logo

অনলাইনে ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার আগে যাচাই করুন এই ৮ বিষয়

অনলাইনে ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার আগে যাচাই করুন এই ৮ বিষয়
ছবি: ই-কমার্স এন্ড রি-কমার্স মার্কেটপ্লেস ইন বাংলাদেশ

অনলাইনে কেনাকাটা এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী থেকে শুরু করে মোবাইল, ঘড়ি কিংবা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যও ঘরে বসে অর্ডার করা যায়। দোকানে যাওয়ার ঝামেলা নেই, আবার অনেক সময় অনলাইনে নানা ধরনের ছাড়ও পাওয়া যায়।

তবে অনলাইনে কেনাকাটার সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে কিছু ঝুঁকিও। একই ব্র্যান্ডের নামে নকল পণ্য বিক্রি, ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি, অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য দেওয়ার প্রলোভন কিংবা পেমেন্টের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অনলাইনে ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার সময় শুধু দাম বা ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

নকল পণ্য এড়াতে এবং অনলাইন কেনাকাটায় টাকা ও ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ রাখতে কয়েকটি বিষয় আগে থেকেই যাচাই করা জরুরি। চলুন জেনে নিই অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন।

অস্বাভাবিক কম দাম দেখলে সতর্ক হোন

কোনো পরিচিত ব্র্যান্ডের পণ্য সাধারণ বাজারদামের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে দেখলে প্রথমেই সতর্ক হওয়া উচিত।

বিশেষ করে দাম যদি অন্য সব দোকান বা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম হয়, তাহলে বিক্রেতা কে এবং পণ্যটি কোথা থেকে আসছে, তা যাচাই করুন। খুব কম দাম সবসময় প্রতারণার প্রমাণ নয়, তবে এটি সতর্ক হওয়ার একটি কারণ হতে পারে।

অনলাইনে কেনার আগে একই পণ্যের দাম কয়েকটি নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে দেখে নিতে পারেন।

বিক্রেতা আসল কি না যাচাই করুন

শুধু ওয়েবসাইটে ব্র্যান্ডের নাম বা লোগো দেখেই সেটিকে অনুমোদিত বিক্রেতা ধরে নেবেন না।

সম্ভব হলে ব্র্যান্ডের নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়ে অনুমোদিত বিক্রেতা বা পরিবেশকের তালিকা আছে কি না দেখুন। বিক্রেতার নাম, ঠিকানা, যোগাযোগের নম্বর এবং ব্যবসার অন্যান্য তথ্যও যাচাই করুন।

অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কোনো পণ্য কিনলে বিক্রেতার পুরোনো কার্যক্রম, ক্রেতাদের মতামত এবং ফেরত দেওয়ার নিয়মও দেখে নেওয়া ভালো। ফেডারেল ট্রেড কমিশনও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কেনার আগে বিক্রেতা ও পণ্যের বিষয়ে আলাদাভাবে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

ওয়েবসাইটের ঠিকানা ভালোভাবে দেখুন

প্রতারকরা কখনো কখনো পরিচিত প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া সাইট তৈরি করতে পারে। তাই কোনো লিংকে ঢোকার আগে ওয়েবসাইটের ঠিকানা ভালোভাবে দেখে নিন।

বানান সামান্য বদলে দেওয়া হয়েছে কি না, অদ্ভুত কোনো ওয়েব ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে কি না, কিংবা প্রতিষ্ঠানের আসল ওয়েবসাইট থেকে আলাদা কোনো ঠিকানায় নিয়ে যাচ্ছে কি না, খেয়াল করুন।

ওয়েবসাইটে HTTPS থাকা নিরাপদ সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও শুধু HTTPS দেখেই কোনো সাইটকে আসল বা বিশ্বস্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ওয়েব ঠিকানা, বিক্রেতার পরিচয় এবং সাইটের অন্যান্য তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

পণ্যের ছবি ও বিবরণ মিলিয়ে দেখুন

নকল পণ্য শনাক্ত করার ক্ষেত্রে পণ্যের ছবি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

পণ্যের ছবি খুব অস্পষ্ট কি না, ব্র্যান্ডের লোগোতে বানান ভুল আছে কি না, প্যাকেটের লেখা অস্বাভাবিক কি না এবং বিভিন্ন ছবিতে পণ্যের বিবরণ একই আছে কি না, দেখুন।

শুধু একটি ছবির ওপর নির্ভর না করে সম্ভব হলে ব্র্যান্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে থাকা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTV)-এর পরামর্শ অনুযায়ী, অনলাইনে কেনার আগে পণ্যের ছবি, বিস্তারিত বিবরণ এবং বিক্রেতার তথ্য ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত।

রিভিউ দেখুন, তবে অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন না

অনলাইনে কোনো পণ্য কেনার আগে ক্রেতাদের রিভিউ দেখা বেশ কাজে দেয়। তবে সব রিভিউ যে সত্যি, এমন নয়।

একই ধরনের ভাষায় অনেকগুলো রিভিউ লেখা হয়েছে কি না, অল্প সময়ে অস্বাভাবিক সংখ্যক পাঁচ তারকার রিভিউ এসেছে কি না এবং নেতিবাচক রিভিউগুলোর অভিযোগ কী, সেগুলো দেখুন।

একটি ওয়েবসাইটের রিভিউয়ের ওপর নির্ভর না করে অন্য ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্বাধীন পর্যালোচনার সঙ্গেও তথ্য মিলিয়ে দেখা ভালো। ফেডারেল ট্রেড কমিশনও শুধু তারকা বা রেটিং দেখে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

পেমেন্টের আগে ফেরত দেওয়ার নিয়ম দেখুন

অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে পণ্য হাতে পাওয়ার পর সেটি পছন্দ না হলে বা বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিল না থাকলে কী করা যাবে, তা আগে থেকেই জেনে নিন।

পণ্য ফেরত দেওয়ার সুযোগ আছে কি না, কত দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হবে, ফেরত পাঠানোর খরচ কে বহন করবে এবং টাকা ফেরত পেতে কত সময় লাগতে পারে, এসব তথ্য ওয়েবসাইটের নীতিমালায় খুঁজে দেখুন।

ফেডারেল ট্রেড কমিশনও কেনাকাটার আগে বিক্রেতার ফেরত ও অর্থ ফেরতের নিয়ম ভালোভাবে পড়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

ওটিপি (OTP), কার্ডের গোপন তথ্য বা পিন কাউকে দেবেন না

অনলাইন কেনাকাটার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার একটি হলো পেমেন্টের গোপন তথ্য নিরাপদ রাখা।

কেউ ফোন করে বা বার্তা পাঠিয়ে আপনার কার্ডের পিন, ওটিপি, সিভিভি বা অন্য কোনো গোপন তথ্য চাইলে তা দেবেন না। কোনো পেমেন্ট সম্পন্ন করার নামে অচেনা ব্যক্তির নির্দেশে ব্যাংকিং তথ্য শেয়ার করাও ঠিক নয়।

কোনো অচেনা লেনদেন চোখে পড়লে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে পেমেন্ট না করাই ভালো

ক্যাফে, বিমানবন্দর, শপিং মল বা অন্য কোনো জায়গার উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে অনলাইন কেনাকাটার পেমেন্ট করা এড়িয়ে চলা ভালো।

বিশেষ করে ব্যাংকিং বা কার্ডের তথ্য দিতে হলে নিজের মোবাইল ডেটা বা নিরাপদ ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করুন। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল তথ্য দেওয়ার আগে আপনি যে নেটওয়ার্কে যুক্ত আছেন, সেটিও বিবেচনায় রাখা উচিত।

অ্যাপ ডাউনলোডের সময়ও সতর্ক থাকুন

কোনো অনলাইন দোকানের অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে সেটি কোথা থেকে ডাউনলোড করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

