারণ তখন রোগটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী।

সূত্র: এনডিটিভি