logo

ধূমপান কেন এত আসক্তিকর, এটি ছাড়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কি

ধূমপান কেন এত আসক্তিকর, এটি ছাড়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কি

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এ কথা এখন প্রায় সবাই জানে। স্কুল, টেলিভিশন, রেডিও, চিকিৎসকদের পরামর্শ কিংবা সিগারেটের প্যাকেটে থাকা ভয়াবহ সতর্কবার্তা—সব জায়গাতেই এ বার্তা দেওয়া হয়। তবু বাস্তবতা হলো, সিগারেট এখনও পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী আসক্তির উৎস।

ধূমপান শুধু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির ঝুঁকিই নয়, একটি সিগারেটের টান শরীরে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। আর এই দ্রুত প্রভাবই মানুষকে বারবার সিগারেটের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জীবনে একবার সিগারেট খাওয়ার চেষ্টা করেন তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়মিত ধূমপায়ীতে পরিণত হন। আবার যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করা মানুষের পাঁচজনের একজনেরও কম সফল হন। কেউ কেউ ধূমপান ছাড়তে গড়ে ছয়বার চেষ্টা করেন, আবার কারও ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা শতাধিক পর্যন্ত পৌঁছায়।

সিগারেটের প্রথম টানে যা ঘটে
একটি সিগারেট টানার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরে নিকোটিন, বিভিন্ন উত্তেজক রাসায়নিক এবং ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ ফুসফুসে প্রবেশ করে। এতে শ্বাসনালীর ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র চুলের মতো গঠন যাকে ‘সিলিয়া’ বলা হয়—তার কার্যকারিতা কমে যায়।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক লায়ন শাহাব বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিকোটিন ফুসফুসের মাধ্যমে রক্তে মিশে যায় এবং সেখান থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এ প্রক্রিয়া এত দ্রুত ঘটে যে প্রথম টান দেওয়ার মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের মধ্যেই মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামের রাসায়নিক নিঃসরণ শুরু হয়। এর ফলে ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত ‘ভালো লাগা’ বা ‘আনন্দের অনুভূতি’ তৈরি হয়।

নিকোটিন শরীরের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিকে সক্রিয় করে। ফলে রক্তে অ্যাড্রেনালিন ও নরঅ্যাড্রেনালিন নিঃসরণ বাড়ে, যা শরীরের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এতে স্বল্প সময়ের জন্য উত্তেজনা বা শক্তি অনুভূত হয়। প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে রক্তে নিকোটিনের মাত্রা সর্বোচ্চে পৌঁছে যায়। এরপর তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। আর তখনই শুরু হয় আরেক সমস্যা—নিকোটিনের ঘাটতি।

নিকোটিনের ‘হাফ লাইফ’ বা শরীর থেকে অর্ধেক বের হতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। ফলে ধূমপায়ীরা খুব দ্রুতই প্রত্যাহারজনিত লক্ষণ অনুভব করতে শুরু করেন। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধূমপানের ফলে মস্তিষ্কের ডোপামিন রিসেপ্টর (গ্রহণ কোষ) কম সংবেদনশীল হয়ে যায়। ফলে ধূমপায়ীরা সেই আগের আনন্দের অনুভূতি আর পান না।

অধ্যাপক শাহাব বলেন, অনেকেই মনে করেন সিগারেট খেলে তারা ভালো বোধ করেন। কিন্তু আসলে ধূমপান কেবল শরীরকে সেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে—যেখানে একজন মানুষ থাকতেন যদি তিনি কখনো ধূমপান শুরুই না করতেন।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
ধূমপানের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যে। কারণ, সিগারেট না থাকলে ধূমপায়ীরা প্রায় সবসময়ই নিকোটিনের ঘাটতিজনিত অবস্থায় থাকেন। ধূমপান, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার সম্পর্ক জটিল। কারণ, যারা মানসিক সমস্যায় ভোগেন তারা ধূমপান শুরু করার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। তবে গবেষণা বলছে, ধূমপান ছেড়ে দিলে তুলনামূলক অল্প সময়ের মধ্যেই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি দেখা যেতে পারে।

এ ছাড়া ধূমপানের অন্যান্য ক্ষতিত মধ্যে রয়েছে—প্রজনন স্বাস্থ্যের অবনতি, দাঁত ও মুখের বিভিন্ন সমস্যা, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি, টাইপ–২ ডায়াবেটিস ও নিউমোনিয়ার সম্ভাবনা, হাড় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া, দ্রুত বার্ধক্য ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস।

সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা ‘কার্বন মনোক্সাইড’ রক্তের লাল কণিকার সঙ্গে অক্সিজেনের চেয়ে বেশি সহজে যুক্ত হয়। ফলে শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে অক্সিজেন কম পৌঁছায়। স্বল্পমেয়াদে এতে শ্বাসকষ্ট হতে পারে, আর দীর্ঘমেয়াদে এটি হার্টের ওপর চাপ বাড়ায়। এ ছাড়া রক্তনালিগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং ধমনীর ভেতরে চর্বিযুক্ত স্তর জমতে শুরু করে।

অধ্যাপক শাহাবের মতে, ধূমপান অনেকটা ‘রাশিয়ান রুলেট’ খেলার মতো। কেউ হয়তো ৫০ বছর ধূমপান করে পরে অসুস্থ হন, আবার কারও ক্ষেত্রে খুব অল্প সময়েই মারাত্মক ক্ষতি শুরু হতে পারে।

গবেষণা বলছে, গড়ে একজন ধূমপায়ী একজন অধূমপায়ীর তুলনায় প্রায় ১০ বছর আগে মারা যান। বার্ধক্যজনিত রোগও তাদের ক্ষেত্রে আগে দেখা দেয়।

তবে ভালো খবর হলো, ধূমপান ছাড়লে শরীরের অনেক ক্ষতিই ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়। কিছু পরিবর্তন খুব দ্রুতই দেখা যায়—যেমন ত্বকের উন্নতি বা শ্বাসপ্রশ্বাসে স্বস্তি। কিন্তু ধূমপান ছাড়া সহজ নয়।

২০২৩ সালের একটি কোকরেন গবেষণা পর্যালোচন বলছে—কোনো সহায়তা ছাড়া ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করলে প্রতি ১০০ জনে মাত্র ৬ জন সফল হন। নিকোটিন প্যাচ ব্যবহার করলে সফলতার হার বেড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হয়। অন্য সহায়তার সঙ্গে ব্যবহার করলে তা ১২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে বিবেচিত হয়েছে ই-সিগারেট বা ভেপ। আর প্রেসক্রিপশন ওষুধের মধ্যে আছে ভেরেনিক্লিন এবং সাইটিসিন। এ ওষুধগুলো মস্তিষ্কের সেই কোষগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় যেগুলোর সঙ্গে নিকোটিন যুক্ত হয়। ফলে প্রত্যাহারজনিত লক্ষণ কমে যায়। একই সঙ্গে সিগারেট খেলে আগের মতো আনন্দও অনুভূত হয় না। কারণ, কোষগুলো ইতোমধ্যেই ওষুধের মাধ্যমে দখল হয়ে থাকে।

তবুও গবেষণা বলছে, এসব ব্যবহারের পরও সফল হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১৪ শতাংশ।

অধ্যাপক শাহাব বলেন, ধূমপান অত্যন্ত শক্তিশালী আসক্তি—কিছু ক্ষেত্রে এটি হেরোইন বা কোকেনের চেয়েও বেশি। তাই ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। 

তার ভাষায়, ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা বন্ধ করবেন না। ব্যর্থ হতে পারেন আবার চেষ্টা করুন। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধূমপান ছেড়ে দিতে পারা মানুষকেই সবাই সম্মান করে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান