সিঙাড়া কি সত্যিই বাংলার খাবার, যে ইতিহাস অনেকেরই অজানা

বিকেলের চায়ের সঙ্গে গরম গরম সিঙাড়া। বাইরে মচমচে, ভেতরে আলুর মজার পুর। সঙ্গে এক কাপ চা, কাঁচা পেয়াজ বা মরিচ। বাঙালির আড্ডায় এর চেয়ে পরিচিত দৃশ্য খুব বেশি নেই।
ঢাকার অলিগলি থেকে কলকাতার রাস্তা, বাড়ির অতিথি আপ্যায়ন থেকে অফিসের টিফিন, সিঙাড়া যেন আমাদের খাবারের সংস্কৃতিরই একটি অংশ। কিন্তু এই চেনা খাবারটি কি সত্যিই বাংলার নিজস্ব আবিষ্কার?
সিঙাড়ার ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে সামনে আসে একদিকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে মজার এক লোককথা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া পেরিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসা একটি বহু পুরোনো খাবারের ইতিহাস।
অর্থাৎ সিঙাড়ার গল্প শুধু একটি খাবারের গল্প নয়। এর মধ্যে মিশে আছে বাণিজ্যপথ, রাজদরবার, অভিবাসন, রান্নার পরিবর্তন আর স্থানীয় সংস্কৃতির নিজস্ব ছাপ।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও ঠান্ডা লুচির গল্প
বাংলায় সিঙাড়ার জন্ম নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পগুলোর একটি জড়িয়ে আছে নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে।
প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, একদিন সকালে রাজাকে পরিবেশন করা হয়েছিল ঠান্ডা লুচি। খাবারে সন্তুষ্ট না হয়ে রাজা নাকি ভীষণ রেগে যান এবং হালুইকরকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তখন হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহরা স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে রাজদরবারে হাজির হন। তিনি রাজাকে এমন একটি খাবার তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যা অনেকক্ষণ গরম থাকবে।
রাজা সেই প্রস্তাবে রাজিও হন।
এরপর ধরিত্রী দেবী রান্নাঘরে গিয়ে ছোট ছোট লুচির মতো ময়দার খোল তৈরি করেন। তার মধ্যে তরকারির পুর ভরে সেটিকে ত্রিভুজাকারে মুড়ে ঘিয়ে ভেজে নেন। তৈরি হয় নতুন এক খাবার।
খাবারটি এতটাই গরম ছিল যে রাজাকে সাবধানে খেতে বলা হয়। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, রাজা খাবারটি খেয়ে খুশি হয়ে ধরিত্রী দেবীকে পুরস্কার দেন।
এই লোককথার আরেকটি অংশে বলা হয়, নতুন খাবারটির নাম দেওয়া হয়েছিল সমভুজা। তিনটি সমান বাহু বা ভুজের সঙ্গে এর ত্রিভুজাকার আকৃতির সম্পর্ক থেকেই নাকি এই নাম। পরে সময়ের সঙ্গে সমভুজা বদলে সিঙাড়া হয়েছে বলে একটি মত প্রচলিত আছে।
গল্পটি শুনতে যতই সুন্দর হোক, এটিকে সিঙাড়ার নিশ্চিত ঐতিহাসিক জন্মকাহিনি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইতিহাস বলছে অন্য কথা।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত এই গল্পটি বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি আকর্ষণীয় অংশ হতে পারে। কিন্তু সিঙাড়ার পূর্বসূরি খাবারের ইতিহাস তারও অনেক পুরোনো।
ভারতীয় উপমহাদেশে আসার আগে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ত্রিভুজাকৃতি পুরভরা পেস্ট্রির প্রচলন ছিল। মধ্যযুগীয় আরবি রান্নার বইগুলোতে সানবুসাক, সানবুসাক বা সানবুসাজ ধরনের নাম পাওয়া যায়। এসব নামের সঙ্গে ফারসি শব্দের সম্পর্ক রয়েছে।
খাবারটি বাণিজ্যপথ ও মানুষের চলাচলের সঙ্গে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশেও এটি আসে মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে।
তাই সিঙাড়াকে একদিন বসে আবিষ্কার করেছিলেন, এমন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
দিল্লির রাজদরবারেও ছিল সমোসা
সিঙাড়া বা সমোসার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় দিল্লি সালতানাতের সময়কার লেখায়।
চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবন বতুতার লেখায় দিল্লির রাজদরবারে পরিবেশিত একটি খাবারের বর্ণনা পাওয়া যায়, যা বর্তমান সমোসার পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিত। এতে মাংস, বাদাম ও নানা উপাদান দিয়ে পুর তৈরি করা হতো।
এর আগে কবি ও পণ্ডিত আমির খসরুর লেখাতেও রাজদরবারে পরিবেশিত সমোসার উল্লেখ পাওয়া যায় বলে খাদ্য ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে। সেই সময়ের খাবারটি আজকের আলু ভরা সিঙাড়ার মতো ছিল না। বরং মাংস, ঘি, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন বাদামজাতীয় উপাদান দিয়ে তৈরি পুরের ব্যবহার ছিল বেশি।
অর্থাৎ আজ আমরা যে আলুর সিঙাড়া চিনি, সেটিই এই খাবারের আদি রূপ ছিল না।
তাহলে সিঙাড়ায় আলু কোথা থেকে এল?
আজকের বাঙালি সিঙাড়ার সবচেয়ে পরিচিত উপাদান আলু। কিন্তু মজার কথা হলো, আলু তো ভারতীয় উপমহাদেশের আদি ফসল নয়।
আমেরিকা মহাদেশ থেকে আলু ইউরোপে আসে এবং পরে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলায় আলুর জনপ্রিয়তা বাড়তে সময় লাগে। ফলে মধ্যযুগের সমোসা বা সিঙাড়ায় আজকের মতো আলুর পুর থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
ভারতীয় এক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে আলু ভারতীয় উপমহাদেশে আসার পর ধীরে ধীরে খাবারে এর ব্যবহার বাড়ে। পরে স্থানীয় রান্নার সঙ্গে আলু মিশে যায় এবং সিঙাড়ার পুরেও এর জায়গা হয়।
এই পরিবর্তনই খাবারের ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি।
একটি খাবার যখন নতুন দেশে যায়, তখন সেটি আগের মতো থাকে না। স্থানীয় মানুষের পছন্দ, সহজলভ্য উপকরণ ও রান্নার পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে তার চেহারা ও স্বাদ বদলে যায়।
মাংস থেকে আলু, যেভাবে বদলে গেল সিঙাড়া
প্রথম দিকের সমোসায় মাংসের ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে এসে খাবারটি নানা রূপ নিতে শুরু করে।
কোথাও মাংসের পুর রয়ে গেল, কোথাও সবজি এল, কোথাও ডাল বা বাদাম ব্যবহার হলো। আবার বাংলায় এসে আলু হয়ে উঠল সবচেয়ে জনপ্রিয় পুর।

খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলার সিঙাড়া তার নিজস্ব স্থানীয় পরিচয় তৈরি করেছে। কলকাতার খাদ্য ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে খাদ্য ইতিহাসবিদ পৃথা সেনও বলেছেন, খাবারটি মধ্য এশিয়ার পথ ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে এবং পরে স্থানীয় উপকরণ ও রান্নার সংস্কৃতির সঙ্গে বদলে যায়।
এ কারণে বাংলার সিঙাড়াকে শুধু বাইরের কোনো খাবারের অনুকরণ হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার অনেকটাই বাদ পড়ে যায়।
সিঙাড়া নামটি এল কোথা থেকে?
সিঙাড়া নামটির উৎপত্তি নিয়েও একাধিক মত রয়েছে।
একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, এর ত্রিভুজাকার আকৃতি জলফলের মতো দেখতে হওয়ায় পূর্বভারতে ব্যবহৃত সিঙাড়া বা সিংহারার নামের সঙ্গে খাবারটির নামের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে সমোসা বা সমুচা নামটি ফারসি শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগে খাবারটি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর নামও বদলেছে।
ফলে বাংলা সিঙাড়া এবং ভারতের অন্য অঞ্চলের সমোসা দেখতে কাছাকাছি হলেও নামের ইতিহাসে রয়েছে আলাদা আঞ্চলিক পথচলা।
একই খাবার, কিন্তু নাম আলাদা
ভারতীয় উপমহাদেশে এই খাবারের নাম এক জায়গায় এক রকম নয়।
বাংলায় এটি সিঙাড়া। হিন্দি ও উর্দু ভাষাভাষী অঞ্চলে বেশি পরিচিত সমোসা নামে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে এর আত্মীয় খাবার সানবুসাক বা কাছাকাছি নামেও পরিচিত।
অর্থাৎ একই ধরনের পুরভরা ময়দার খাবার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে গিয়ে নিজের স্থানীয় পরিচয় পেয়েছে।

এই কারণেই খাবারের ইতিহাসে সিঙাড়াকে একটি ভ্রমণকারী খাবার হিসেবে দেখা যায়। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে যেতে তার নাম, পুর, আকৃতি এবং রান্নার পদ্ধতি বদলেছে।
বাংলার সিঙাড়া কেন এত আলাদা?
