তীব্র তাপপ্রবাহে সুস্থ থাকবেন যেভাবে, আইসিডিডিআর,বির জরুরি পরামর্শ

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সঠিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি/icddr,b) তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে একটি বিশেষ নির্দেশনাবলি প্রকাশ করেছে। পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ভিন্ন ভিন্ন স্তরে আমাদের শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং এই সময়ে সুস্থ থাকতে আমাদের কী কী করণীয়, তা জানা থাকলে যে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।
পরিবেশের তাপমাত্রা যখন ৩৮° সেলসিয়াস অতিক্রম করে এবং এই অবস্থা যদি টানা দুই দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তখন সেটিকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই তীব্র গরমে মানুষের শরীরে প্রচণ্ড অস্বস্তি, অতিরিক্ত পিপাসা, তীব্র ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে তীব্র পানিশূন্যতা, পেশিতে খিঁচুনি, এমনকি মারাত্মক হিট স্ট্রোক হতে পারে। এ ছাড়া ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও এ সময় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
এই চরম আবহাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ, যেমন রিকশা বা ভ্যান চালক, কৃষক ও নির্মাণ শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এবং যারা চুলার পাশে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও এই সময়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। তীব্র গরমে নিজের বা আশেপাশের মানুষের মধ্যে গায়ের চামড়া অতিরিক্ত লাল হয়ে যাওয়া, তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো, বমি বমি ভাব, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা রং পরিবর্তন হওয়া এবং প্রচণ্ড গরমেও শরীর না ঘামার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে সতর্ক হতে হবে। এছাড়া চোখে ঝাপসা দেখা, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, আচমকা শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া, আচরণে উগ্রতা বা অসংলগ্নতা এবং হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া মারাত্মক বিপদের পূর্বাভাস, যা দেখা মাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
এই উচ্চ ঝুঁকি এড়াতে প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তীব্র রোদ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে এবং বাইরে বের হলে ছাতা বা ক্যাপ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা উচিত। রোদে কাজ করার সময় একটানা কাজ না করে কিছুক্ষণ পর পর ছায়ায় বিশ্রাম নিতে হবে এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে সুতি, ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের আরামদায়ক পোশাক পরিধান করতে হবে। তৃষ্ণা না পেলেও প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করা, নিয়মিত গোসল করা এবং চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দেওয়া শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। খাবারের তালিকায় সহজে হজম হয় এমন হালকা খাবার রাখা উচিত এবং বাসি, অতিরিক্ত তেল ও মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা প্রয়োজন। এই সময়ে রোদের মধ্যে একটানা কঠোর শারীরিক পরিশ্রম পরিহার করার পাশাপাশি পরিবারের শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ সদস্যদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া কর্তব্য।

আইসিডিডিআর,বি’র আবহাওয়ার থার্মোমিটার রিডিং অনুযায়ী আরও তিনটি ভিন্ন তাপমাত্রার স্তর ও সেগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরেছে। প্রথমত, ৩৬° থেকে ৩৮° সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়, যেখানে শরীর অতিরিক্ত ঘেমে যায়, অনেক গরম লাগে এবং দুর্বলতা তৈরি হয়। এ সময় প্রধান ঝুঁকি হলো পানিশূন্যতা ও পানিবাহিত রোগ, যা থেকে বাঁচতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে, কাজের ফাঁকে ছায়ায় বিশ্রাম নিতে হবে এবং ঘরের জানালা খোলা রেখে পরিবেশ খোলামেলা ও ঠান্ডা রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ৩০° থেকে ৩৪° সেলসিয়াস হলো সতর্কতামূলক তাপমাত্রা। এটি তুলনামূলক সহ্য করার মতো গরম হলেও শরীর অনবরত ঘামতে থাকে এবং ক্লান্তি আসে, যার ফলে মৃদু পানিশূন্যতা, চর্মরোগ, পেটের সমস্যা এবং সর্দি-কাশি হতে পারে। এই স্তরেও পর্যাপ্ত পানি পান করা, ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া এবং বাসি বা তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
সর্বশেষ স্তরটি হলো ২০° থেকে ২৯° সেলসিয়াস, যা মানবদেহের জন্য একটি আরামদায়ক আবহাওয়া। তবে এই সময়ে আবহাওয়ায় অতিরিক্ত ধূলিবালি থাকার কারণে সাধারণ সর্দি, কাশি বা জ্বর হতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাইরে বের হলে ধূলিবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত এবং শিশু ও বয়স্কদের যেন হঠাৎ ঠান্ডা না লেগে যায়, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে তাপ্রবাহের তীব্রতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তবে সঠিক সময়ে এই সহজ স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চললে চরম গরমের মধ্যেও নিজেকে এবং পরিবারের সবাইকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখা সম্ভব।
সূত্র: আন্তর্জাতিক ডায়রিয়া রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)
.png)

