ঘুমালে সবাই কি স্বপ্ন দেখে? বিজ্ঞান কী বলছে

আমাদের ঘুমের একটি রঙিন অংশ জুড়ে থাকে স্বপ্ন। স্বপ্নের মাধ্যমে আমরা আমাদের কল্পনাকে চোখের সামনে দেখতে পাই। কিংবা কখনও দুঃস্বপ্ন দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যাই। আমাদের অবচেতন মনের ভাবনাগুলো ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়। স্বপ্ন দেখা কি সবার জন্যই জরুরি বা সবাই কি স্বপ্ন দেখে?
একটু খেয়াল করলে দেখবেন যে, অনেকেই বলেন তারা নাকি ঘুমালে স্বপ্ন দেখেন না। তাহলে কি তাদের পুরো রাতটা একটা ফাঁকা ক্যানভাস ছিল! আসলেই কি তারা স্বপ্ন দেখেন না, নাকি দেখেও ভুলে যান?
বিজ্ঞান কিন্তু বলছে ভিন্ন কথা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় সব মানুষই প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখে। তাহলে কেন আপনার মনে হয় যে আপনি স্বপ্ন দেখছেন না? চলুন এর পেছনের কারণগুলো জেনে নেওয়া যাক-
আমরা কখন স্বপ্ন দেখি?
আমাদের ঘুমের কয়েকটি ধাপ থাকে। স্বপ্ন সাধারণত ঘুমের ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’ (রেম) পর্যায়ে ঘটে থাকে। আমরা যখন গভীর ঘুমের এই রেম পর্যায়ে পৌঁছাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। মূলত এই ধাপেই আমরা সবচেয়ে স্পষ্ট, রঙিন এবং দীর্ঘ স্বপ্নগুলো দেখি। সাধারণত ঘুমাতে যাওয়ার প্রায় ৯০ মিনিট পর প্রথম রেম স্লিপ শুরু হয়। রাতে ঘুম যত গভীর ও দীর্ঘ হয়, রেম স্লিপের সময়ও তত বাড়তে থাকে।
কেন আমরা স্বপ্ন দেখি না?
যারা বলে স্বপ্ন দেখে না, তারা আসলে স্বপ্ন মনে রাখতেই পারে না। তবে কেউ আদৌ স্বপ্ন দেখে না কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। আমাদের অধিকাংশেরই প্রতি রাতে ৪ থেকে ৬টি করে স্বপ্ন দেখা হয়। কিন্তু আমরা তার প্রায় সবই ভুলে যাই। ঘুম থেকে ওঠার ঠিক আগে যে স্বপ্নটি দেখা হয়, সেটিই মনে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের রেম পর্যায়ে আমাদের স্মৃতি তৈরির ক্ষমতা কিছুটা কম থাকে। আর এই রেম পর্যায়েই যেহেতু আমরা স্বপ্ন দেখি, তাই কী দেখলাম তা বেশিরভাগ সময়েই ভুলে যাই। আবার, রেম পর্যায়ে ঘুমের ঘাটতি হলে স্বপ্ন দেখার সুযোগও কমে যেতে পারে।
স্বপ্ন মনে থাকে না কেন?
এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, সবাই যদি স্বপ্ন দেখে থাকে, তবে আমরা অনেকেই তা মনে রাখতে পারি না কেন? মূলত দুটি কারণে এমন হতে পারে-
'রেম স্লিপ'- এর ঘাটতি: শারীরিক বা মানসিক নানা সমস্যার কারণে আপনার রেম স্লিপ কমে যাচ্ছে।
আপনি স্বপ্ন ভুলে যাচ্ছেন: আপনি ঠিকই স্বপ্ন দেখছেন, কিন্তু ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই তা মস্তিষ্ক থেকে মুছে যাচ্ছে। আপনি চেষ্টা করেও স্বপ্ন দেখেছেন কিনা তা মনে করতে পারছেন না।
স্বপ্ন ভুলে যাওয়ার ৫টি প্রধান কারণ
স্বপ্ন শুধু ঘুমের ওপর নির্ভর করে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, মানসিক অবস্থা এবং শারীরিক কিছু অভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে আমরা স্বপ্ন মনে রাখতে পারব কিনা। চলুন জেনে নিই কারণগুলো-
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা
অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা আমাদের ঘুমের মান নষ্ট করে দেয়। মানসিক চাপে থাকলে মস্তিষ্ক অস্থির থাকে, ফলে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এতে গভীর ঘুম বা 'রেম স্লিপ'- এর স্থায়িত্ব কমে যায়। আবার অন্যদিকে, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে অনেক সময়ই মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখে হুট করে জেগে ওঠে এবং ভয়ে থাকে। এটি মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে বাকি রাতের ভালো স্বপ্নগুলো আর মনে রাখতে পারে না।
ঘুমের অভাব বা অনিয়মিত ঘুম
আপনি যদি প্রতিদিন রাতে পর্যাপ্ত না ঘুমান, তবে আপনার শরীর প্রয়োজনীয় রেম স্লিপ পাবে না। রাত জেগে কাজ করা, দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া বা একেক দিন একেক সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে ঘুমের মান খারাপ হয়ে যায়। এতে স্বপ্নের অভিজ্ঞতা অনেকটাই কমে যায়।