বাংলার সিঙাড়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর পুর।
আলু, ফুলকপি, মটরশুঁটি, চিনাবাদাম, কাঁচা মরিচ, আদা এবং নানা মশলার মিশ্রণ বাংলার সিঙাড়াকে আলাদা স্বাদ দিয়েছে। শীতকালে ফুলকপির সিঙাড়া যেমন জনপ্রিয়, তেমনই অনেক জায়গায় মাছ, মাংস বা অন্য উপকরণ দিয়েও সিঙাড়া তৈরি হয়।
আবার আকারেও পার্থক্য আছে। কোথাও সিঙাড়া ছোট, কোথাও বড়। কোথাও খোল খুব পাতলা ও মচমচে, আবার কোথাও তুলনামূলক মোটা।
এই বৈচিত্র্যই দেখায়, খাবারটি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে কতটা মিশে গেছে।
ঢাকার সিঙাড়া আর কলকাতার সিঙাড়া কি এক?
বাংলা ভাগ হওয়ার পর কলকাতা ও ঢাকার খাবারের সংস্কৃতিতেও কিছু পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তবে সিঙাড়ার মতো জনপ্রিয় নাশতা দুই বাংলাতেই টিকে আছে।
খাদ্য ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, দেশভাগের পর কলকাতা ও ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যে আলাদা আলাদা বিকাশ ঘটলেও ইন্দো-পারস্য প্রভাবিত খাবারের দীর্ঘ ইতিহাস দুই অঞ্চলের খাদ্য ঐতিহ্যেই রয়েছে।
বাংলাদেশে সিঙাড়া সাধারণত চায়ের দোকান, অফিসের নাশতা এবং বিকেলের আড্ডার সঙ্গে যুক্ত। কোথাও এটি আলুর পুরে তৈরি, কোথাও মাংস বা অন্যান্য উপকরণও ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে সিঙাড়া বিশেষ করে দুর্গাপূজা, শীতকাল ও অতিথি আপ্যায়নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের গল্প তাহলে কি মিথ্যা?
এখানে ইতিহাস ও লোককথার পার্থক্যটা মনে রাখা জরুরি।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও ধরিত্রী দেবীকে ঘিরে শিঙাড়ার জন্মের গল্পটি বাংলায় প্রচলিত একটি আকর্ষণীয় লোককাহিনি। কিন্তু ইতিহাসের নথি দিয়ে এই ঘটনাকে সিঙাড়ার প্রকৃত আবিষ্কার হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না।
কারণ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ের বহু আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে সমোসার পূর্বসূরি খাবারের উপস্থিতির লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। ইবন বতুতার চতুর্দশ শতকের বিবরণ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তাই কৃষ্ণচন্দ্রের গল্পকে বাংলায় সিঙাড়ার জনপ্রিয়তা বা স্থানীয় রূপের সঙ্গে যুক্ত একটি লোককথা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
সিঙাড়া শুধু একটি নাশতা নয়
একটি খাবারের ইতিহাসে শুধু কে প্রথম বানিয়েছিল, সেই প্রশ্নই সব নয়।
সিঙাড়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে একটি খাবার হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে নতুন নতুন সমাজে জায়গা করে নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার পুরভরা পেস্ট্রি থেকে ভারতীয় রাজদরবার, সেখান থেকে আঞ্চলিক রান্নাঘর, তারপর বাংলার চায়ের দোকান, এই যাত্রা একেবারেই ছোট নয়।
প্রতিটি জায়গা খাবারটির মধ্যে নিজের স্বাদ যোগ করেছে।
কোথাও মাংস, কোথাও বাদাম, কোথাও সবজি, আর বাংলায় এসে আলু ও মশলার সঙ্গে তৈরি হয়েছে আমাদের চেনা সিঙাড়া।
গরম সিঙাড়ায় কামড় বসানোর সময় আমরা সাধারণত তার ইতিহাস নিয়ে ভাবি না। চোখের সামনে থাকে শুধু মচমচে খোল আর মশলাদার পুর।
কিন্তু এই সাধারণ নাশতার পেছনে লুকিয়ে আছে কয়েক শতকের দীর্ঘ যাত্রা।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে ধরিত্রী দেবীর গল্প বাংলার লোককথায় সিঙাড়ার একটি মজার জন্মকাহিনি হয়ে আছে। তবে ইতিহাস বলছে, সিঙাড়া বা সমোসার পূর্বসূরি খাবার ভারতীয় উপমহাদেশে তার বহু আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের পথ ধরে খাবারটি ভারতীয় রান্নায় জায়গা করে নেয়।
তারপর স্থানীয় উপকরণ ও রুচির সঙ্গে বদলাতে বদলাতে তৈরি হয়েছে বাংলার নিজস্ব সিঙাড়া।
তাই সিঙাড়ার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এর জন্মস্থান নয়। বরং বহু সংস্কৃতির পথ পেরিয়ে বাংলায় এসে নিজের একটি ঘর তৈরি করে নেওয়াই এর আসল গল্প।
তথ্যসূত্র
টিভি ৯
আনন্দবাজার
গ্লোবাল ফুড হিস্টরি
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া
