logo

মাত্র ৩০ সেকেন্ডের কয়েকটি অভ্যাস, যা মন ভালো রাখতে পারে

মাত্র ৩০ সেকেন্ডের কয়েকটি অভ্যাস, যা মন ভালো রাখতে পারে
ছবি: বিবিসি বাংলা

মন খারাপ, উদ্বেগ বা কাজের চাপ কমাতে সবসময় দীর্ঘ সময় ধরে মেডিটেশন কিংবা ব্যায়াম করার প্রয়োজন না-ও হতে পারে। দিনের ব্যস্ততার মাঝেও মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কিছু ছোট অনুশীলন মানসিক চাপ সামলাতে এবং নিজের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। এসব ছোট অনুশীলনকে বলা হচ্ছে মাইক্রোপ্র্যাকটিস বা ক্ষুদ্র অনুশীলন।

হাসি, কয়েকটি ধীর শ্বাস, শরীরের হালকা স্ট্রেচিং কিংবা নিজের শরীরে আলতো করে হাত রাখার মতো সহজ কিছু অভ্যাসও এমন মাইক্রোপ্র্যাকটিসের অংশ হতে পারে। এগুলোর কিছু নিয়ে গবেষণায় মানসিক চাপ ও সুস্থতার ওপর সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

লাফটার ইয়োগা

লাফটার ইয়োগার মূল ধারণা হলো কোনো কৌতুক বা মজার ঘটনা ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে হাসা। শুরুতে এই হাসি কৃত্রিম মনে হতে পারে। তবে কিছু সময় পর অনেকের ক্ষেত্রেই হাসি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক ন্যাটালি ভ্যান ডের ওয়ালের সঙ্গে একটি ছোট লাফটার ইয়োগা সেশনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শুরুতে ইচ্ছা করে হাসতে কিছুটা অস্বস্তি হলেও পরে তা স্বাভাবিক হাসিতে পরিণত হতে পারে।

লাফটার ইয়োগা নিয়ে গবেষণায় মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য কিছু উপকারের কথাও উঠে এসেছে। তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

কীভাবে করবেন

প্রথমে তিনবার ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নিন। চাইলে পেটের ওপর হাত রাখতে পারেন। এরপর ইচ্ছা করে হাসা শুরু করুন।

সরাসরি হাসতে অস্বস্তি হলে হালকা শব্দ করে হি হি হি বা হা হা হা বলতে পারেন। ধীরে ধীরে হাসির শব্দ বাড়াতে থাকুন।

প্রায় ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিট এভাবে করার পর আবার গভীর শ্বাস নিন। চাইলে এরপর নিজের ভালো লাগা কোনো বিষয় মনে করতে পারেন।

সঙ্গী থাকলে একে অপরের হাসি অনুকরণ করেও এটি করা যায়।

মাইক্রো ইয়োগা বা ছোট স্ট্রেচিং

দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইলের সামনে বসে থাকলে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে চাপ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক সেকেন্ডের ছোট স্ট্রেচিং বিরতি শরীরকে নড়াচড়া করার সুযোগ দেয়।

মাইক্রোপ্র্যাকটিসের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার মধ্যে ছোট ছোট স্ট্রেচিং বিরতি যুক্ত করা যেতে পারে।

একটি গবেষণায় কর্মীদের কাজের মধ্যে নিয়মিত ছোট বিরতি ও শরীর প্রসারিত করার প্রভাব নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তবে এই ধরনের গবেষণার ফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে এমন নয়।

কীভাবে করবেন

পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুল জড়িয়ে নিন। এবার ধীরে শ্বাস নিতে নিতে হাত দুটি নিচের দিকে প্রসারিত করুন এবং বুক সামান্য ওপরে তুলুন।

শ্বাস ছাড়ার সময় শরীরকে স্বাভাবিকভাবে শিথিল করুন। দুই থেকে তিনটি ধীর শ্বাস নেওয়া পর্যন্ত এই অবস্থান ধরে রাখতে পারেন।

ব্যথা বা অস্বস্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান। নতুন কোনো ব্যায়াম করার আগে শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ধীর ও দীর্ঘ শ্বাস

মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অনেকেরই বেড়ে যায়। তখন সচেতনভাবে ধীরে শ্বাস নেওয়া শরীর ও মনকে কিছুটা শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

ধীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমের সম্পর্ক রয়েছে। এই ব্যবস্থা শরীরকে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের অবস্থায় যেতে সাহায্য করে।

শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমানোর সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় ধীর শ্বাসের সঙ্গে মস্তিষ্কের আলফা ও থিটা তরঙ্গের পরিবর্তনের সম্পর্কও দেখা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনকে সরাসরি সবার মুড ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়।

কীভাবে করবেন

আরাম করে বসুন। চাইলে চোখ বন্ধ করতে পারেন।

প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে একটি ধীর ও গভীর শ্বাস নিন এবং ছাড়ুন। শ্বাস ছাড়ার সময়টি শ্বাস নেওয়ার চেয়ে একটু দীর্ঘ রাখার চেষ্টা করুন।

এভাবে তিনবার শ্বাস নিন। শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সময় বাতাসের চলাচলের অনুভূতির দিকে মনোযোগ দিন।

অফিসে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বৈঠকের আগে, কাজের চাপের মধ্যে বা মন অস্থির লাগলে এই ছোট বিরতিটি নেওয়া যেতে পারে।

নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল স্পর্শ

নিজের শরীরে আলতো করে হাত রাখাও মানসিক চাপ কমানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে। মাইক্রোপ্র্যাকটিস নিয়ে কাজ করা গবেষকদের একটি গবেষণায় নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল চিন্তার সঙ্গে বুক বা পেটে হাত রাখার মতো সহজ স্পর্শের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছিল।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মানসিক চাপের কিছু শারীরবৃত্তীয় সূচকে পরিবর্তন দেখা যায়। বিশেষ করে কর্টিসলের মাত্রায় পরিবর্তনের কথা গবেষণায় উঠে এসেছে।

তবে এ ধরনের ছোট অনুশীলনকে মানসিক চাপ বা কোনো মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

কীভাবে করবেন

একটি বা দুটি হাত বুকের ওপর কিংবা বাহুর ওপরের অংশে রাখুন।

ধীরে একটি গভীর শ্বাস নিন। নিজের প্রতি সদয় কোনো কথা বা চিন্তার দিকে মনোযোগ দিন।

একই সঙ্গে হাতের উষ্ণতা ও হালকা চাপ অনুভব করুন। ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড এভাবে থাকার চেষ্টা করতে পারেন।

প্রতিদিন সবগুলো করার দরকার নেই

মাইক্রোপ্র্যাকটিসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলো করতে সাধারণত বেশি সময় লাগে না। তাই সবগুলো একসঙ্গে করার প্রয়োজন নেই।

কারও কাছে ধীর শ্বাস নেওয়া সহজ মনে হতে পারে। কেউ হয়তো কয়েক সেকেন্ডের স্ট্রেচিংয়ে স্বস্তি পান। আবার কারও কাছে হাসির অনুশীলন বেশি স্বাভাবিক মনে হতে পারে।

ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক ন্যাটালি ভ্যান ডের ওয়ালের পরামর্শ হলো, বিভিন্ন পদ্ধতি চেষ্টা করে নিজের জন্য কোনটি স্বস্তিদায়ক তা খুঁজে নেওয়া।

দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও এমন ছোট বিরতি নেওয়া যায়। যেমন হাঁটার সময় কয়েকবার গভীর শ্বাস নেওয়া, থালা-বাসন ধোয়ার সময় নিজের শরীরের নড়াচড়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার পর কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে শরীর প্রসারিত করা।

তবে মনে রাখতে হবে, মাইক্রোপ্র্যাকটিস মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক একটি অভ্যাস হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্ণতা বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বিকল্প নয়। এসব সমস্যা নিয়মিতভাবে জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেললে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

দিনের ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য ৩০ সেকেন্ড সময় বের করা কঠিন নয়। সেই ছোট বিরতিতে কয়েকবার গভীর শ্বাস নেওয়া, শরীর প্রসারিত করা বা নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়াও দিনের চাপ সামলানোর একটি ছোট পদক্ষেপ হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা