অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা নিয়ে আইনে কী বলা আছে

রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে, কোনো অনুষ্ঠানে, বাজারে কিংবা রেস্তোরাঁয় হঠাৎ কারও ছবি তুলে ফেলেন অনেকেই। কখনো ছবি তোলা হয় নিছক স্মৃতি ধরে রাখার জন্য, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার জন্য, আবার কখনো কোনো ঘটনা নথিবদ্ধ করার প্রয়োজনেও ছবি তোলা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কারও অনুমতি ছাড়া ছবি তুললেই কি তা আইনত অপরাধ?
এর উত্তর এক কথায় হ্যাঁ বা না বলা যায় না। কারণ ছবি তোলার স্থান, উদ্দেশ্য, ছবিতে থাকা ব্যক্তির পরিচয়, ছবিটি কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে ওই ব্যক্তির কী ধরনের ক্ষতি বা হয়রানি হয়েছে, এসব বিষয় আইনি দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও একটু সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের বাড়ি এবং যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে শুধু কারও ছবি তোলাকে সব পরিস্থিতিতে সরাসরি নিষিদ্ধ করে এমন সাধারণ বিধান আছে, এমনটা বলা ঠিক হবে না।
প্রকাশ্যে ছবি তুললেই কি অপরাধ?
ধরা যাক, কোনো পর্যটনকেন্দ্রে একজন ব্যক্তি ছবি তুলছেন। ছবিতে আশপাশের অনেক মানুষও স্বাভাবিকভাবেই চলে এলেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির আলাদা অনুমতি নেওয়া সব সময় বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শুধু এমন কারণে যে ছবিতে কোনো ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে চলে এসেছেন, সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ বলা যায় না। বিশেষ করে কোনো জনসমাগম বা প্রকাশ্য স্থানের সামগ্রিক ছবি তোলার ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
তবে কারও ছবি ইচ্ছাকৃতভাবে তুলে পরে সেটি হয়রানি, অপমান, প্রতারণা বা অন্য কোনো ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
ব্যক্তিগত ছবি আর পরিচিতি তথ্য
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের ছবি ব্যক্তিকে শনাক্ত করার তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ২৬ ধারায় অনুমতি বা আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া অন্য ব্যক্তির পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, বিক্রি, দখল, সরবরাহ বা ব্যবহারের বিষয়ে শাস্তির বিধান ছিল। ওই ধারার ব্যাখ্যায় পরিচিতি তথ্যের মধ্যে ছবিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
তবে সাইবার ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত আইন বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় কোন আইন প্রযোজ্য হবে, তা ঘটনার সময়, উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। এ কারণে পুরোনো কোনো আইনের ধারা দেখিয়ে সব ধরনের ছবি তোলাকে অপরাধ বলা ঠিক নয়।
ছবি তোলা আর ছবি প্রকাশ করা এক বিষয় নয়
অনুমতি ছাড়া ছবি তোলার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ছবিটি পরে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ধরুন, কারও একটি ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া তোলা হলো। এরপর সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলো, কাউকে হেয় করার জন্য ব্যবহার করা হলো কিংবা মিথ্যা তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হলো। তখন বিষয়টি শুধু ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তির সম্মান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিচিতি বা অন্যান্য অধিকারও জড়িত হতে পারে।
বিশেষ করে কারও ছবি বিকৃত করে, ভুয়া পরিচয়ে বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে আইনি ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এ পরিচয় ধারণ ও ডিজিটাল প্রতারণার বিষয়ে পৃথক বিধান ছিল।
ব্যক্তিগত জায়গায় বিষয়টি বেশি সংবেদনশীল
কারও নিজের বাড়ি, ব্যক্তিগত কক্ষ বা এমন কোনো জায়গা যেখানে তিনি স্বাভাবিকভাবে ব্যক্তিগত পরিসর আশা করেন, সেখানে অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা অনেক বেশি গুরুতর বিষয় হতে পারে।
কারও ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ক্যামেরাবন্দী করা এবং পরে সেটি অন্যের কাছে পাঠানো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা শুধু নৈতিকভাবে ভুল নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন আইনি প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ নাগরিকের বাড়ি ও যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার স্বীকার করে।
সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীরা কি অনুমতি ছাড়া ছবি তুলতে পারেন?
সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আলাদা।
কোনো জনস্বার্থের ঘটনা, দুর্ঘটনা, জনসমাবেশ বা প্রকাশ্য স্থানে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নথিবদ্ধ করতে সংবাদকর্মীরা ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারেন। তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কোনো গুরুত্ব নেই।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, সংবেদনশীল পরিস্থিতি বা এমন ছবি যা প্রকাশ করলে ওই ব্যক্তি অযথা ক্ষতিগ্রস্ত বা হয়রানির শিকার হতে পারেন, সেগুলো প্রকাশের আগে সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ জনস্বার্থের সংবাদ আর নিছক কৌতূহল এক বিষয় নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়ার আগে ভাবুন
বর্তমানে ছবি তোলা খুব সহজ। কয়েক সেকেন্ডেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এখানেই ঝুঁকি বেশি।
কোনো বন্ধু, পরিচিত ব্যক্তি বা অপরিচিত মানুষের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার আগে অন্তত কয়েকটি বিষয় ভাবা উচিত-
- ছবিতে থাকা ব্যক্তি কি জানেন যে ছবি তোলা হয়েছে?
- তিনি কি ছবিটি প্রকাশে আপত্তি করতে পারেন?
- ছবিটি কি তার ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল কোনো মুহূর্তের?
- ছবির সঙ্গে এমন কোনো লেখা দেওয়া হচ্ছে কি, যা তাকে বিব্রত করতে পারে?
- ছবিটি প্রকাশ করলে তার সামাজিক বা পেশাগত ক্ষতি হতে পারে কি?
- ছবিটি কি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে?
কোনো সন্দেহ থাকলে আগে অনুমতি নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
শিশুদের ছবি নিয়ে আরও সতর্ক থাকা দরকার
শিশুদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো শিশুর ছবি তোলার বা প্রকাশের আগে তার অভিভাবকের সম্মতি নেওয়া ভালো, বিশেষ করে যদি ছবিটি ব্যক্তিগত জায়গায় তোলা হয় বা বাণিজ্যিক, প্রচারমূলক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজে ব্যবহার করা হয়।
শিশুর পরিচয়, বাসার ঠিকানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে ছবি প্রকাশ করা হলে নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
কারও ছবি তুলতে হলে কী করবেন?
সবচেয়ে সহজ নিয়ম হলো, সম্ভব হলে আগে অনুমতি নিন।
বিশেষ করে আপনি যদি একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ছবি তুলতে চান, তাহলে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেন, ছবি তুলতে পারি কি না।
কেউ না বললে ছবি না তোলাই ভালো।
আর ছবি তোলার অনুমতি থাকলেও সেটি কোথায় প্রকাশ করা হবে, তা আলাদা বিষয়। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ছবি তুলতে সম্মতি দিলেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কেউ অনুমতি ছাড়া আপনার ছবি তুললে কী করবেন?
প্রথমে শান্তভাবে তাকে ছবি মুছে দিতে বলুন। পরিস্থিতি নিরাপদ থাকলে কেন ছবি তোলা হয়েছে, সেটিও জানতে পারেন।
যদি মনে হয় ছবিটি হয়রানি, ভয় দেখানো, প্রতারণা, মানহানি বা অন্য কোনো ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাহলে বিষয়টির প্রমাণ সংরক্ষণ করা জরুরি হতে পারে। যেমন, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, বার্তা বা ছবির পর্দার ছবি রেখে দেওয়া যেতে পারে।
গুরুতর ঘটনায় আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার প্রয়োজন হতে পারে।
তাহলে আসল কথা কী?
অনুমতি ছাড়া কারও ছবি তোলা মানেই প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ নয়। আবার এটাও ঠিক নয় যে প্রকাশ্য জায়গায় থাকলেই যে কেউ ইচ্ছামতো আপনার ছবি তুলতে বা ব্যবহার করতে পারবেন।
আইনি বিষয়টি নির্ভর করে ছবিটি কোথায় তোলা হয়েছে, কেন তোলা হয়েছে, কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে ওই ব্যক্তির কোনো অধিকার বা স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, এসব বিষয়ের ওপর।
বাংলাদেশের সংবিধান গোপনীয়তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধিকার স্বীকার করে। একই সঙ্গে পরিচিতি তথ্য, ডিজিটাল প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন আইনি বিধান রয়েছে।
তাই ছবি তোলার ক্ষেত্রে একটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলাই ভালো: যাকে কেন্দ্র করে ছবি তুলছেন, তার সম্মতি নেওয়ার সুযোগ থাকলে অবশ্যই নিন। আর ছবি তোলার পর সেটি প্রকাশ বা অন্য কাজে ব্যবহারের আগে আরও একবার ভাবুন।
কারণ একটি ছবি তুলতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড, কিন্তু সেই ছবি কারও জীবনে তৈরি করতে পারে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।
সূত্র
বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৪৩
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩
বাংলাদেশে গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে আইন বিশ্লেষণ