অচেনা ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপের ফাইল ডাউনলোড না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অ্যাপটি নির্ভরযোগ্য অ্যাপ স্টোর থেকে নেওয়া ভালো। একই নামে একাধিক অ্যাপ থাকলে ডেভেলপার বা প্রকাশকের পরিচয়ও যাচাই করুন।

পণ্য হাতে পাওয়ার পরও যাচাই করুন

অর্ডার করার সময় সতর্ক থাকার পাশাপাশি পণ্য হাতে পাওয়ার পরও সেটি পরীক্ষা করা উচিত।

প্যাকেটের সিল, ব্র্যান্ডের নাম, বানান, মডেল নম্বর, সিরিয়াল নম্বর, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং পণ্যের গুণগত মান দেখুন। প্রসাধনী, খাবার বা ওষুধজাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে মেয়াদ ও প্যাকেটের তথ্য বিশেষভাবে পরীক্ষা করুন।

বাংলাদেশের জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও পণ্য কেনার আগে মোড়কে থাকা ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহারবিধি, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

অনলাইন কেনাকাটার রসিদ রেখে দিন

অনলাইনে পণ্য কেনার পর অর্ডারের রসিদ, পেমেন্টের প্রমাণ, অর্ডার নম্বর, বিক্রেতার সঙ্গে কথোপকথন এবং পণ্যের বিজ্ঞাপনের ছবি সংরক্ষণ করে রাখা ভালো।

পরে পণ্য নিয়ে কোনো সমস্যা হলে এসব তথ্য অভিযোগ বা টাকা ফেরতের ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। ফেডারেল ট্রেড কমিশনও অনলাইন কেনাকাটার রসিদ ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেয়।

নকল পণ্য পেলে কী করবেন?

বাংলাদেশে অনলাইনে কেনাকাটার সময় প্রতারণা বা পণ্য নিয়ে সমস্যা হলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করা যায়। অধিদপ্তরের জাতীয় ভোক্তা-অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১৬১২১। অনলাইনেও অভিযোগ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

অভিযোগ করার প্রয়োজন হলে অর্ডারের রসিদ, পেমেন্টের প্রমাণ, পণ্যের ছবি, বিক্রেতার তথ্য এবং কথোপকথনের রেকর্ড সংরক্ষণ করে রাখুন।


অনলাইনে ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার আগে এই তালিকাটি দেখুন

কেনাকাটা করার আগে দ্রুত একবার মিলিয়ে নিতে পারেন-

  • দাম অস্বাভাবিক কম কি না
  • বিক্রেতা পরিচিত বা অনুমোদিত কি না
  • ওয়েবসাইটের ঠিকানা সঠিক কি না
  • পণ্যের ছবি ও বিবরণ ঠিক আছে কি না
  • অন্য ক্রেতাদের রিভিউ কেমন
  • ফেরত ও টাকা ফেরতের নিয়ম কী
  • পণ্যের আসল মডেল বা সিরিয়াল নম্বর যাচাই করা যাবে কি না
  • পেমেন্টের সময় গোপন তথ্য কাউকে দিতে হচ্ছে কি না
  • অর্ডারের রসিদ ও পেমেন্টের প্রমাণ রাখা হয়েছে কি না

অনলাইনে ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার সময় শুধু কম দাম বা আকর্ষণীয় অফার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিক্রেতার পরিচয়, ওয়েবসাইটের ঠিকানা, পণ্যের ছবি ও বিবরণ, ক্রেতাদের মতামত এবং ফেরত দেওয়ার নিয়ম আগে যাচাই করুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ওটিপি, পিন, সিভিভি বা অন্য কোনো গোপন ব্যাংকিং তথ্য কাউকে দেবেন না। পণ্য কেনার পর রসিদ ও পেমেন্টের প্রমাণও সংরক্ষণ করুন।

কিছুটা সময় নিয়ে যাচাই করলেই নকল পণ্য কেনা এবং অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর সমস্যা হলে বাংলাদেশে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ১৬১২১ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।

সূত্র: টিভি ৯ বাংলা