সুগন্ধি পণ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ফল, ফুল কিংবা কস্তুরীর মতো নানা সুগন্ধ এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। মোমবাতি, ক্লিনিং প্রোডাক্ট, লোশন, সাবান, লিপস্টিক থেকে শুরু করে পারফিউম পর্যন্ত নানা পণ্যে এসব ঘ্রাণ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই সুগন্ধের আড়ালে ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, সে বিষয়ে সাধারণ ভোক্তারা প্রায় কিছুই জানেন না।
বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ধরনের রাসায়নিক বিভিন্ন পণ্যে সুগন্ধ তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব রাসায়নিকের নাম সাধারণত পণ্যের লেবেলে উল্লেখ থাকে না। কারণ, সুগন্ধির ফর্মুলাকে অনেক কোম্পানি ব্যবসায়িক গোপনীয়তা হিসেবে ধরে রাখে। ফলে উপাদানের তালিকায় শুধু একটি শব্দ লেখা থাকে, ফ্র্যাগরেন্স। অথচ একটি সুগন্ধ তৈরিতে ৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত আলাদা আলাদা রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার থাকতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষকদের মতে, এসব রাসায়নিকের নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর কোনো বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পর্যন্ত জানে না কোন পণ্যে ঠিক কোন সুগন্ধি রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে।
গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
২০১৮ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় ১৪০টি ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, শনাক্ত হওয়া বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছে সুগন্ধি উপাদান থেকে। এসব রাসায়নিকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা, এমনকি ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, সৌন্দর্যচর্চা ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার অনেক পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান ফ্র্যাগরেন্স শব্দটির আড়ালে লুকিয়ে থাকে।
নারীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি
প্রায় সবাই প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে সুগন্ধি রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের শরীরে এসব রাসায়নিকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। কারণ, অনেক নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৬ ধরনের ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য ব্যবহার করেন, যেগুলোর অনেকগুলোতেই সুগন্ধি উপাদান থাকে এবং সেগুলো ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
সাধারণ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে অনেক মানুষ সুগন্ধির কারণে মাথাব্যথা, মাইগ্রেন বা শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যার কথা জানান। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ এমন সমস্যার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
হরমোন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বর্তমানে ব্যবহৃত প্রায় ১ হাজার ২০০ সুগন্ধি রাসায়নিককে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত। আবার কিছু রাসায়নিক মানবদেহের হরমোনের মতো আচরণ করে, যেগুলোকে এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর বলা হয়।
এই ধরনের রাসায়নিক খুব অল্প মাত্রায়ও শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু সিন্থেটিক মস্ক ধরনের রাসায়নিক মানুষের শরীরের টিস্যু ও মায়ের দুধেও পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবহার ও ঝুঁকির বৈষম্য
গবেষকরা আরও বলছেন, কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শ বেশি দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে কিছু চুলের পরিচর্যার পণ্যে হরমোনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন রাসায়নিক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ছোট বয়সে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা ভবিষ্যতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
ভোক্তারা কী করতে পারেন
সুগন্ধি রাসায়নিক এড়িয়ে চলা আধুনিক ভোক্তাদের জন্য সহজ নয়। অনেক পণ্যে আনসেন্টেড বা গন্ধহীন লেখা থাকলেও সেগুলোতে কখনো কখনো অন্যান্য রাসায়নিকের গন্ধ ঢাকতে সামান্য সুগন্ধ ব্যবহার করা হয়। আবার ন্যাচারাল বা অর্গানিক লেখা থাকলেও তাতেও সুগন্ধি উপাদান থাকতে পারে।
তবে সচেতন ভোক্তারা কিছু বিষয় মেনে চলতে পারেন-
- উপাদানের তালিকায় ফ্র্যাগরেন্স বা পারফিউম লেখা পণ্য এড়িয়ে চলা
- সম্ভব হলে গন্ধহীন বা কম উপাদানযুক্ত পণ্য ব্যবহার করা
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পণ্য ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকুন
সুগন্ধি পণ্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেলেও এর মধ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক সম্পর্কে স্বচ্ছতা এখনও সীমিত। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানো, পণ্যের উপাদান সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সুন্দর ঘ্রাণ ভালো লাগা স্বাভাবিক। তবে সেই ঘ্রাণের উৎস কী এবং তা শরীরের জন্য কতটা নিরাপদ, সে বিষয়েও সচেতন থাকা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র : গার্ডিয়ান