কয়েনে কেন খাজকাঁটা থাকে, জানলে অবাক হবেন

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ একটি জিনিস হলো কয়েন। বাস ভাড়া দেওয়া, দোকান থেকে খুচরা ফেরত নেওয়া বা পুরোনো ড্রয়ার পরিষ্কার করতে গিয়ে; কয়েনের সঙ্গে আমাদের প্রায়ই দেখা হয়। কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছেন, বেশিরভাগ কয়েনের ধার কাটাকাটা কেন থাকে?
অনেকে হয়তো বিষয়টি চোখেই পড়ে না, আবার কেউ দেখলেও তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এই ছোট্ট নকশার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গল্প।
ধরা যাক, আপনি হঠাৎ একটি পুরোনো কয়েন হাতে পেলেন। সেটিকে একটু ঘুরিয়ে দেখলে বুঝবেন, এর ধার একেবারে মসৃণ নয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে; এটা কি শুধু ডিজাইনের জন্য, নাকি এর কোনো বাস্তব কারণ আছে? সব কয়েনেই কি এমন থাকে?
আসলে এই কাটাকাটা ধারা কোনো সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়। বরং এটি তৈরি হয়েছিল একটি গুরুতর সমস্যার সমাধান হিসেবে, যা একসময় পুরো অর্থব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল।
সবসময় কি কয়েনের ধার কাটাকাটা ছিল?
না। প্রাচীন লিডিয়ার (বর্তমান তুরস্ক) প্রথম কয়েনগুলো প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৈরি হয়েছিল। সেগুলো ছিল গোলাকার, মসৃণ ধাতব ব্লক, যা দেখতে চকলেটের কয়েনের মতো।
পরবর্তী সময়ে গ্রিক ও রোমান কয়েনগুলোতে ছবি কাটা হলেও ধার খাঁজকাটা ছিল না। ধারে খাজঁকাটা আসে ১৫০০-এর দশকে, কারণ কিছু চোর মুদ্রার ধাতব অংশ কেটে বিক্রি করত।
ধার খাজকাটার মূল কারণ
কয়েনের ধার খাঁজকাটা করা হয়েছিল কয়েন ক্লিপিং রোধ করার জন্য। কয়েন ক্লিপিং হলো ১৭শ শতকে ব্যবহৃত একটি কৌশল, যেখানে কেউ কয়েনের ধাতব অংশ কেটে হালকা করে পুরো মানে খরচ করত এবং কাটা ধাতু বিক্রি করত।
ইংল্যান্ডের রয়্যাল মিন্টের মাস্টার সার আইজ্যাক নিউটন তখন এটি থামানোর জন্য ধারা কাটাকাটার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এই ধারগুলো কয়েন কাটার চেষ্টা সহজে শনাক্ত করতে সাহায্য করত।
কেন সব কয়েনের ধার খাজ কাটা নেই?
ডাইম, কোয়ার্টার, হাফ-ডলার বা কিছু ডলার কয়েনে ধার কাটাকাটা থাকে, কিন্তু পেনি বা নিকেলে থাকে না। কারণ এই ছোট, সস্তা কয়েনগুলোতে মূল্যবান ধাতু ছিল না, তাই কেউ কেটে নেওয়ার চেষ্টা করত না।
আজকাল দামি ধাতু ব্যবহার করা হয় না, কিন্তু উচ্চমূল্যের কয়েনে ধার কাটাকাটা রাখা হয় রীতিনীতি এবং নিরাপত্তার কারণে।
কয়েন তৈরি করার সময় একটি ধাতব ডিস্ক (প্লাঞ্চেট) দুটি ডাইয়ের মধ্যে রাখা হয়। একটি কলার থাকে, যার ভেতরে খাঁজ থাকে। চাপের ফলে ধাতু এই খাঁজে ঢুকে ধার কাটাকাটা তৈরি হয়।
অন্যান্য দেশের কয়েনের উদাহরণ
ডাইম: ১১৮টি খাঁজ
কোয়ার্টার: ১১৯টি খাঁজ
হাফ-ডলার: ১৫০টি খাঁজ
আধুনিক সময়ে ধার কাঁটাকাঁটার উপকারিতা
নিরাপত্তা – মুদ্রা জাল বা কাটার চেষ্টা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
টাচ আইডি – দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কোন কয়েন কোনটি তা বুঝতে সহজ হয়।
রীতিনীতি – মুদ্রার পরিচিতি বজায় রাখে।
স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে স্বীকৃতি – ভেন্ডিং মেশিন বা কয়েন কাউন্টিং ডিভাইস সহজে শনাক্ত করে।
সাজসজ্জা ও ধরার সুবিধা – ভালো গ্রিপ এবং সুন্দর চেহারা দেয়।
একটা মজার বিষয় হলো, মহামন্দার সময় মানুষ খেলাধুলায় কয়েন নিক্ষেপ করার সময় দেখেছিল যে রিডেড কোয়ার্টার বা ডাইম ঠিকঠাক গেমে সাহায্য করত।
যদিও আজকাল ডিজিটাল পেমেন্টের যুগ, কিন্তু ধাতব মুদ্রা এবং তাদের ধার কাটাকাটা এখনো আছে। এটি শুধু নিরাপত্তা নয়, ঐতিহ্য এবং ব্যবহারিক সুবিধারও প্রতীক। তাই পরবর্তী বার যখন আপনার পকেটে বা সোফার ফাঁক থেকে কোনো কয়েন বের করবেন, একটু চোখ ভরে তার ধার কাটাকাটা দেখুন।
সূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট