লিভারের চর্বি কমাতে কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন
-98d327-720x405.webp)
ফ্যাটি লিভার এখন অনেকেরই পরিচিত একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। অনেকে মনে করেন, লিভারে চর্বি জমলে কোনো বিশেষ পানীয়, ডিটক্স ড্রিংক বা ঘরোয়া উপায়ে লিভার পরিষ্কার করে ফেললেই সমস্যা দূর হয়ে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার পেছনে অতিরিক্ত ওজন, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন প্রতিরোধ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং অ্যালকোহল গ্রহণের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যালকোহল ছাড়া বিপাকীয় কারণে হওয়া ফ্যাটি লিভারকে বর্তমানে metabolic dysfunction-associated steatotic liver disease বা MASLD বলা হয়।
ভালো খবর হলো, অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে লিভারে জমে থাকা চর্বি কমানো এবং রোগের অগ্রগতি ঠেকানো সম্ভব। বিশেষ করে অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফ্যাটি লিভার কেন হয়?
লিভারে অল্প পরিমাণ চর্বি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করলে সেটিকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।
অ্যালকোহল অতিরিক্ত গ্রহণের কারণে এক ধরনের ফ্যাটি লিভার হতে পারে। আবার যারা অ্যালকোহল পান করেন না, তাদেরও স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি এবং বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
সমস্যা হলো, ফ্যাটি লিভার অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ তৈরি করে না। তাই অনেকেই অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে জানতে পারেন যে তাদের লিভারে চর্বি জমেছে।
ফ্যাটি লিভার কমানোর প্রথম ধাপ ওজন নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত ওজন থাকলে ওজন কমানো ফ্যাটি লিভার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি। গবেষণাভিত্তিক নির্দেশনায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের অন্তত ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি কমতে পারে। ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমানো হলে লিভারের প্রদাহসহ রোগের আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের উন্নতি হতে পারে।
তবে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। ধীরে, নিয়ম মেনে ওজন কমানো বেশি নিরাপদ। হেল্থ লাইনের প্রতিবেদনে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ থেকে ২ পাউন্ড বা প্রায় ০.৫ থেকে ০.৯ কেজি ওজন কমানোর কথা বলা হয়েছে।
ওজন কমানোর লক্ষ্য ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই খুব কম ক্যালরির খাবার বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার মতো কঠোর পদ্ধতি অনুসরণ না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
খাবারে যে পরিবর্তনগুলো আনবেন
ফ্যাটি লিভার কমানোর জন্য খাবারের তালিকা থেকে শুধু একটি বা দুটি খাবার বাদ দিলেই হবে না। পুরো খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে।
অতিরিক্ত চিনি কমান
মিষ্টি, কোমল পানীয়, চিনি দেওয়া চা বা কফি, প্যাকেটজাত মিষ্টি পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি থাকা খাবার যতটা সম্ভব কমানো উচিত।
বিশেষ করে ফ্রুক্টোজ বা অতিরিক্ত সাধারণ চিনি থাকা পানীয় ও খাবার সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোমল পানীয়, মিষ্টি পানীয় এবং অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলের প্রাকৃতিক চিনি আর কোমল পানীয় বা মিষ্টি খাবারে যোগ করা চিনি এক বিষয় নয়। তাই ফ্যাটি লিভার হয়েছে বলে সব ফল বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট কমান
অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া এবং কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবারে এ ধরনের চর্বি বেশি থাকতে পারে।
এর বদলে বাদাম, বীজ, অ্যাভোকাডো, মাছ এবং অন্যান্য অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস বেছে নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে, একই খাবার অতিরিক্ত তেলে ভাজার বদলে কম তেলে রান্না করা এবং মাছ, ডাল, শাকসবজি ও বাদামের মতো খাবার বাড়ানো।
সাদা ভাত ও পরিশোধিত শর্করা পরিমাণমতো খান
ফ্যাটি লিভার হয়েছে বলে ভাত পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নিয়ম নেই। তবে সাদা ভাত, সাদা পাউরুটি ও অন্যান্য পরিশোধিত শর্করা বেশি খাওয়ার বদলে আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউটের (NIDDK) তথ্য অনুযায়ী, কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার, যেমন অধিকাংশ শাকসবজি, কিছু ফল ও পূর্ণ শস্য, রক্তে শর্করার ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে।
তাই ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে সঙ্গে বেশি সবজি, ডাল ও প্রোটিন রাখা যেতে পারে।
শাকসবজি ও আঁশ বাড়ান
শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মসুর ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ খাদ্যতালিকায় রাখুন।
এ ধরনের খাবার শুধু আঁশই দেয় না, বরং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করতে পারে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমানো সহজ হয়।
কোন ধরনের খাবার বেশি রাখতে পারেন?
