ব্রেকআপের পর ব্রণ, দুশ্চিন্তায় ত্বকে চুলকানি কি কাকতালীয়

ব্রেকআপ, মানসিক চাপ বা দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার পর হঠাৎ মুখে ব্রণ বেড়ে যাওয়া বা ত্বকের একজিমা ফিরে আসা অনেকেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বিষয়টিকে কাকতালীয় মনে করেন, আবার কেউ কেউ ভাবেন খাদ্যাভ্যাস বা প্রসাধনীর সমস্যা।
হঠাৎ কোনো মানসিক ধাক্কা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা দীর্ঘদিনের উদ্বেগের পর অনেকেই লক্ষ্য করেন ত্বকে ব্রণ বেড়ে গেছে, একজিমা মাথাচাড়া দিয়েছে বা চুলকানির সমস্যা শুরু হয়েছে। বিষয়টি কাকতালীয় মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মানসিক চাপ ও ত্বকের স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বক শুধু শরীরের বাইরের আবরণ নয়। আমাদের মস্তিষ্ক ও ত্বকের বিকাশ একই ধরনের কোষ থেকে শুরু হয়। ফলে মানসিক অবস্থার প্রভাব ত্বকের ওপর পড়া অস্বাভাবিক নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ব্রণ, একজিমা, সোরিয়াসিস, আমবাতসহ বিভিন্ন চর্মরোগের উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।
মানসিক চাপ ত্বকে কীভাবে প্রভাব ফেলে
কোনো কারণে মানসিক চাপ তৈরি হলে মস্তিষ্ক শরীরে বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণ শুরু করে। এর মধ্যে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন অন্যতম। এসব হরমোন শরীরকে চাপের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহায্য করলেও দীর্ঘদিন বেশি মাত্রায় থাকলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গেলে শরীরে প্রদাহ বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব ত্বকেও পড়ে। ফলে একজিমা, সোরিয়াসিস বা অন্যান্য প্রদাহজনিত চর্মরোগের উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে।
কেন বাড়ে ব্রণের সমস্যা
মানসিক চাপের সময় ত্বকের তৈলগ্রন্থি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে সিবাম বা প্রাকৃতিক তেল বেশি উৎপন্ন হয়। অতিরিক্ত তেল লোমকূপ বন্ধ করে দেয় এবং ব্রণ তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এ কারণে পরীক্ষার আগে, চাকরির সাক্ষাৎকারের সময় বা ব্যক্তিগত জীবনের চাপের মধ্যে অনেকের মুখে হঠাৎ ব্রণ দেখা দিতে পারে।
ত্বক শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর দুর্বল করে দিতে পারে। এতে ত্বক আর্দ্রতা হারায় এবং বাইরের ধুলাবালি, অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান বা দূষণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
ফলে ত্বক শুষ্ক, রুক্ষ ও খসখসে হয়ে যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে চুলকানি ও জ্বালাপোড়ার সমস্যাও দেখা দেয়।
সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে
মানসিক চাপ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। এতে শরীরের জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে ত্বকে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলোও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
চুলকানি ও মানসিক চাপের দুষ্টচক্র
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়কে ইচ-স্ক্র্যাচ সাইকেল বা চুলকানি-চুলকানোর চক্র বলে থাকেন। মানসিক চাপের কারণে চুলকানি বাড়ে, আবার বেশি চুলকানোর ফলে ত্বকের ক্ষতি হয়। এতে আরও বেশি চুলকানি তৈরি হয়।
এই অবস্থায় ব্যক্তি আরও বিরক্ত, উদ্বিগ্ন ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। ফলে মানসিক চাপ আবার বেড়ে যায় এবং সমস্যাও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
ঘুমের অভাবও সমস্যা বাড়ায়
স্ট্রেস বা মানসিক চাপ অনেক সময় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ত্বক নিজেকে মেরামত করার সুযোগ কম পায়। ফলে ত্বকের উজ্জ্বলতা কমে যেতে পারে, প্রদাহ বাড়তে পারে এবং ব্রণ বা অন্যান্য সমস্যার নিরাময়ও ধীর হয়ে যায়।
মানসিক চাপ কমালে কি উপকার পাওয়া যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ত্বকের অবস্থারও উন্নতি হতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং ধ্যান বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাইন্ডফুলনেসভিত্তিক থেরাপি ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি কিছু চর্মরোগের উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে সোরিয়াসিস ও একজিমার রোগীদের ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
ত্বক ভালো রাখতে যা করবেন
ত্বকের যত্নের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান, শারীরিক ব্যায়াম এবং নিজের জন্য কিছু সময় রাখা ত্বক ও মনের জন্য উপকারী।
যদি দীর্ঘদিন ধরে ব্রণ, একজিমা, চুলকানি বা অন্য কোনো ত্বকের সমস্যা বাড়তে থাকে, তাহলে শুধু প্রসাধনী বা ওষুধের ওপর নির্ভর না করে মানসিক চাপের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
মানসিক চাপ শুধু মনের ওপর নয়, ত্বকের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রণ, একজিমা, সোরিয়াসিস কিংবা ত্বকের সংবেদনশীলতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে অনেক সময় স্ট্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সুস্থ ত্বক পেতে শুধু স্কিনকেয়ার নয়, মানসিক সুস্থতার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা



