এক মাস টানা টক দই খেলে শরীরে যে পরিবর্তন আসবে

গরম ভাতের সঙ্গে এক বাটি টক দই, দুপুরের খাবারের পর অল্প দই কিংবা রাতে হালকা কিছু খাওয়ার পর কয়েক চামচ টক দই, বাঙালির খাবারে এটি খুবই পরিচিত। স্বাদে টক, খেতে হালকা এবং পুষ্টিগুণের দিক থেকেও টক দই বেশ ভালো একটি খাবার। কিন্তু টানা এক মাস প্রতিদিন টক দই খেলে শরীরে কী হতে পারে?
টক দইয়ে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং বিভিন্ন ধরনের জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে টক দই খেলে হজমের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগ করতে সাহায্য করতে পারে। তবে সবার শরীর একভাবে দই গ্রহণ করে না। কারও ক্ষেত্রে এটি ভালো লাগলেও কারও পেটের সমস্যা বা অস্বস্তি হতে পারে।
আবার আয়ুর্বেদে রাতে দই খাওয়ার বিষয়ে কিছু সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। তাই এক মাস টানা দই খাওয়ার আগে সময়, পরিমাণ এবং নিজের শরীরের সহনশীলতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
হজমের জন্য উপকারী হতে পারে
টক দই তৈরির সময় দুধের ল্যাকটোজ ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় দইয়ের স্বাদ ও গঠন বদলে যায় এবং কিছু জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া এতে থাকে। এসব ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই এক মাস নিয়মিত টক দই খেলে কারও কারও হজমের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে খাবারের সঙ্গে পরিমিত টক দই রাখলে খাদ্যতালিকায় একটি পুষ্টিকর ও ফারমেন্টেড খাবার যোগ হয়।
তবে টক দই খেলেই গ্যাস, অম্বল বা কোষ্ঠকাঠিন্য সবসময় কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হজমের সমস্যা থাকলে এর কারণও খুঁজে দেখা দরকার।
শরীর পাবে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন
টক দইয়ের অন্যতম সুবিধা হলো এতে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন থাকে। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে প্রোটিন শরীরের পেশি ও বিভিন্ন টিস্যু তৈরিতে প্রয়োজন।
এক মাস প্রতিদিন পরিমিত টক দই খেলে তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এসব পুষ্টি উপাদানের একটি ভালো উৎস যোগ হতে পারে।
তবে শুধু টক দই খেলেই শরীরের সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে না। মাছ, ডিম, ডাল, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে দই রাখতে হবে।
পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে
টক দইয়ে থাকা প্রোটিন তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে মাঝেমধ্যে অপ্রয়োজনীয় নাশতা বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। এ কারণে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে টক দই ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দইয়ের ধরন। চিনি, মিষ্টি ফলের সিরাপ বা অন্যান্য মিষ্টি উপকরণ মেশানো দই নিয়মিত খেলে অতিরিক্ত চিনি শরীরে যেতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে সাধারণ, চিনি ছাড়া টক দই বেছে নেওয়াই ভালো।
রক্তে শর্করার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে
কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত দই খাওয়ার সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। হার্ভার্ডের পুষ্টিবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এক পরিবেশন দই খাওয়ার সঙ্গে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। তবে এর পেছনের কারণ পুরোপুরি নিশ্চিত নয় এবং দইকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের ওষুধ হিসেবে দেখা যাবে না।
তাই ডায়াবেটিস থাকলে দই খেতে চাইলে চিনি ছাড়া সাধারণ টক দই বেছে নেওয়া ভালো।
অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য ভালো রাখতে পারে
আমাদের অন্ত্রে কোটি কোটি অণুজীব বাস করে। এদের সম্মিলিতভাবে অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি বলা হয়। হজম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে এদের সম্পর্ক রয়েছে।
ফারমেন্টেড খাবার হিসেবে টক দই অন্ত্রের জন্য উপকারী কিছু জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া সরবরাহ করতে পারে। তবে সব দইয়ে একই ধরনের বা একই পরিমাণ জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকে না। তাই প্যাকেটজাত দই কিনলে লেবেলে জীবন্ত সংস্কৃতি বা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি উল্লেখ আছে কি না, সেটিও দেখা যেতে পারে।
রাতে খেলে কি সমস্যা হয়?