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় নিচের খাবারগুলো রাখা যেতে পারে-
- বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
- ডাল, মসুর ও ছোলা
- পরিমিত পরিমাণ পূর্ণ শস্য
- মাছ
- চামড়া ছাড়া মুরগি
- ডিম
- বাদাম ও বীজ
- কম চিনি থাকা বা সম্পূর্ণ ফল
- চিনি ছাড়া টক দই
- স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস
হেল্থ লাইনের প্রতিবেদনে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যপদ্ধতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই খাদ্যপদ্ধতিতে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, মাছ এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশি খাবারের সঙ্গেও এই ধারণা মানিয়ে নেওয়া সম্ভব। প্রতিদিনের খাবারে পরিমিত ভাত, বেশি সবজি, ডাল এবং মাছ রাখা যেতে পারে।
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
অ্যালকোহল লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। অ্যালকোহলজনিত ফ্যাটি লিভার থাকলে সম্পূর্ণভাবে অ্যালকোহল বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কারণে হওয়া ফ্যাটি লিভারেও অ্যালকোহল কমানো বা এড়িয়ে চলা ভালো।
যাদের লিভারের রোগ রয়েছে, তাদের জন্য কতটা অ্যালকোহল নিরাপদ তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
শুধু খাবারের পরিবর্তন নয়, শারীরিক পরিশ্রমও ফ্যাটি লিভার কমাতে সাহায্য করতে পারে।
হাঁটা, দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা অন্যান্য অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও করা যেতে পারে। হেল্থ লাইনের প্রতিবেদনে অ্যারোবিক ও রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং দুটিকেই উপকারী বলা হয়েছে।
সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য রাখতে বলা হয়। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন না, তারা অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন।
শুধু ওজন কমলেই কি ফ্যাটি লিভার সেরে যাবে?
সবসময় নয়। ওজন কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ফ্যাটি লিভারের কারণ এবং রোগের মাত্রা ব্যক্তিভেদে আলাদা।
কারও ক্ষেত্রে লিভারে শুধু চর্বি জমতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তন ছাড়া থাকলে কিছু মানুষের রোগ আরও গুরুতর হয়ে সিরোসিস বা লিভারের অন্যান্য জটিলতায় এগিয়ে যেতে পারে।
তাই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে শুধু ঘরোয়া উপায় অনুসরণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ফলোআপ করা উচিত।
ফ্যাটি লিভার পরিষ্কার করতে ডিটক্স পানীয় কি কাজ করে?
ফ্যাটি লিভার দূর করার জন্য বাজারে নানা ধরনের ডিটক্স পানীয়, হারবাল মিশ্রণ ও বিশেষ জুসের প্রচার দেখা যায়। কিন্তু লিভার পরিষ্কার করার জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট পানীয়কে চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
লিভার নিজেই শরীরের বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করে। ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোগের কারণ নিয়ন্ত্রণ করা, ওজন ঠিক রাখা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা।
ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট কি প্রয়োজন?
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লেই নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।

হেল্থ লাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ভিটামিন ই নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এর উপকার ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি গ্রহণ করা ঠিক নয়। একইভাবে অতিরিক্ত ওষুধ বা কিছু সাপ্লিমেন্টও লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ বা হারবাল সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে চিকিৎসককে তা জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যাটি লিভার কমাতে দৈনন্দিন জীবনে যা করতে পারেন
খুব কঠিন কোনো নিয়ম অনুসরণ না করেও কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।
সকালে: চিনি ছাড়া চা বা কফির সঙ্গে ডিম, আটার রুটি বা ওটস রাখতে পারেন।
দুপুরে: ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে মাছ বা মুরগি, ডাল এবং প্রচুর সবজি রাখুন।
বিকেলে: মিষ্টি বিস্কুটের বদলে বাদাম, ছোলা বা একটি ফল খেতে পারেন।
রাতে: ভাত বা রুটির পরিমাণ কমিয়ে সবজি ও প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে পারেন।
ব্যায়াম: প্রতিদিন হাঁটা দিয়ে শুরু করুন। ধীরে ধীরে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন।
ফ্যাটি লিভার কমানোর কোনো জাদুকরি উপায় নেই। লিভারে জমে থাকা চর্বি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা।
অতিরিক্ত চিনি ও ভাজাপোড়া কমানো, স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটের বদলে স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নেওয়া, শাকসবজি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো, পরিমিত কার্বোহাইড্রেট খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা না করা। কারণ অনেক সময় এই রোগের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। পরীক্ষায় ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে রোগের কারণ ও মাত্রা বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র: হেল্থ লাইন



