logo

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যেসব চার্জ অনেকেই খেয়াল করেন না

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যেসব চার্জ অনেকেই খেয়াল করেন না
ছবি: কমভিভা

মোবাইল ব্যাংকিং এখন দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা। টাকা পাঠানো, বিল দেওয়া, মোবাইল রিচার্জ থেকে শুরু করে নগদ টাকা তোলার কাজও এখন কয়েক মুহূর্তে করা যায়। তবে অনেক সময় লেনদেনের সময় যে চার্জ কাটা হচ্ছে, তা আমরা খেয়াল করি না। ফলে মাস শেষে দেখা যায়, ছোট ছোট চার্জ মিলিয়ে বেশ কিছু টাকা খরচ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবার বিভিন্ন লেনদেনে চার্জের হার এক নয়। কোন সেবা ব্যবহার করছেন, কত টাকা লেনদেন করছেন, কোন মাধ্যমে করছেন এবং নির্দিষ্ট মাসে আপনার লেনদেনের সীমা কতটুকু ব্যবহার হয়েছে, তার ওপরও চার্জ নির্ভর করতে পারে। তাই শুধু লেনদেনের পরিমাণ জানলেই হবে না, সেই লেনদেনের সঙ্গে কী ধরনের চার্জ যুক্ত হচ্ছে, সেটিও জানা জরুরি।

ক্যাশ আউটের চার্জ সবচেয়ে বেশি চোখ এড়িয়ে যায়

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা তোলার সময় সাধারণত ক্যাশ আউট চার্জ দিতে হয়। অনেকেই মনে করেন, অ্যাকাউন্টে যত টাকা আছে তার পুরোটা হাতে পাবেন। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তুললে চার্জ হিসেবে আলাদা টাকা কেটে নেওয়া হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বিকাশের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ এজেন্ট থেকে ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে প্রতি হাজার টাকায় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা চার্জ রয়েছে। নির্দিষ্ট প্রিয় এজেন্ট থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্যাশ আউট করলে প্রতি হাজারে ১৩ টাকা ৯৫ পয়সা হারে চার্জ প্রযোজ্য। সীমা পার হলে আবার সাধারণ হার প্রযোজ্য হতে পারে।

অর্থাৎ ১০ হাজার টাকা তুললে শুধু ১০ হাজার টাকা তুলছি এমন ভাবলে ভুল হতে পারে। আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে চার্জসহ অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়া হবে।


প্রিয় নম্বরের সুবিধা সব সময় বিনা খরচে নয়

অনেক মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় নির্দিষ্ট নম্বরকে প্রিয় নম্বর হিসেবে রাখলে কম খরচে টাকা পাঠানোর সুবিধা থাকে। কিন্তু এই সুবিধারও নির্দিষ্ট সীমা থাকতে পারে।

বিকাশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রিয় নম্বরে মাসে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সেন্ড মানি বিনা চার্জে করা যায়। এরপর নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে ৫ টাকা বা ১০ টাকা চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। আবার অন্য নম্বরে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রেও মাসিক লেনদেনের পরিমাণ অনুযায়ী চার্জ রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মাসের শুরুতে যে লেনদেন বিনা খরচে হয়েছে, মাসের শেষ দিকে একই ধরনের লেনদেন করলেই সেটি বিনা খরচে হবে এমন নয়।


অল্প অল্প সেন্ড মানি মিলেও বড় খরচ হতে পারে

একবারে ৫ বা ১০ টাকা চার্জ খুব বেশি মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন বা নিয়মিত টাকা পাঠালে মাস শেষে এই ছোট চার্জগুলো যোগ হয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্ক হতে পারে।

তাই নিয়মিত টাকা পাঠানোর অভ্যাস থাকলে মাসে মোট কত টাকা সেন্ড মানি করছেন, তা খেয়াল রাখা দরকার। বিশেষ করে একই সেবায় বিনা চার্জের সীমা থাকলে সেই সীমা কতটুকু ব্যবহার হয়েছে, সেটিও দেখে নেওয়া ভালো।

এটিএম থেকে টাকা তুললেও চার্জ থাকতে পারে

অনেকে মনে করেন, এজেন্টের বদলে এটিএম থেকে টাকা তুললে কোনো চার্জ নেই। বাস্তবে এটিএম ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট চার্জ থাকতে পারে।

বিকাশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট এটিএম বুথ থেকে ক্যাশ আউটের সাধারণ হার প্রতি হাজারে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। তবে রেমিট্যান্সের টাকা তোলার ক্ষেত্রে আলাদা কম হারও প্রযোজ্য হতে পারে।

অর্থাৎ কোন ধরনের টাকা তুলছেন এবং কোন সেবা ব্যবহার করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও চার্জের ধরন আলাদা হতে পারে

বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাওয়ার পর সেই টাকা ক্যাশ আউট করলে সাধারণ ক্যাশ আউটের মতো একই চার্জ সব সময় নাও হতে পারে।

যেমন বিকাশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট এটিএম থেকে রেমিট্যান্সের টাকা ক্যাশ আউটের জন্য প্রতি হাজারে ৭ টাকা হারে চার্জের সুবিধা রয়েছে। আবার রেমিট্যান্সের নির্দিষ্ট ব্যালেন্সের বেশি টাকা তুললে সাধারণ ক্যাশ আউটের হার প্রযোজ্য হতে পারে।

তাই রেমিট্যান্সের টাকা তোলার আগে কোন হার প্রযোজ্য হচ্ছে, তা দেখে নেওয়া ভালো।

এক সেবা থেকে অন্য সেবায় টাকা পাঠালে চার্জ হতে পারে

মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো, অন্য ধরনের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা বা কার্ডে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রেও আলাদা চার্জ থাকতে পারে।

রকেটের প্রকাশিত চার্জ তালিকায় দেখা যায়, একই ধরনের রকেট অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো বিনা খরচে হলেও অন্য ধরনের পণ্যে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ডে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রেও চুক্তি অনুযায়ী চার্জ নির্ধারিত হতে পারে।

তাই শুধু টাকা পাঠানো হচ্ছে বলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে লেনদেনটি বিনা খরচে হবে।

ভ্যাট ও করের বিষয়টিও খেয়াল রাখুন

কোনো কোনো সেবার ক্ষেত্রে প্রকাশিত চার্জের মধ্যেই ভ্যাট ও কর অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আবার অন্য কোনো সেবায় আলাদা নিয়ম থাকতে পারে।

যেমন রকেটের প্রকাশিত চার্জ তালিকায় উল্লেখ রয়েছে, তাদের তালিকাভুক্ত ফি ও চার্জ ভ্যাট ও করসহ।

তাই লেনদেনের আগে শুধু মূল চার্জ নয়, মোট কত টাকা কাটা হবে সেটি দেখা ভালো।

চার্জের তালিকা কোথায় পাবেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোবাইল আর্থিক সেবা সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে তাদের বিভিন্ন সেবার চার্জের তথ্য গ্রাহকদের জানাতে হয়। এজেন্ট পয়েন্ট, গ্রাহকসেবা কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে চার্জের তথ্য থাকার কথা।

তাই কোনো লেনদেন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপের চার্জের তালিকা দেখে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

অপ্রয়োজনীয় চার্জ এড়াবেন যেভাবে

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের চার্জ কমাতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে পারেন।

লেনদেনের আগে চার্জ দেখুন: টাকা পাঠানো বা ক্যাশ আউট করার আগে কত টাকা চার্জ কাটা হবে, তা দেখে নিন।

বিনা চার্জের সীমা জেনে রাখুন: কোন সেবায় মাসে কত টাকা পর্যন্ত বিনা চার্জে লেনদেন করা যায়, তা জেনে রাখুন।

প্রিয় নম্বরের সুবিধা থাকলে ব্যবহার করুন: নিয়মিত যাদের টাকা পাঠান, তাদের ক্ষেত্রে প্রিয় নম্বরের সুবিধা থাকলে তা ব্যবহার করতে পারেন।

ক্যাশ আউটের আগে বিকল্প দেখুন: এজেন্ট ও এটিএমে আলাদা চার্জ থাকলে কম খরচের বৈধ মাধ্যমটি বেছে নিতে পারেন।

লেনদেনের বার্তা খেয়াল করুন: প্রতিটি লেনদেনের পর আসা বার্তায় কত টাকা কাটা হয়েছে এবং কত টাকা চার্জ নেওয়া হয়েছে, তা দেখে নিন।

পুরোনো চার্জের তথ্যের ওপর নির্ভর করবেন না: মোবাইল ব্যাংকিংয়ের চার্জ ও সীমা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কয়েক মাস আগের কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা পরিচিত কারও বলা তথ্যের বদলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান চার্জের তালিকা দেখুন।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের চার্জকে পুরোপুরি গোপন বলা ঠিক নয়। কারণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর চার্জের তালিকা প্রকাশ করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বিভিন্ন সেবার আলাদা হার, মাসিক সীমা, লেনদেনের ধরন এবং বিশেষ সুবিধার কারণে অনেক গ্রাহকের কাছে প্রকৃত খরচটি সহজে বোঝা নাও যেতে পারে।

তাই লেনদেনের আগে শুধু কত টাকা পাঠাবেন বা তুলবেন তা নয়, কত টাকা চার্জ হিসেবে কাটা হবে সেটিও দেখে নেওয়া জরুরি। এতে ছোট ছোট অপ্রত্যাশিত খরচ এড়ানো সম্ভব হবে।


সূত্র

বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা সংক্রান্ত বিধিমালা

বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা সংক্রান্ত তথ্য

বিকাশ, ক্যাশ আউট চার্জ

বিকাশ, এটিএম থেকে ক্যাশ আউট

বিকাশ, সেন্ড মানি ও প্রিয় নম্বরের চার্জ

রকেট, চার্জ ও ফি