Advertisement

মাঝরাতে হঠাৎ বুকে ব্যথা, প্রথম ১৫ মিনিটে যা করবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
মাঝরাতে হঠাৎ বুকে ব্যথা, প্রথম ১৫ মিনিটে যা করবেন
বুকে ব্যথা মানেই হৃদ্‌রোগের সমস্যা নয়।

রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল বুকের চাপ বা ব্যথায়। প্রথমে মনে হলো হয়তো গ্যাস হয়েছে। একটু পানি খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। তাই আবার শুয়ে পড়লেন।

Advertisement

এই অপেক্ষাটাই কখনো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

বুকে ব্যথা মানেই হৃদ্‌রোগের সমস্যা নয়। গ্যাস, পেশিতে টান, উদ্বেগসহ নানা কারণেও বুক ব্যথা হতে পারে। কিন্তু বাড়িতে বসে সব সময় বোঝা সম্ভব নয় কোনটি সাধারণ আর কোনটি হৃদ্‌রোগের জরুরি সংকেত।

তাই হঠাৎ বুকের ব্যথা বা চাপ শুরু হলে বিশেষ করে রাতে, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও তীব্র বুকের ব্যথা হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

বুকের ব্যথা হলে প্রথমেই কী করবেন?

হঠাৎ বুকের ব্যথা শুরু হলে প্রথম কাজ হলো অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করা।

ব্যথা কমে যাবে কি না, গ্যাসের ওষুধ খেলে ঠিক হবে কি না বা সকালে চিকিৎসকের কাছে যাবেন কি না, এসব ভেবে সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। হৃদ্‌রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি তত কমানোর সুযোগ থাকে।

বিশেষ করে বুকের ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা শরীরের অন্য অংশে ব্যথা থাকলে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।

কোন ধরনের বুকের ব্যথা হৃদ্‌রোগের সংকেত হতে পারে?

হৃদ্‌রোগের ব্যথা সব সময় তীব্র বা অসহনীয় হয় না। কখনো বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী লাগা, চেপে ধরা বা অস্বস্তির মতো অনুভূতিও হতে পারে। ব্যথা বা অস্বস্তি ছড়িয়ে যেতে পারে হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল, পিঠ বা ওপরের পেটেও।

এর সঙ্গে থাকতে পারে-

  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
  • ঠান্ডা ঘাম
  • বমি বমি ভাব বা বমি
  • মাথা ঘোরা
  • অস্বাভাবিক দুর্বলতা
  • হৃদ্‌স্পন্দন দ্রুত বা অস্বাভাবিক লাগা
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি

নারীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। বুকের ব্যথার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে।

১৫ মিনিট অপেক্ষা করা কি ঠিক?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। হৃদ্‌রোগের ব্যথা অনেক সময় ১৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু ১৫ মিনিট পূর্ণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। বুকে নতুন বা অস্বাভাবিক ব্যথা শুরু হলেই জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

অর্থাৎ প্রথম ১৫ মিনিট গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে তারপর চিকিৎসা নিতে হবে। বরং ব্যথা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়াই নিরাপদ।

রোগীকে একা রাখবেন না

বুকে ব্যথা হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে একা রেখে অন্য কোথাও যাওয়াও ঠিক নয়।

তাকে আরামদায়ক অবস্থায় বসতে বা বিশ্রাম নিতে সাহায্য করুন। অযথা হাঁটাহাঁটি বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে দেবেন না।

একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সম্ভব হলে পরিবারের অন্য কাউকে বিষয়টি জানান, যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যায়।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বুকের ব্যথায় নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেয়ে জরুরি চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে হাসপাতালে যাওয়া ভালো। এতে পথে চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ থাকে এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

অ্যাসপিরিন কি খাওয়া যায়?

