৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে হতে পারে বিপদ, বলছে গবেষণা

বর্তমান কর্মজীবনে আট ঘণ্টা কাজ যেন অনেকের জন্য শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে অফিসের কাজ প্রায়ই গড়িয়ে যায় রাত পর্যন্ত, কখনো আবার ছুটির দিনেও করতে হয় কাজ। অনেকেই মনে করেন বেশি সময় কাজ মানেই বেশি সাফল্য। তবে এই অতিরিক্ত কাজই কি ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে কি না এবার ভাবতে বসুন!
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দীর্ঘ সময় কাজ শুধু ক্লান্তিই বাড়ায় না বরং হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে। এমনকি এর সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্কও আছে।
গবেষণায় কী বলছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালে বিশ্বে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে।
যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন, তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি, যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন তাদের তুলনায়।
জাপানে অতিরিক্ত কাজ করতে করতে মৃত্যুকে বলা হয় ‘কারোশ’। দেশটিতে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনাও সরকারি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
দীর্ঘ সময় কাজের প্রভাব
দীর্ঘ সময় কাজ শরীর ও মনের ওপর দুইভাবে প্রভাব ফেলে। প্রথমত, অতিরিক্ত কাজের চাপ সরাসরি মানসিক ও শারীরিক সমস্যা তৈরি করে। এতে অবসাদ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রায় নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। যেমন - কম ঘুম, অনিয়মিত খাবার খাওয়া, ব্যায়ামের অভাব ও ধূমপান বা অ্যালকোহলের প্রতি ঝোঁক। এসব মিলিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
অনেক কর্মীর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে মানসিক চাপ বেড়ে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং শরীর ভেঙে পড়ে।
বর্তমানে, বিশেষ করে মহামারির পর ঘরে বসে কাজের কারণে কাজের সময় আরও বেড়েছে। অনেকেই কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমা আলাদা করতে পারছেন না।
গিগ ইকোনমি ও বাড়তি চাপ
বর্তমানে ফ্রিল্যান্স বা গিগ ইকোনমিতে কাজ করা অনেক মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কাজ করা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। ভিন্ন টাইম জোনে কাজ করা, কম সময়ে কাজ শেষ করার চাপ এবং ভালো রেটিং পাওয়ার প্রতিযোগিতা আমাদেরকে আরও বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করছে। ফলে দেখা দিচ্ছে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
ক্লান্তিকে গর্ব ভাবছেন? এটি ঝুঁকিপূর্ণ
অনেকেই মনে করেন, দিন-রাত কাজ করাই সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, এই ধারণা বিপজ্জনক। অতিরিক্ত সময় কাজ করলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, কাজে ভুলের পরিমাণ বাড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
এমনকি টানা দীর্ঘ সময় জেগে কাজ করলে শরীরের কার্যক্ষমতা অনেকটা মাতাল অবস্থার মতো হয়ে যেতে পারে।
কাজের বাইরেও কাজের চাপ
এখন অফিস শেষে কাজ শেষ হয়েও যেন শেষ হয় না। ফোন, মেসেজ বা ইমেইলের মাধ্যমে সবসময় কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতিই হয়। এই যে সবসময় প্রস্তুত থাকার মানসিকতা, এটি শরীরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে এবং শরীর ও মনের বিশ্রামের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
সমাধান?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় টানা কাজ করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা, নিয়মিত বিরতি নেয়া, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমা তৈরি করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান বিভিন্ন গবেষণা।
এছাড়া কিছু দেশে সপ্তাহে চার দিন কাজের ধারণা চালু হয়েছে, যা কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত কাজ সাময়িকভাবে সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা শরীর ও মনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কাজের চাপ যতই থাকুক, নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র : বিবিসি বাংলা