প্রি-পেইড মিটারে রিচার্জ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দেখার সহজ কৌশল
-f1bde4-720x405.webp)
বিদ্যুতের বিল নিয়ে মাস শেষে হিসাব করার দিন অনেকটাই বদলে গেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার আওতায় এখন অনেক গ্রাহক প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করছেন। আগে বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পর বিল আসত, আর এখন আগে টাকা রিচার্জ করে সেই অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়।
প্রি-পেইড মিটারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মিটারে কত টাকা বা কত ইউনিট বিদ্যুৎ আছে, কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে কিংবা সর্বশেষ কত টাকা রিচার্জ করা হয়েছে, এসব তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই মিটার থেকেই জানা যায়। এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ট কোড ব্যবহার করতে হয়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সব প্রি-পেইড মিটারের কোড এক নয়। মিটারের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, মিটারের ধরন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা অনুযায়ী কোড আলাদা হতে পারে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যেও হেক্সিং, ইনহে, লিনিয়াং ও ইস্টার্ন (Hexing, Inhe, Linyang ও Eastern) মিটারের জন্য আলাদা শর্ট কোড দেওয়া হয়েছে।
তাই আপনার মিটারের ধরন না জেনে কোনো কোড ব্যবহার না করাই ভালো।
প্রি-পেইড মিটারে সবচেয়ে দরকারি কিছু কোড
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কিছু কোড বিশেষভাবে কাজে লাগে। বিশেষ করে কিপ্যাড মিটারের ক্ষেত্রে এগুলো জানা থাকলে মিটারের বিভিন্ন তথ্য দ্রুত দেখা যায়।
৮০১: মিটারে কত টাকা আছে
মিটারে বর্তমানে কত টাকা ব্যালেন্স রয়েছে, তা জানার জন্য অনেক কিপ্যাড প্রি-পেইড মিটারে ৮০১ কোড ব্যবহার করা হয়।
ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, ডেসকো এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশিত তথ্যেও ৮০১ কোডকে মিটারের বর্তমান বা অবশিষ্ট ব্যালেন্স দেখার কোড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৮১৪: চলতি মাসে কত ইউনিট ব্যবহার হয়েছে
এই কোড দিয়ে চলতি মাসে মোট কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে, তা জানা যায়। মিটারের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা নিতে এটি বেশ কাজে লাগে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং ডেসকোর প্রকাশিত তালিকায় ৮১৪ কোডের মাধ্যমে চলতি মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দেখার কথা বলা হয়েছে।
৮০৪: মিটার নম্বর
মিটারের নিজস্ব নম্বর বা সিরিয়াল নম্বর জানার প্রয়োজন হলে ৮০৪ কোড কাজে লাগতে পারে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের শর্ট কোড তালিকায় ৮০৪ দিয়ে মিটারের সিরিয়াল নম্বর দেখানোর কথা বলা হয়েছে।
৮০৬: কেন মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে
মিটার হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিলে এর কারণ জানতে ৮০৬ কোড কিছু মিটারে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় ৮০৬ কোডকে রিলে পরিচালনার কারণ দেখার কোড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৮১০: জরুরি ঋণের সীমা
প্রি-পেইড মিটারে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে জরুরি ব্যালেন্স বা ইমার্জেন্সি ওভারড্রাফট সুবিধা পাওয়া যায়। ৮১০ কোড কিছু মিটারে এই জরুরি ওভারড্রাফটের সীমা দেখাতে ব্যবহার করা হয়।
তবে মিটারভেদে জরুরি ব্যালেন্স দেখার কোড আলাদা হতে পারে। তাই নিজের মিটারের নির্দেশিকা দেখে ব্যবহার করা উচিত।
৮১৭: সর্বশেষ রিচার্জের পরিমাণ
সর্বশেষ কত টাকা রিচার্জ করা হয়েছে, তা জানতে কিছু মিটারে ৮১৭ কোড ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশিত মিটার শর্ট কোড তালিকায় এটি সর্বশেষ রিচার্জের পরিমাণ দেখার কোড হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
৮৩০: সর্বশেষ রিচার্জের টোকেন
সর্বশেষ রিচার্জের টোকেন সংক্রান্ত তথ্য দেখার জন্য কিছু হেক্সিং মিটারে ৮৩০ কোড ব্যবহার করা হয়। তবে অন্য ব্র্যান্ডের মিটারে এর কোড ভিন্ন হতে পারে।
৮০২: বর্তমান তারিখ
কিছু প্রি-পেইড মিটারে ৮০২ কোড দিয়ে মিটারে সেট করা বর্তমান তারিখ দেখা যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একটি সরকারি মিটার সংক্রান্ত নথিতে এই তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
৮০৩: বর্তমান সময়
মিটারে বর্তমানে কোন সময় সেট করা আছে, তা দেখতে কিছু মিটারে ৮০৩ কোড ব্যবহার করা হয়।
৮০৮: বর্তমানে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে
কিছু মিটারে ৮০৮ কোড দিয়ে তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বা ইনস্ট্যানটেনিয়াস পাওয়ার দেখা যায়। অর্থাৎ ওই মুহূর্তে বাসায় কতটা বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সব মিটারে কি একই কোড কাজ করবে?