শারীরিক সমস্যা ও ঘুমের ব্যাধি
স্লিপ অ্যাপনিয়া: ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া বা নাক ডাকার সমস্যা থাকলে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এতে ঘুম গভীর হয় না এবং স্বপ্ন মনে থাকে না।
ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা: বিষণ্ণতা ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে বাধাগ্রস্ত করে।
হরমোনের তারতম্য: থাইরয়েড বা অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যার কারণেও ঘুমের গুণগত মান কমে যেতে পারে।
জীবনযাত্রার কিছু বাজে অভ্যাস
অনেকেই ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল নেন। ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পান করলে তা দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু শেষের দিকে রেম স্লিপকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। আবার অনেকেরই রাত করে চা-কফি পানের অভ্যাস রয়েছে। রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ বা ধূমপানের অভ্যাস মস্তিষ্ককে উত্তেজিত রাখে, ফলে গভীর ঘুম হতে চায় না। স্বপ্ন দেখলেও তা আর মনে থাকে না।
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
আপনি যদি কোনো ধরনের অ্যান্টি-ডিপ্রেশন, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বা অ্যালার্জির ওষুধ নিয়মিত খেয়ে থাকেন, তবে এগুলো আপনার রেম স্লিপের সময় কমিয়ে দিতে পারে। ফলে স্বপ্ন দেখার সম্ভাবনা বা তা মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়।
স্বপ্ন মনে রাখার কিছু উপায়
অনেকেই রাতে দেখা স্বপ্নগুলো মনে রাখতে চান। এক্ষেত্রে আপনার জীবনযাপনের কিছু ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।
ঘুমের একটি নির্দিষ্ট রুটিন মানুন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন। এতে মস্তিষ্কের ভেতরের বায়োলজিক্যাল ক্লক বা 'স্লিপ সাইকেল' ঠিক থাকে।
শোবার ঘর নিরিবিলি ও অন্ধকার রাখুন: ঘুমানোর পরিবেশ আরামদায়ক হওয়া খুব জরুরি। ঘরের আলো কমিয়ে দিন এবং তাপমাত্রা সহনীয় রাখুন। বাইরের শব্দ যেন ঘরে না আসে সেদিকে নজর রাখুন।
ঘুমানোর আগে স্ক্রিন বন্ধ করুন: ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন বন্ধ করে দিন। স্ক্রিনের নীল আলো ঘুমের হরমোন 'মেলাটোনিন' তৈরিতে বাধা দেয়।
‘ড্রিম জার্নাল’ বা স্বপ্ন লেখার ডায়েরি রাখুন: আপনার বালিশের পাশে একটি ডায়েরি ও কলম রেখে দিন। সকালে চোখ মেলেই প্রথম কাজ হবে যা কিছু আবছা মনে পড়ে, তা সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেলা। দু-এক দিন চেষ্টা করলেই দেখবেন আস্তে আস্তে পুরো স্বপ্ন মনে পড়ছে।
ঘুম ভেঙে হুট করে উঠবেন না: সকালে অ্যালার্ম বাজার পর বা ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে স্থির হয়ে শুয়ে থাকুন। মনে করার চেষ্টা করুন শেষ কী দেখছিলেন। হুট করে ধড়ফড় করে উঠে বসলে স্বপ্নের স্মৃতি হাওয়া হয়ে যায়।
নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাবার: দিনে হালকা ব্যায়াম এবং রাতে হালকা খাবার খাওয়া ঘুমের জন্য খুব ভালো।
স্বপ্ন না দেখা কি কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ?
স্বপ্ন না দেখা বা মনে করতে না পারা আসলে কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ নয়। আপনি স্বপ্ন দেখেন বা না দেখেন, আপনার ঘুম যদি ভালো হয়, তবে চিন্তার কিছু নেই। ভালো ঘুম হওয়া সুস্থতার প্রধান শর্ত।
যদি আপনার পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম না হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ঘুমের অভাব স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি আপনার ক্লান্ত লাগে, সারাদিন প্রচণ্ড ঝিমুনি বা মাথা ব্যথা থাকে, রাতে খুব বেশি নাক ডাকেন বা দম আটকে ঘুম ভেঙে যায়- তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।
সূত্র: হেলথলাইন
