Advertisement

কুকুর কি মানুষের আবেগ বুঝতে পারে, গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ তথ্য

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
কুকুর কি মানুষের আবেগ বুঝতে পারে, গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ তথ্য
কুকুর মানুষের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মুখের অভিব্যক্তি আলাদা করতে পারে।

কুকুরের সঙ্গে যারা থাকেন, তারা প্রায়ই একটি বিষয় লক্ষ্য করেন। মন খারাপ থাকলে কুকুরটি কাছে এসে বসে থাকে, রাগ করলে একটু দূরে সরে যায়, আবার হাসিখুশি থাকলে লেজ নেড়ে আনন্দ প্রকাশ করে। এত দিন ধরে এসব আচরণ দেখে মনে করা হতো, কুকুর হয়তো মানুষের কণ্ঠস্বর, শরীরের ভঙ্গি, গন্ধ কিংবা আচরণ দেখে মনের অবস্থা বুঝতে পারে।

Advertisement

নতুন এক গবেষণা বলছে, এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত হতে পারে। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি দেখেও কুকুর বুঝতে পারে আমরা খুশি, ভয় পেয়েছি, দুঃখিত নাকি রেগে আছি।

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কুকুরের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরীক্ষা করে এমন প্রমাণ পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মুখের বিভিন্ন আবেগপূর্ণ অভিব্যক্তি দেখানোর সময় কুকুরের মস্তিষ্কে আলাদা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশেষ করে খুশির মুখ কুকুরের মস্তিষ্কে এমন কিছু অঞ্চলে কার্যকলাপ বাড়িয়েছে, যেগুলো সামাজিক তথ্য ও পুরস্কার বা আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত।


গবেষণায় কীভাবে পরীক্ষা করা হলো

গবেষণার জন্য ১২টি পোষা কুকুরকে এফএমআরআই (fMRI) বা ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। কুকুরগুলোকে মানুষের বিভিন্ন মুখের ছবি দেখানো হয়েছিল। ছবিগুলোতে মানুষের খুশি, রাগ, ভয় ও দুঃখের অভিব্যক্তি ছিল।

গবেষকেরা দেখতে চেয়েছিলেন, ভিন্ন আবেগের মুখ দেখলে কুকুরের মস্তিষ্ক একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় কি না।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, কুকুরগুলোকে শুধু মানুষের মুখের ছবি দেখানো হয়েছিল। অর্থাৎ সেখানে মানুষের কণ্ঠস্বর, শরীরের ভঙ্গি বা গন্ধের মতো অন্য কোনো সংকেত ছিল না। ফলে কুকুরের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, শুধু মুখের অভিব্যক্তি দেখেও তারা আবেগের পার্থক্য ধরতে পারে কি না।

খুশির মুখ সবচেয়ে সহজে বুঝতে পারে কুকুর

গবেষণায় খুশির মুখের প্রতি কুকুরের মস্তিষ্কে বিশেষ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মস্তিষ্কের টেম্পোরাল কর্টেক্স ও কডেট নিউক্লিয়াসের মতো অঞ্চলে কার্যকলাপ বাড়ে। এসব অঞ্চল উচ্চতর জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া এবং পুরস্কার বা আনন্দের সঙ্গে যুক্ত।

অর্থাৎ মানুষের হাসি বা খুশির অভিব্যক্তি কুকুরের কাছে শুধু একটি সাধারণ মুখের পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে ইতিবাচক সামাজিক অর্থও যুক্ত হতে পারে।

গবেষকেরা মনে করছেন, মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের ফলে কুকুর মানুষের মুখের অভিব্যক্তি বোঝার বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছে।

শুধু খুশি আর অখুশি নয়

আগের অনেক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কুকুর ইতিবাচক ও নেতিবাচক মানুষের মুখের অভিব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। তবে নতুন গবেষণাটি আরও এক ধাপ এগিয়েছে।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, কুকুর শুধু খুশি ও অখুশি মুখের মধ্যে পার্থক্য করে না। ভয়, দুঃখ এবং রাগের মতো নেতিবাচক আবেগের মধ্যেও কিছু পার্থক্য ধরতে পারে।

বিশেষ করে ভয় পাওয়া মুখের সঙ্গে রাগ বা দুঃখের মুখের পার্থক্য কুকুরের মস্তিষ্কের কার্যকলাপে ধরা পড়েছে। তবে রাগ ও দুঃখের মুখের মধ্যে পার্থক্য করা তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে কঠিন ছিল।

এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ফলাফল। কারণ এর আগে মানুষের আবেগের মধ্যে একই ধরনের নেতিবাচক আবেগের পার্থক্য কুকুরের মস্তিষ্কে এভাবে দেখা যায়নি বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

তাহলে কি কুকুর মানুষের মতো আবেগ বোঝে?

এখানেই একটু সতর্ক হওয়া দরকার।

গবেষণাটি প্রমাণ করে না যে কুকুর মানুষের মতো করে দুঃখ, ভয় বা রাগের অর্থ বোঝে। অর্থাৎ একজন মানুষ কেন দুঃখিত বা কেন রেগে আছেন, সেই কারণ কুকুর বুঝতে পারে কি না, তা এই গবেষণা থেকে বলা যায় না।

গবেষণাটি বরং দেখিয়েছে, মানুষের মুখের বিভিন্ন আবেগপূর্ণ অভিব্যক্তি কুকুরের মস্তিষ্কে আলাদা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সেই প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে কুকুর এসব অভিব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

তাই কুকুর মানুষের মনের কথা পুরোপুরি বুঝতে পারে, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তবে মানুষের আবেগের সূক্ষ্ম সংকেত ধরার ক্ষমতা তাদের আছে, এমন প্রমাণ আরও শক্তিশালী হলো।

কুকুর কেন মানুষের মুখের দিকে এতটা নজর দেয়

এর পেছনে মানুষের সঙ্গে কুকুরের দীর্ঘ সম্পর্ক একটি বড় কারণ হতে পারে।

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ও কুকুর পাশাপাশি বসবাস করেছে। এই দীর্ঘ সহাবস্থানের সময়ে কুকুর মানুষের আচরণ, কণ্ঠস্বর, শরীরের ভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তির বিভিন্ন সংকেত বুঝতে শিখেছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি কুকুরের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। একজন মানুষ খুশি না রাগান্বিত, ভয় পেয়েছেন কি না, কুকুরের জন্য তা জানা দরকার হতে পারে। কারণ মানুষের আচরণের ওপরই অনেক সময় তাদের খাবার, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্পর্ক নির্ভর করে।

গবেষণার প্রধান গবেষক লরা কুয়ায়া মনে করেন, মানুষের সঙ্গে কুকুরের দীর্ঘ সহবিবর্তন বা co-evolution তাদের এই সামাজিক দক্ষতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

কুকুরের আচরণে এর প্রভাব কী

আমরা যখন কুকুরের দিকে তাকিয়ে হাসি, তখন অনেক সময় সেটি কাছে আসে, লেজ নাড়ায় বা খেলতে চায়। আবার কেউ রেগে গেলে কুকুর পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারে।

এসব আচরণের পেছনে শুধু কণ্ঠস্বর বা শরীরের ভঙ্গি নয়, মুখের অভিব্যক্তিও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বাস্তব জীবনে কুকুর মানুষের আবেগ বোঝার সময় একসঙ্গে অনেক ধরনের সংকেত ব্যবহার করে। মুখের অভিব্যক্তির পাশাপাশি কণ্ঠস্বর, শরীরের ভঙ্গি, আচরণ এবং সম্ভবত গন্ধও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নতুন গবেষণায় যেহেতু মূলত মুখের ছবি দেখানো হয়েছিল, তাই বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে কুকুর কীভাবে এসব সংকেত একসঙ্গে ব্যবহার করে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে

গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ফলাফলকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হলো, গবেষণায় কুকুরের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২টি। তাদের বেশির ভাগই ছিল পোষা কুকুর এবং তাদের জীবনযাপন ছিল মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ।

তাই সব জাতের কুকুর বা মানুষের সঙ্গে কম যোগাযোগ থাকা কুকুরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

এ ছাড়া গবেষণায় কুকুরকে স্থির ছবি দেখানো হয়েছিল। বাস্তবে একজন মানুষ হাসছেন, কাঁদছেন বা রেগে যাচ্ছেন, তখন তাঁর মুখের পরিবর্তনের সঙ্গে কণ্ঠস্বর ও শরীরের নড়াচড়াও থাকে। সেই পরিস্থিতিতে কুকুরের মস্তিষ্ক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

মানুষের সঙ্গে কুকুরের সম্পর্কের নতুন দিক

কুকুরকে মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রাণীসঙ্গীদের একটি বলা হয়। তাদের মানুষের আচরণ বুঝতে পারার ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।

আগের গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর মানুষের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মুখের অভিব্যক্তি আলাদা করতে পারে। নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে দেখিয়েছে, মানুষের বিভিন্ন নেতিবাচক আবেগের মধ্যেও কুকুরের মস্তিষ্ক কিছু পার্থক্য ধরতে পারে।

এর ফলে মানুষ ও কুকুরের সামাজিক যোগাযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণা কুকুরের আচরণ, প্রশিক্ষণ এবং মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হয়তো কুকুরের মালিকদের কাছে খুব নতুন কিছু নয়। প্রিয় কুকুরটির সামনে মন খারাপ করে বসে থাকলে সে যে কাছে এসে চুপচাপ পাশে বসে থাকে, সেই অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এবার বিজ্ঞানও দেখাচ্ছে, মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে কুকুর সত্যিই আমাদের আবেগের কিছুটা আন্দাজ করতে পারে।

সূত্র: সিএনএন