না। এটাই প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
যেমন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় দেখা যায়, বর্তমান ব্যালেন্স দেখার জন্য হেক্সিং মিটারে ৮০১ থাকলেও ইনহে, লিনিয়াং এবং ইস্টার্ন মিটারে ভিন্ন কোড রয়েছে।
ডেসকোর প্রকাশিত নির্দেশিকাতেও কিপ্যাড মিটার এবং বিভিন্ন ধরনের স্মার্ট কার্ড মিটারের তথ্য দেখার পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি বা নেসকোর প্রকাশিত ম্যানুয়ালে বর্তমান ব্যালেন্স, বর্তমান বিদ্যুতের হার, জরুরি ব্যালেন্স, ভোল্টেজ, কারেন্টসহ বিভিন্ন তথ্যের জন্য আলাদা শর্ট কোড দেওয়া হয়েছে।
তাই ইন্টারনেট থেকে কোনো কোড দেখে সরাসরি নিজের মিটারে প্রয়োগ করার আগে মিটারের ব্র্যান্ড ও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার নির্দেশিকা দেখে নেওয়া ভালো।
কিপ্যাড মিটারে কোড কীভাবে ব্যবহার করবেন?
যেসব মিটারে কিপ্যাড রয়েছে, সাধারণত সেখানে কোড লিখে Enter বোতাম চাপলে সংশ্লিষ্ট তথ্য স্ক্রিনে দেখা যায়। ডেসকোর নির্দেশিকাতেও কিপ্যাড মিটারে কোড দেওয়ার পর Enter বোতাম চাপার কথা বলা হয়েছে।
তবে মিটারের মডেল অনুযায়ী বোতামের নাম বা ব্যবহারের পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।
স্মার্ট কার্ড মিটারে কী হবে?
সব প্রি-পেইড মিটার কিপ্যাডযুক্ত নয়। কিছু মিটারে স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করা হয়। এসব মিটারে তথ্য দেখার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। ডেসকোর তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ডযুক্ত কিছু মিটারে কার্ড পাঠ করে বা স্ক্রল বোতাম ব্যবহার করে বিভিন্ন তথ্য দেখা যায়।
মিটারের কোডের তালিকা কেন সংরক্ষণ করে রাখবেন?
প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারের সময় কয়েকটি তথ্য নিয়মিত জানা দরকার। যেমন মিটারে কত টাকা আছে, চলতি মাসে কত ইউনিট ব্যবহার হয়েছে এবং সর্বশেষ কখন বা কত টাকা রিচার্জ করা হয়েছে।
এসব তথ্য জানা থাকলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নজর রাখা সহজ হয়। বিশেষ করে ব্যালেন্স দ্রুত কমে গেলে ব্যবহারকারী বুঝতে পারেন যে বাসায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে কি না।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডও প্রি-পেমেন্ট মিটারের অন্যতম সুবিধা হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নজর রাখার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
কোড কাজ না করলে কী করবেন?
কোনো কোড দেওয়ার পর তথ্য না এলে বারবার একই কোড ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। প্রথমে দেখে নিন আপনার মিটার কোন কোম্পানির এবং সেটি কিপ্যাড নাকি স্মার্ট কার্ড মিটার।
এরপর সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মিটার ব্যবহারের নির্দেশিকা দেখুন। ডিপিডিসি তাদের ওয়েবসাইটে ওয়াসিওন, হেক্সিং, ইনহেমিটার, টিএসএস/কাইফা, শেনজেন স্টার, যমুনা, সেল ও নর্দান সহ (Wasion, Hexing, Inhemeter, TSS/KAIFA, Shenzhen Star, Jamuna, Cell ও Northern) বিভিন্ন মিটারের আলাদা নির্দেশিকা দিয়েছে।
নেসকোও স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারের জন্য আলাদা শর্ট কোড ও ব্যবহার নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।
উপরের তালিকাটি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশিত শর্ট কোড এবং ডেসকোর নির্দেশিকায় থাকা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। আপনার মিটারের ব্র্যান্ড বা মডেল অনুযায়ী কোড আলাদা হতে পারে।
প্রি-পেইড মিটার শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখে না, মিটার থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার সুযোগ দেয়। কয়েকটি দরকারি কোড জানা থাকলে ব্যালেন্স, বিদ্যুৎ ব্যবহার, রিচার্জসহ বিভিন্ন তথ্য নিজেই দেখে নেওয়া যায়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মিটারভেদে কোড আলাদা হতে পারে। তাই কোনো কোড ব্যবহারের আগে নিজের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও মিটারের মডেল অনুযায়ী দেওয়া সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করাই নিরাপদ।
সূত্র
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, প্রি-পেমেন্ট মিটারিং সিস্টেম
ডিপিডিসি, প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারের গ্রাহক নির্দেশনা
ডিপিডিসি, প্রি-পেইড মিটার সেবা
ডেসকো, প্রি-পেইড মিটার গ্রাহক নির্দেশিকা