চুলের গোড়া শক্ত করার উপায়

চুল পড়া, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা চুল আঁচড়ানোর সময় গোড়া থেকে চুল উঠে আসা অনেকেরই খুব পরিচিত সমস্যা। চুলের যত্নে নিয়মিত তেল, শ্যাম্পু ও নানা ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পান না। চুলের সঠিক যত্নের অভাব, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ অথবা শারীরিক কোনো সমস্যার কারণে এরকম হতে পারে।
চুলের গোড়া শক্ত রাখতে চাইলে বাইরে থেকে যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি ভেতর থেকেও চুলের পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। সুষম খাবার খাওয়া, মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা এবং চুলের ক্ষতি করে এমন অভ্যাস এড়িয়ে চলার মাধ্যমে আপনি চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারেন। তবে চুল পড়ার পেছনে হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত কারণ বা কোনো রোগ দায়ী হলে শুধু ঘরোয়া যত্নে সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিৎিসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চুলের গোড়া শক্ত করার উপায় জানতে হলে প্রথমেই আপনাকে বুঝতে হবে চুল কীভাবে বাড়ে, কেন চুল পড়ে এবং কোন অভ্যাসগুলো চুলের ক্ষতি করে। সঠিক যত্নের পাশাপাশি সমস্যার কারণ শনাক্ত করতে পারলে চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব।
চুলের গোড়া দুর্বল হওয়ার কারণ কী?
চুলের গোড়া দুর্বল হওয়া মানে চুলের গোড়া থেকে চুল উঠে আসা, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া অথবা চুল সহজে ভেঙে যাওয়া। তবে চুল গোড়া থেকে পড়ে যাওয়া আর মাঝখান থেকে ভেঙে যাওয়া কিন্তু এক বিষয় না। এই দুই সমস্যার কারণ যেমন আলাদা, তেমনি সমাধানও আলাদা হতে পারে।
চুলের গোড়া বা ফলিকল মাথার ত্বকের ভেতরে থাকে। এখান থেকেই চুলের বৃদ্ধি হয়। অন্যদিকে, চুলের দৃশ্যমান অংশটি মূলত কেরাটিন নামের এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। অতিরিক্ত তাপ, রাসায়নিক প্রসাধনী বা ভুলভাবে চুল আঁচড়ানোর কারণে এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চুল পড়া বা দুর্বল হয়ে যাওয়ার কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো-
পুষ্টির ঘাটতি: শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাব হলে চুলের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
মানসিক চাপ: দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ অথবা বড় কোনো শারীরিক ধকলের কয়েক মাস পর চুল পড়া বেড়ে যেতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তন: গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরবর্তী সময়, মেনোপজ এবং থাইরয়েডের সমস্যার কারণে অনেক বেশি চুল পড়তে পারে।
বংশগত কারণ: পরিবারে টাক পড়া বা চুল পাতলা হওয়ার ইতিহাস থাকলে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চুলের ভুল যত্ন: খুব শক্ত করে চুল বাঁধা, অতিরিক্ত তাপ দিয়ে চুল স্ট্রেইট করা বা শুকানো, বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দিয়ে চুলের ধরন পরিবর্তন করা এবং ভেজা চুল জোরে আঁচড়ালে চুলের ক্ষতি হতে পারে।
মাথার ত্বকের সমস্যা: ছত্রাকের সংক্রমণ, প্রদাহ ও মাথার ত্বকের কিছু রোগের কারণে চুল পড়ে যেতে পারে।
মনে রাখবেন, প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক। তবে চুলের ঘনত্ব কমতে থাকলে, হঠাৎ অনেক বেশি চুল পড়লে অথবা মাথার কোনো অংশ ফাঁকা হয়ে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
চুলের গোড়া শক্ত করার ১০টি কার্যকর উপায়
খাবারের তালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখুন
চুলের প্রধান উপাদান কেরাটিন মূলত এক ধরনের প্রোটিন। তাই চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত প্রোটিন খাওয়া জরুরি। দীর্ঘদিন খাবারে প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে চুল পাতলা হয়ে যেতে পারে এবং চুল পড়া বাড়তে পারে।
তাই প্রতিদিনের খাবারে ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, দুধ, ডাল, ছোলা ও বাদাম রাখতে পারেন। যারা নিরামিষ খাবার খান, তারা ডাল, ছোলা, সয়াবিন, বাদাম ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎস থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারেন।
প্রোটিনের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত কম খাওয়া, দ্রুত ওজন কমানোর জন্য কঠোর ডায়েট বা দীর্ঘদিন একই ধরনের খাবার খাওয়াও চুলের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আয়রন ও প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ করুন
শরীরে আয়রনের ঘাটতি চুল পড়ার অন্যতম সম্ভাব্য কারণ। আয়রন শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করেঅ এটি রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। আয়রনের ঘাটতি থেকে রক্তস্বল্পতা হলে চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া ভিটামিন ডি, জিংক এবং কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিও চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
পুষ্টির চাহিদা পূরণে খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন:

আয়রন: মাছ, মাংস, ডাল ও শাকসবজি।
জিংক: মাংস, ডিম, বাদাম ও বীজ।
ভিটামিন সি: পেয়ারা, আমলকী, লেবু ও অন্যান্য ফল।
ভিটামিন ডি: তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার।
স্বাস্থ্যকর চর্বি: সামুদ্রিক মাছ, বাদাম ও বীজ।
তবে চুল পড়লেই ভিটামিনের ঘাটতি আছে, এটা ভাববেন না। পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রন, জিংক, বায়োটিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত না। শরীরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করলে উল্টো চুল পড়া বাড়তে পারে। অতিরিক্ত বায়োটিনও কিন্তু সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখুন
চুলের সুস্থতার জন্য মাথার ত্বকের যত্ন নেওয়া জরুরি। মাথার ত্বকে ঘাম, অতিরিক্ত তেল ও ময়লা জমে থাকলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই নিজের চুলের ধরন ও মাথার ত্বকের অবস্থা অনুযায়ী নিয়মিত শ্যাম্পু করুন।
শ্যাম্পু করার সময় নখ দিয়ে জোরে মাথার ত্বক ঘষবেন না। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। শ্যাম্পু মূলত মাথার ত্বক পরিষ্কারের জন্য ব্যবহার করুন। চুল বেশি শুষ্ক হলে কন্ডিশনার ব্যবহার করতে পারেন।
প্রতিদিন শ্যাম্পু করতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কারও মাথার ত্বক বেশি তৈলাক্ত হলে ঘন ঘন পরিষ্কার করার দরকার হতে পারে। আবার শুষ্ক চুলের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ঘন ঘন শ্যাম্পু করাই ভালো।
মাথার ত্বকে খুশকি, অতিরিক্ত চুলকানি, লালচে ভাব অথবা ঘা হলে সমস্যাটিকে শুধু সাধারণ শুষ্কতা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। এ রকম হলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন।
চুলে তেল ব্যবহার করুন, তবে সঠিকভাবে
নারকেল তেলসহ কিছু তেল চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং চুলের বাইরের স্তরের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এতে চুলের শুষ্কতা ও ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
চাইলে চুলের আগায় অল্প পরিমাণে নারকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন। তেল ব্যবহারের পর চুলে অস্বস্তি, চুলকানি বা মাথার ত্বকে সমস্যা হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।

তবে তেল মাখলেই চুলের গোড়া শক্ত হয়ে যাবে বা সব ধরনের চুল পড়া বন্ধ হবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বংশগত কারণে চুল পাতলা হওয়া, হরমোনের সমস্যা বা পুষ্টির ঘাটতি থাকলে শুধু তেল ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নাও হতে পারে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, মাথার ত্বকে তেল দিয়ে বেশিক্ষণ রেখে দিলেই বেশি উপকার পাওয়া যায় না। মাথার ত্বকের ধরন বুঝে তেল ব্যবহার করাই ভালো।
ভেজা চুলে জোরে চিরুনি চালাবেন না
ভেজা অবস্থায় চুল তুলনামূলকভাবে বেশি ভঙ্গুর থাকে। এ সময় জোরে চিরুনি চালালে চুল ভেঙে যেতে পারে। চুলের গোড়া থেকে চুল উঠে আসার মতো মনে হলেও অনেক সময় আসলে চুলের মাঝখান থেকে ভেঙে যায়।
চুলের ক্ষতি কমাতে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলুন-
- চুল শুকানোর সময় তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষবেন না। আলতোভাবে পানি শুষে নিন।
- জট ছাড়াতে বড় দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন।
- চুলের আগা থেকে ধীরে ধীরে জট ছাড়িয়ে ওপরের দিকে এগিয়ে যান।
- চুল আঁচড়ানোর সময় টান লাগলে জোর না করে ধীরে জট ছাড়ান।
- অন্যের চিরুনি ব্যবহার না করাই ভালো। চিরুনি নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।
চুলের ধরন অনুযায়ী ভেজা বা শুকনো চুল আঁচড়ানোর পদ্ধতি বেছে নিন। কোঁকড়ানো চুলের ক্ষেত্রে জট ছাড়ানোর জন্য কন্ডিশনার ব্যবহার করে আলতোভাবে আঁচড়ানো সুবিধাজনক হতে পারে।
অতিরিক্ত তাপ ও রাসায়নিক ব্যবহার কমাতে পারেন
নিয়মিত হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার, কার্লার বা চুলে রং করার রাসায়নিক ব্যবহার করলে চুলের বাইরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে চুল শুষ্ক হয়ে মাঝখান থেকে ভেঙে যেতে পারে।
চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এসব যন্ত্রের ব্যবহার কমাতে পারেন। ব্যবহার করলে তাপমাত্রা কম রাখুন এবং একই জায়গায় বেশিক্ষণ তাপ দেবেন না। বারবার চুল ব্লিচ করা, রাসায়নিক দিয়ে সোজা করা বা পার্ম করার মতো পদ্ধতিও এড়িয়ে চলুন।
এ ছাড়া খুব শক্ত করে বেণি বা খোঁপা বাঁধবেন না। দীর্ঘদিন চুলে অতিরিক্ত টান পড়লে চুলের গোড়ার ক্ষতি হতে পারে। এ ধরনের সমস্যাকে ট্র্যাকশন অ্যালোপেশিয়া বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে টান পড়তে থাকলে কিছু ক্ষেত্রে চুল স্থায়ীভাবে পড়ে যেতে পারে।
মাথার ত্বকে আলতোভাবে মালিশ করুন
আঙুলের ডগা দিয়ে মাথার ত্বকে কয়েক মিনিট আলতোভাবে মালিশ করলে আরাম পাওয়া যেতে পারে। তবে মালিশ করার সময় নখ দিয়ে আঁচড়াবেন না কিংবা জোরে ঘষবেন না।

কিছু ছোট গবেষণায় মাথার ত্বকে নিয়মিত মালিশের সঙ্গে চুলের পুরুত্বের সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে চুল গজানো বা চুল পড়া বন্ধ করার নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে মাথায় মালিশের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তাই মালিশকে চুলের যত্নের একটি সহায়ক অভ্যাস হিসেবে নিতে পারেন। এটিকে চুল পড়া সমস্যার সমাধান ভাববেন না। মাথার ত্বকে সংক্রমণ, ঘা বা ব্যথা থাকলে মালিশ করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মানসিক চাপ কমান ও পর্যাপ্ত ঘুমান
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বড় কোনো মানসিক ধাক্কা, অসুস্থতা, অস্ত্রোপচার বা শারীরিক ধকলের কয়েক মাস পর হঠাৎ চুল পড়া বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের চুল পড়া সাময়িক হয়।
মানসিক চাপ কমাতে প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটুন, হালকা ব্যায়াম করুন কিংবা নিজের পছন্দের কাজে সময় দিন। নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
চুল পড়ার একমাত্র কারণ মানসিক চাপ না। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা চুলের ঘনত্ব কমতে থাকলে অন্য কারণও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
চুলের জন্য উপযুক্ত প্রসাধনী বেছে নিন
বাজারে চুলের গোড়া শক্ত করা, চুল পড়া বন্ধ করা বা দ্রুত চুল বড় করার দাবি করে এমন অনেক পণ্য পাওয়া যায়। কিন্তু সব পণ্যের কার্যকারিতার পক্ষে সমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
শ্যাম্পু, কন্ডিশনার বা তেল বেছে নেওয়ার সময় নিজের চুলের ধরন এবং মাথার ত্বকের অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। চুল শুষ্ক হলে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এমন কন্ডিশনার ব্যবহার করতে পারেন। মাথার ত্বক সংবেদনশীল হলে জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন প্রসাধনী এড়িয়ে চলুন।

চুল পড়া কমানোর নামে বিক্রি হওয়া কোনো পণ্য ব্যবহার করার আগে তার উপাদান ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জানুন। কোনো পণ্য ব্যবহারে মাথার ত্বকে জ্বালা, চুলকানি বা লালচে ভাব দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
চুলের যত্নের প্রসাধনী চুলকে মসৃণ ও কম ভঙ্গুর করতে সাহায্য করতে পারে। তবে বংশগত বা হরমোনজনিত চুল পড়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রসাধনী ব্যবহার যথেষ্ট না।
চুল পড়ার কারণ বুঝে চিকিৎসা নিন
চুল পড়া কমাতে অনেকেই বিভিন্ন তেল, শ্যাম্পু বা ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কিন্তু সব ধরনের চুল পড়ার চিকিৎসা একই রকম না।
চুল পড়ার কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসক প্রয়োজনে রক্তে আয়রন ও থাইরয়েডের মাত্রা বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় পরীক্ষা করতে পারেন। পরীক্ষা প্রয়োজন কি না, তা ব্যক্তির উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
কিছু ক্ষেত্রে মিনোক্সিডিলের মতো ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে এটি সবার জন্য উপযুক্ত না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত। ওষুধ ব্যবহার করার আগে চুল পড়ার ধরন ও সম্ভাব্য কারণ জানা গুরুত্বপূর্ণ।
হঠাৎ অতিরিক্ত চুল পড়া শুরু হলে, মাথার কোনো অংশে গোল করে চুল উঠে গেলে, মাথার ত্বকে ঘা বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে অথবা চুল ক্রমাগত পাতলা হতে থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
চুলের গোড়া শক্ত করতে ঘরোয়া উপায়ে কী করবেন?
চুলের যত্নে কিছু সহজ অভ্যাস নিয়মিত মেনে চলতে পারেন। তবে এগুলো চুলের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করলেও সব ধরনের চুল পড়া বন্ধ করার নিশ্চয়তা দেয় না।
অ্যালোভেরা ব্যবহার: অ্যালোভেরা মাথার ত্বকে শীতল অনুভূতি দিতে পারে। তবে এটি চুল গজানোর নিশ্চিত উপায় না। ব্যবহার করলে আগে অল্প জায়গায় পরীক্ষা করুন। জ্বালা বা অ্যালার্জি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
নারকেল তেল ব্যবহার: চুলের আগায় অল্প নারকেল তেল ব্যবহার করলে শুষ্কতা ও চুল ভেঙে যাওয়া কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে মাথার ত্বকে তেল ব্যবহারে অস্বস্তি হলে তা এড়িয়ে চলুন।

পুষ্টিকর খাবার খাওয়া: প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রাখুন। কোনো একটি খাবার একাই চুলের সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
নিয়মিত চুলের যত্ন নেওয়া: চুল পরিষ্কার রাখুন, অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলুন এবং ভেজা চুলে জোরে চিরুনি চালাবেন না। এই অভ্যাসগুলো চুল ভাঙার ঝুঁকি কমাতে পারে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া: নিয়মিত ঘুম, ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ সামলানোর অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। চুল পড়ার সমস্যাতেও এগুলো সহায়ক হতে পারে।
চুলের গোড়া শক্ত করতে কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন?
চুলের যত্নে কিছু সাধারণ ভুল অজান্তেই সমস্যা বাড়াতে পারে। যেমন-
- চুল দ্রুত বড় করার আশায় অতিরিক্ত তেল বা প্রসাধনী ব্যবহার করা।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট খাওয়া।
- চুল পড়া শুরু হলে কারণ না জেনেই একের পর এক পণ্য ব্যবহার করা।
- খুব শক্ত করে চুল বাঁধা এবং নিয়মিত অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগ করা।
- দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় ঘন ঘন চুলের যত্নের পদ্ধতি পরিবর্তন করা।
- চুল পড়ার সমস্যাকে শুধু শ্যাম্পু বা তেলের সমস্যা মনে করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করা।
- দ্রুত ওজন কমানোর জন্য খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বাদ দেওয়া।
বিশেষ করে বায়োটিন, আয়রন ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন ছাড়া গ্রহণ করা ঠিক না। শরীরে এসব উপাদানের ঘাটতি না থাকলে অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট খেলে চুলের বৃদ্ধি বাড়বে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং কিছু উপাদানের অতিরিক্ত মাত্রা আপনার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
চুল পড়া কমতে কত দিন সময় লাগে?
চুলের যত্নে পরিবর্তন আনার পরপরই ফল পাওয়া যায় না। চুলের বৃদ্ধি একটি ধীর প্রক্রিয়া। চুল পড়ার কারণ, বয়স, পুষ্টির অবস্থা এবং মাথার ত্বকের স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে উন্নতি হতে কত সময় লাগবে।

চুল ভেঙে যাওয়ার সমস্যা থাকলে তাপ ও রাসায়নিকের ব্যবহার কমানোর পর ধীরে ধীরে উপকার দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে পুষ্টির ঘাটতি বা অসুস্থতার কারণে চুল পড়লে মূল সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। বংশগত কারণে চুল পাতলা হলে আলাদা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই কয়েক দিন তেল ব্যবহার করে ফল না পেলেই পদ্ধতি বদলে ফেলা উচিত না। আবার দীর্ঘদিন ধরে চুল পড়তে থাকলে শুধু ঘরোয়া যত্নের ওপর নির্ভর করাও ঠিক না।
চুলের গোড়া শক্ত রাখতে সুষম খাবার, মাথার ত্বকের পরিচ্ছন্নতা এবং চুলের প্রতি কোমল আচরণ সবচেয়ে বেশি দরকার। পর্যাপ্ত প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ, অতিরিক্ত তাপ ও রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো, চুল শক্ত করে বাঁধা এড়িয়ে চলা এবং মানসিক চাপ সামলানোর মাধ্যমে চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারেন।
তবে চুল পড়া বেড়ে গেলে শুধু তেল বা শ্যাম্পুর ওপর নির্ভর করবেন না। চুল পড়ার কারণ পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত সমস্যা বা অন্য কোনো অসুস্থতা হলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ধৈর্য্য ধরে চুলের যত্ন নিন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক কারণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলেই চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র
Healthline: How to Strengthen Hair
Our Little Joys: How to Strengthen Hair Roots Naturally
Cleveland Clinic: The Best Vitamins, Supplements and Products for Healthier Hair
Mayo Clinic: Hair Loss, Symptoms and Causes
Innovist: Hair Thinning and Weak Roots
Lilia Healthcare: Why Do the Roots of Hair Become Weak?