এখানেই টক দই নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি রয়েছে।
আয়ুর্বেদে রাতে দই খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ধারণায় দইকে ভারী ও শরীরে কফ বাড়াতে পারে এমন খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই রাতে দই না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে এই ধারণাগুলোকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণিত নিয়ম হিসেবে দেখা উচিত নয়। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য রাতে পরিমিত টক দই খাওয়া নিজে থেকেই ক্ষতিকর, এমন শক্ত প্রমাণ নেই। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে দইয়ের প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও জীবন্ত ব্যাকটেরিয়ার পুষ্টিগত দিকগুলোও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ রাতে দই খেলেই সর্দি হবে বা শরীরে কফ জমবে, এমন বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়।
তবে কারও কারও অস্বস্তি হতে পারে
সব মানুষের শরীর দুধজাত খাবার একইভাবে গ্রহণ করে না। ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে দুধের তুলনায় দই অনেকের জন্য সহজে হজম হতে পারে, কারণ দই তৈরির সময় ল্যাকটোজের একটি অংশ ভেঙে যায়। তারপরও কারও কারও গ্যাস, পেট ফাঁপা বা পেটের অস্বস্তি হতে পারে।
তাই দই খাওয়ার পর নিয়মিত পেট খারাপ, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হলে পরিমাণ কমিয়ে দেখুন। সমস্যা চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে সাবধান
টক দইয়ের স্বাদ টক হওয়ার কারণে কারও কারও অ্যাসিডিটি বা অম্বলের সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাদের নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখে দই খাওয়া উচিত। এনডিটিভির প্রতিবেদনে অ্যাসিড রিফ্লাক্স থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রাতে দই খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
দই খাওয়ার পর যদি নিয়মিত বুক জ্বালা, টক ঢেঁকুর বা পেটের অস্বস্তি বাড়ে, তাহলে রাতে এটি না খাওয়াই ভালো।
এক মাসে কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে?
টক দইয়ের জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্যকে সহায়তা করতে পারে। আর অন্ত্রের স্বাস্থ্য শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে টক দই সামগ্রিকভাবে উপকারী হতে পারে।
কিন্তু এক মাস টক দই খেলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে, এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি।
কীভাবে টক দই খাবেন?
প্রতিদিন টক দই খেতে চাইলে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা ভালো।
প্রথমত, সাধারণ চিনি ছাড়া টক দই বেছে নিন। মিষ্টি দই বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া দই নিয়মিত খেলে অতিরিক্ত চিনি শরীরে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পরিমাণে সংযত থাকুন। এক বাটি টক দই অনেকের জন্য যথেষ্ট। একসঙ্গে অনেকটা খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
তৃতীয়ত, চাইলে দুপুরের খাবারের সঙ্গে বা দিনের অন্য সময়ে খেতে পারেন। রাতে খেলে যদি আপনার কোনো অস্বস্তি না হয়, পরিমিত পরিমাণে খাওয়াও সাধারণত সমস্যা নয়।
চতুর্থত, দইয়ের সঙ্গে ফল, বাদাম বা বীজ যোগ করা যায়। এতে খাবারের পুষ্টিমান আরও বাড়ে।
টানা এক মাস খেলে কি সবার উপকার হবে?
না। টক দই স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও এটি সবার জন্য একইভাবে উপকারী হবে না। কারও ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকতে পারে, কারও দুধজাত খাবারে অ্যালার্জি থাকতে পারে, আবার কারও অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বাজারের সব দই একরকম নয়। কিছু দইয়ে প্রচুর চিনি বা অন্য উপাদান যোগ করা থাকে। তাই দই কেনার সময় উপকরণের তালিকা ও পুষ্টির তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।
তাহলে এক মাস টক দই খাওয়া যাবে?
সুস্থ একজন মানুষ পরিমিত পরিমাণে সাধারণ, চিনি ছাড়া টক দই প্রতিদিন খেতে পারেন। এতে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও জীবন্ত ব্যাকটেরিয়ার মতো কিছু উপকারী পুষ্টি পাওয়া যায়। অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যও এটি খাদ্যতালিকায় ভালো একটি সংযোজন হতে পারে।
তবে এটিকে কোনো জাদুকরি খাবার হিসেবে দেখা ঠিক নয়। টক দই খেলেই ওজন কমবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে বা সব ধরনের হজমের সমস্যা দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
আর রাতে দই খাওয়া নিয়ে আয়ুর্বেদের কিছু সতর্কতা থাকলেও সেগুলোকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিশ্চিত নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা উচিত নয়। নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে, পরিমিত পরিমাণে এবং চিনি ছাড়া টক দই খাওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি। যাদের দই খেলে নিয়মিত পেটের সমস্যা, অ্যালার্জির লক্ষণ বা অ্যাসিডিটি বাড়ে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, টিভি ৯, এনডিটিভি



