পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা মানেই কি সম্পর্কের শেষ

আমরা এখন এমন একটি সময়ে থাকি যখন চাইলেও পরিবারের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় না। সময়ের অভাব, অভিমান, পারিবারিক সমস্যা যে কারণেই হোক অনেক সময় না চাইলেও এ যোগাযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বা ‘নো কনট্যাক্ট’ বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কেউ এটিকে আধুনিক প্রজন্মের সীমারেখা তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন এটি বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলার একটি উদাহরণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা এতটা সরল না।
অনেক সময় বাবা-মায়েরা মনে করেন, জীবনের নানা সময়ে তারা তাদের সন্তানদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। কঠিন দাম্পত্য জীবন, বিবাহবিচ্ছেদ, নতুন সম্পর্ক সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যার কারণে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয় সন্তানদের সঙ্গে।
যোগাযোগহীনতা বা ‘নো কনট্যাক্ট’ কি সত্যিই নতুন ট্রেন্ড
লুসি ব্লেক, যিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, তিনি বলেন, বিষয়টি এখন বেশি আলোচনায় এলেও এটি একেবারে নতুন নয়।
তার গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজনের একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেন। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬ শতাংশ মানুষের মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্যাতন বা বড় কোনো ঘটনার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় না। বরং দীর্ঘদিনের ছোট ছোট মানসিক চাপ, ভুল বোঝাবুঝি ও টানাপোড়েন ধীরে ধীরে সম্পর্ককে এই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
লুসি ব্লেকের ভাষায়, পরিবারের খুব সাধারণ ও দৈনন্দিন ঘটনাগুলোও অনেক সময় দূরত্ব ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সব বিচ্ছেদ স্থায়ী নয়
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যোগাযোগহীনতা সব সময় সম্পর্কের শেষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সাময়িক দূরত্ব, যেখানে দুই পক্ষ নিজেদের অনুভূতি বোঝার জন্য সময় নেয়।
কখনও কখনও মানুষ কয়েকবার যোগাযোগ বন্ধ ও পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়েও যায়।
দূরত্ব থেকে নতুন সম্পর্কের শুরু
যোগাযোগহীনতার সময়টাতে পরিবারের মানুষজন নিজেদের জীবন ও মানসিক অবস্থার ওপর কাজ করেন। থেরাপি, আত্মসমালোচনা এবং ব্যক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তারা নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
বর্তমানে এতে সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ও পরিণত হয়।
সম্পর্ক ঠিক করতে কী প্রয়োজন?
এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষদের মতে, শুধু অন্যকে দোষারোপ না করে নিজের দিকটাও বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
লিন্ডসে গ্লাস বলেন, কেউ যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে সে আর আপনাকে দেখতে চায় না, তাহলে সেখানে আপনারও হয়তো কিছু ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য আত্মসমালোচনা, সময়, থেরাপি এবং পারস্পরিক সম্মান খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পুনর্মিলন হলেও সম্পর্ক আগের মতো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় নতুন সীমারেখা ও নতুন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়।
একাকিত্ব কাটাতে দরকার সমর্থন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা পরিবার থেকে দূরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাদের জন্য এই সময়টা মানসিকভাবে কঠিন হতে পারে। তাই বন্ধু, থেরাপিস্ট বা সহায়ক কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, পরিবারের দূরত্ব সব সময় সম্পর্কের সমাপ্তি নয়। অনেক সময় সেটিই হতে পারে নতুন ও স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের শুরু।
সূত্র: সিএনএন