বুকে ব্যথা হলে অ্যাসপিরিন খাওয়ার পরামর্শ অনেক সময় শোনা যায়। তবে এটি সবার জন্য নিরাপদ নয়।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও আমেরিকান রেড ক্রসের ২০২৪ সালের প্রাথমিক চিকিৎসা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তীব্র বুকের ব্যথায় সচেতন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করার পর ১৬২ থেকে ৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে গিলে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে, যদি তার অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি না থাকে এবং চিকিৎসক আগে থেকে অ্যাসপিরিন না খেতে বলে না থাকেন।

তবে অ্যাসপিরিন খাওয়ানো নিয়ে সামান্যও সন্দেহ থাকলে অপেক্ষা করে জরুরি চিকিৎসাকর্মীদের পরামর্শ নেওয়া যুক্তিযুক্ত।

অর্থাৎ শুধু বুক ব্যথা হয়েছে বলেই নিজের মতো করে কোনো ওষুধ খেয়ে নেওয়া উচিত নয়।

গ্যাস ভেবে বসে থাকবেন না

রাতে বুক ব্যথা হলে অনেকেই প্রথমে গ্যাসের কথা ভাবেন। বিশেষ করে যদি আগে থেকেই অম্লতা বা বদহজমের সমস্যা থাকে।

কিন্তু হৃদ্‌রোগের ব্যথা এবং বদহজমের অস্বস্তি কখনো কখনো কাছাকাছি মনে হতে পারে। তাই নতুন ধরনের বা অস্বাভাবিক বুকের ব্যথাকে শুধু গ্যাস ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।

ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা হাত, ঘাড়, চোয়াল ও পিঠে অস্বস্তি থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া আরও জরুরি।

কখন আরও বেশি সতর্ক হবেন?

যাদের আগে হৃদ্‌রোগের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন করে বুকের ব্যথা হলে বিশেষ সতর্ক থাকা দরকার। তবে শুধু হৃদ্‌রোগের রোগীরাই ঝুঁকিতে থাকেন, এমন নয়।

বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং পরিবারে হৃদ্‌রোগের ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে এসব ঝুঁকি না থাকলেও হঠাৎ বুকের ব্যথা হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।

ব্যথা কমে গেলে কি চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

হ্যাঁ, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

কারণ হৃদ্‌রোগের উপসর্গ সব সময় একটানা থাকে না। কারও ক্ষেত্রে ব্যথা আসে, আবার কমে যায়। তাই ব্যথা কিছুক্ষণ পর নিজে থেকে কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সন্দেহ থাকলেও দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

ঘরে বসে কোন কাজগুলো করবেন না?

বুকে হঠাৎ ব্যথা হলে কয়েকটি ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি।

সকালের জন্য অপেক্ষা করবেন না। রাত বলে চিকিৎসা নেওয়া পিছিয়ে দেবেন না।

নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। সম্ভব হলে জরুরি চিকিৎসাসেবার সহায়তা নিন।

শুধু গ্যাসের ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করবেন না। বুকের ব্যথার প্রকৃত কারণ না জানা পর্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়।

ব্যথা কমে গেলে বিষয়টি ভুলে যাবেন না। বিশেষ করে একই ধরনের ব্যথা আবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অচেতন হয়ে গেলে কী করবেন?

বুকের ব্যথার পর কেউ অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে পরিস্থিতি আরও জরুরি।

এ অবস্থায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করতে হবে এবং প্রশিক্ষণ থাকলে হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা ও বুকে চাপ দেওয়ার ব্যবস্থা শুরু করতে হবে। জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।

মাঝরাতে হঠাৎ বুক ব্যথা হলে সবচেয়ে বড় ভুল হলো এটিকে সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস বা সাধারণ অস্বস্তি ধরে নেওয়া। সব বুকের ব্যথা হৃদ্‌রোগের কারণে হয় না, কিন্তু হৃদ্‌রোগের সম্ভাবনা থাকলে সময় নষ্ট করার সুযোগও নেই।

বুকে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ব্যথা থাকলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ১৫ মিনিট অপেক্ষা নয়, ব্যথা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি কমাতে এবং জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: দ্য ওয়াল