logo
Advertisement

খাবার গরম করতে মাইক্রোওয়েভ কতটা নিরাপদ, যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
খাবার গরম করতে মাইক্রোওয়েভ কতটা নিরাপদ, যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
ছবি: টেস্টিং টেবিল

ব্যস্ত জীবনে রান্নাঘরের কাজ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে মাইক্রোওয়েভ। সকালে দ্রুত নাশতা গরম করা থেকে শুরু করে আগের দিনের রান্না করা খাবার কয়েক মিনিটে গরম করে নেওয়া, সবই করা যায় এতে। ফলে অনেক বাড়িতেই এখন মাইক্রোওয়েভ নিয়মিত ব্যবহার করা হয়।

Advertisement

তবে মাইক্রোওয়েভ নিয়ে মানুষের মনে একটি ভয় থেকেই যায়। এতে খাবার গরম করলে কি রেডিয়েশন খাবারের মধ্যে ঢুকে যায়? সেই খাবার খেলে কি শরীরের ক্ষতি হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিকভাবে কাজ করা এবং সঠিক নিয়মে ব্যবহার করা মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করা সাধারণত নিরাপদ। মাইক্রোওয়েভে ব্যবহৃত তরঙ্গ খাবারকে তেজস্ক্রিয় করে না। বরং এই তরঙ্গ খাবারের পানির অণুগুলোকে নড়াচড়া করিয়ে তাপ তৈরি করে।

তবে যন্ত্রটি ব্যবহারের সময় কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি। ভুল পাত্র ব্যবহার, অসমভাবে খাবার গরম করা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত মাইক্রোওয়েভ চালানোর মতো ভুল থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মাইক্রোওয়েভ কীভাবে খাবার গরম করে?

মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ভেতরে একটি যন্ত্র থাকে, যা মাইক্রোওয়েভ তৈরি করে। এই তরঙ্গ ওভেনের ধাতব ভেতরের অংশে প্রতিফলিত হয়ে খাবারের মধ্যে প্রবেশ করে।

খাবারে থাকা পানির অণুগুলো এই তরঙ্গের প্রভাবে দ্রুত নড়াচড়া করতে থাকে। অণুগুলোর এই নড়াচড়া থেকেই তাপ তৈরি হয় এবং খাবার গরম হয়।

এটি এক্স-রে বা অন্য ধরনের আয়নাইজিং রেডিয়েশনের মতো নয়। মাইক্রোওয়েভ হলো নন-আয়নাইজিং রেডিয়েশন। সঠিকভাবে তৈরি ও ব্যবহার করা মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকে বের হওয়া রেডিয়েশনের মাত্রা নির্ধারিত নিরাপত্তা সীমার মধ্যে থাকে।

খাবার কি তেজস্ক্রিয় হয়ে যায়?

না। মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করার পর খাবার তেজস্ক্রিয় হয়ে যায়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মাইক্রোওয়েভের শক্তি খাবারের মধ্যে শোষিত হয়ে তাপে পরিণত হয়। খাবারের মধ্যে রেডিয়েশন জমে থাকে না।

তাই মাইক্রোওয়েভে গরম করা খাবার খেলে শরীরে রেডিয়েশন ঢুকে যাবে, এমন ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে পুষ্টি কমে যায়?

অনেকে মনে করেন, মাইক্রোওয়েভে রান্না বা খাবার গরম করলে খাবারের সব পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। বিষয়টি এমন নয়।

বরং রান্নার সময় কম হওয়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে কম পানি ব্যবহারের কারণে কিছু পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন ও খনিজ সাধারণ রান্নার তুলনায় ভালোভাবে ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনও জানিয়েছে, মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে খাবারের পুষ্টিগুণ সাধারণ রান্নার তুলনায় বেশি নষ্ট হয় না।

অবশ্য খাবার যত বেশি সময় ধরে এবং যত বেশি তাপে রান্না করা হবে, কিছু তাপসংবেদনশীল পুষ্টি তত বেশি কমতে পারে। তাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় খাবার গরম না করাই ভালো।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে খাবার অসমভাবে গরম হওয়া

মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাবারের সব অংশ সব সময় সমানভাবে গরম হয় না।

এক অংশ খুব গরম হয়ে গেলেও অন্য অংশ তুলনামূলক ঠান্ডা থাকতে পারে। বিশেষ করে ঘন খাবার, মাংস, ভাত বা বড় পরিমাণের খাবারের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি হতে পারে।

খাবারের কোনো অংশ যথেষ্ট গরম না হলে সেখানে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরি ধ্বংস নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনও মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করার সময় এই অসম তাপের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে।

খাবার গরম করার সঠিক পদ্ধতি কী?

ফ্রিজে রাখা আগের দিনের খাবার মাইক্রোওয়েভে গরম করার সময় শুধু ওপরের অংশ গরম হয়েছে কি না দেখলেই হবে না।

খাবার মাঝখানেও যথেষ্ট গরম হয়েছে কি না নিশ্চিত করতে হবে। তরকারি, স্যুপ বা ঝোলজাতীয় খাবার হলে মাঝখানে একবার নেড়ে আবার গরম করা ভালো।

প্রয়োজনে খাবারের পরিমাণ অনুযায়ী কয়েক দফায় গরম করতে পারেন। খাবার গরম করার পর কিছুক্ষণ রেখে দেওয়ার প্রয়োজন থাকলে প্যাকেট বা রেসিপিতে দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলুন।

অবশিষ্ট খাবার নিরাপদভাবে গরম করার ক্ষেত্রে ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত গরম করার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন।

কোন পাত্রে খাবার গরম করবেন?

মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাত্র নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কাচ, সিরামিক বা মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের উপযোগী নির্দিষ্ট পাত্র সাধারণত ব্যবহার করা যায়। তবে সব ধরনের প্লাস্টিক পাত্র মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারযোগ্য নয়। কিছু প্লাস্টিক বেশি তাপে গলে যেতে পারে বা খাবারের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।

তাই কোনো পাত্রের গায়ে মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের উপযোগী চিহ্ন বা প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা আছে কি না দেখে নিন।

প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করবেন?

এ বিষয়ে সবচেয়ে নিরাপদ নিয়ম হলো, যে প্লাস্টিক পাত্র মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতকারক অনুমোদন করেছেন, শুধু সেটিই ব্যবহার করা।

পুরোনো বা অচেনা প্লাস্টিকের পাত্র, একবার ব্যবহারযোগ্য খাবারের প্যাকেট কিংবা এমন কোনো প্লাস্টিকের পাত্র যাতে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের নির্দেশনা নেই, তা ব্যবহার না করাই ভালো।

বিশেষ করে উচ্চ তাপে দীর্ঘ সময় খাবার গরম করার ক্ষেত্রে কাচ বা সিরামিকের মাইক্রোওয়েভ-উপযোগী পাত্র ব্যবহার করা সহজ ও নিরাপদ বিকল্প।

ধাতব পাত্র বা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল?

সাধারণভাবে ধাতব পাত্র বা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল মাইক্রোওয়েভে ব্যবহার করা উচিত নয়, যদি না নির্দিষ্ট মডেলের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনায় তা অনুমোদিত থাকে।

মাইক্রোওয়েভ ধাতব বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়। এতে খাবার অসমভাবে গরম হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে ওভেনের ক্ষতিও হতে পারে।

তাই নিরাপদ থাকতে কাচ বা মাইক্রোওয়েভ-উপযোগী সিরামিক পাত্র বেছে নেওয়াই ভালো।

পানি গরম করার সময়ও সাবধান

মাইক্রোওয়েভে শুধু পানি গরম করলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

খুব বেশি সময় ধরে পরিষ্কার কাপে পানি গরম করলে পানি ফুটন্ত তাপমাত্রার ওপরে উঠে যেতে পারে, কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বোঝা নাও যেতে পারে। কাপটি একটু নড়ানো বা পানিতে চা বা কফির উপকরণ দেওয়ার সময় হঠাৎ পানি ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে মারাত্মক দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।

তাই মাইক্রোওয়েভে পানি গরম করার সময় প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করুন এবং অতিরিক্ত সময় ধরে গরম করবেন না।

মাইক্রোওয়েভের দরজা নষ্ট হলে কী করবেন?

মাইক্রোওয়েভের দরজা ঠিকভাবে বন্ধ না হলে বা দরজার কবজা, লক কিংবা সিল নষ্ট হলে সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় মাইক্রোওয়েভ ওভেনে এমন ব্যবস্থা থাকে যাতে দরজা খোলা থাকলে মাইক্রোওয়েভ উৎপন্ন না হয়। তবে দরজার নিরাপত্তাব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই দরজা বাঁকা হয়ে গেলে, লক ঠিকমতো কাজ না করলে কিংবা যন্ত্রটি দরজা খোলা অবস্থায় চালু থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করুন।

খালি মাইক্রোওয়েভ চালাবেন না

মাইক্রোওয়েভে খাবার বা তরল ছাড়া খালি অবস্থায় যন্ত্র চালানো উচিত নয়, যদি প্রস্তুতকারকের নির্দেশনায় তা অনুমোদিত না থাকে।

খালি ওভেনে মাইক্রোওয়েভ শোষণ করার মতো খাবার না থাকলে যন্ত্রের ভেতরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই প্রতিবার ব্যবহারের আগে ওভেনের নির্দেশিকা দেখে নেওয়া ভালো।

খাবার ঢেকে গরম করবেন?

অনেক খাবার মাইক্রোওয়েভে গরম করার সময় ঢেকে রাখা ভালো। এতে খাবারের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং গরম হওয়াও তুলনামূলক ভালো হতে পারে।

তবে ঢাকনা বা আবরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেবেন না। বাষ্প বের হওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের উপযোগী ঢাকনা ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো।

মাইক্রোওয়েভে গরম করা খাবার কি ক্যানসার ঘটায়?

মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করলেই ক্যানসার হয়, এমন প্রমাণ নেই।

মাইক্রোওয়েভের তরঙ্গ খাবারকে তেজস্ক্রিয় করে না। স্বাভাবিক অবস্থায় এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহৃত মাইক্রোওয়েভকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন নিরাপদ বলে মনে করে।

তবে খাবার গরম করার জন্য ভুল ধরনের প্লাস্টিক বা অন্য অনুপযুক্ত পাত্র ব্যবহার করা উচিত নয়। ঝুঁকির জায়গাটি মাইক্রোওয়েভের রেডিয়েশন নয়, বরং ভুল পাত্র, অতিরিক্ত গরম করা বা খাবার অসমভাবে গরম হওয়ার মতো ব্যবহারজনিত সমস্যা।

মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের সময় যে ৮ নিয়ম মনে রাখবেন

  • মাইক্রোওয়েভ-উপযোগী পাত্র ব্যবহার করুন।
  • ধাতব পাত্র বা ফয়েল ব্যবহার করার আগে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা দেখুন।
  • খাবার মাঝখানে নেড়ে সমানভাবে গরম করুন।
  • খাবারের ভেতর পর্যন্ত যথেষ্ট গরম হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।
  • পানি অতিরিক্ত সময় ধরে গরম করবেন না।
  • দরজা, কবজা বা সিল নষ্ট হলে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করবেন না।
  • খালি মাইক্রোওয়েভ চালাবেন না।
  • প্রতিটি যন্ত্রের নিজস্ব নির্দেশিকা মেনে চলুন।

মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করা নিয়ে ভয় পাওয়ার মতো কারণ নেই। সঠিকভাবে কাজ করা মাইক্রোওয়েভ খাবারকে তেজস্ক্রিয় করে না এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি সাধারণভাবে নিরাপদ।

বরং মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে খাবার যেন সমানভাবে গরম হয় এবং সঠিক পাত্র ব্যবহার করা হয়। ফ্রিজে রাখা খাবার গরম করার সময় মাঝখান পর্যন্ত যথেষ্ট তাপ পৌঁছেছে কি না নিশ্চিত করাও জরুরি।

অর্থাৎ মাইক্রোওয়েভ নিজে ভয় পাওয়ার মতো কোনো যন্ত্র নয়। ভুলভাবে ব্যবহার করাই বরং সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সূত্র: টিভি ৯