Advertisement

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ১১ তথ্য, যা অনেকেই জানেন না

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ১১ তথ্য, যা অনেকেই জানেন না
ছবি : সংগৃহীত

সূর্যগ্রহণের সময় দিনের আলো হঠাৎ ম্লান হয়ে আসে, আকাশে দেখা যায় অদ্ভুত এক দৃশ্য। চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যকে ঢেকে দেয়, আর পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় কয়েক মুহূর্তের জন্য দিনের আকাশও রাতের মতো অন্ধকার হয়ে যায়। এই অসাধারণ দৃশ্য শুধু মানুষের কৌতূহলের বিষয় নয়, বিজ্ঞানীদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সুযোগ।

Advertisement

সূর্যগ্রহণ কীভাবে হয়, কেন সব জায়গা থেকে পূর্ণগ্রহণ দেখা যায় না, প্রাণীদের আচরণে কী পরিবর্তন আসে কিংবা সূর্যের কোন অংশ তখন খালি চোখে দেখা যায়, এসব নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য। আপনার দেওয়া বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে এবং নাসার তথ্য মিলিয়ে জেনে নেওয়া যাক সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ১১টি তথ্য।

সূর্যগ্রহণ আসলে কী?

সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যের আলো পৃথিবীর কোনো অংশে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে আটকে দেয়। চাঁদের ছায়া তখন পৃথিবীর ওপর পড়ে।

চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেললে তাকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ বলা হয়। আর সূর্যের কিছু অংশ ঢাকা পড়লে সেটি আংশিক সূর্যগ্রহণ।

চাঁদ সূর্যের চেয়ে অনেক ছোট, তবু পুরো সূর্যকে ঢেকে দেয় কেন?

এটি সূর্যগ্রহণের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়গুলোর একটি। সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বড়। আবার সূর্য পৃথিবী থেকে চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ দূরে।

এই বিশেষ দূরত্বের কারণে পৃথিবী থেকে দুটিকে আকাশে প্রায় একই আকারের বলে মনে হয়। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চাঁদ সূর্যের পুরো চাকতিকে ঢেকে দিতে পারে।

সব সূর্যগ্রহণ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ নয়

সূর্যগ্রহণ মূলত চার ধরনের হতে পারে: পূর্ণ, আংশিক, বলয়গ্রাস এবং হাইব্রিড।

বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করলেও আকাশে তার আপাত আকার সূর্যের চেয়ে সামান্য ছোট থাকে। ফলে চাঁদের চারপাশে সূর্যের উজ্জ্বল অংশ একটি বলয়ের মতো দেখা যায়। একে বলা হয় রিং অব ফায়ার।

হাইব্রিড গ্রহণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে একই গ্রহণকে কখনো পূর্ণ, আবার কখনো বলয়গ্রাস হিসেবে দেখা যেতে পারে।


পূর্ণগ্রহণের সময় সূর্যের করোনা দেখা যায়

সূর্যের সবচেয়ে বাইরের বায়ুমণ্ডলকে করোনা বলা হয়। এটি অত্যন্ত দুর্বল আলো ছড়ায় বলে স্বাভাবিক সময়ে সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠের পাশে খালি চোখে দেখা যায় না।

কিন্তু পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি ঢেকে দেয়। তখন চারপাশে সাদা আলোর মুকুটের মতো করোনাকে দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের কাছে এটিই পূর্ণ সূর্যগ্রহণের অন্যতম বড় আকর্ষণ।

করোনার তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও বেশি

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সূর্যের বাইরের করোনা তার দৃশ্যমান পৃষ্ঠের চেয়ে অনেক বেশি উত্তপ্ত।

সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠ বা ফটোস্ফিয়ারের তাপমাত্রা প্রায় ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে করোনার তাপমাত্রা প্রায় ২০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

কেন সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল পৃষ্ঠের চেয়ে এত বেশি গরম, সেটি সৌরবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রহস্য।

গ্রহণের সময় হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসে

পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পথে থাকা জায়গাগুলোতে দিনের আলো দ্রুত কমে যায়। আকাশ অনেকটা ভোর বা সন্ধ্যার সময়ের মতো হয়ে যায়।

আলো কমে যাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রাও কিছুটা কমতে পারে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো স্থানে পূর্ণগ্রহণের সময় তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তবে এটি স্থান, আর্দ্রতা ও মেঘের অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

প্রাণীদের আচরণ বদলে যেতে পারে

দিনের মধ্যে হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসায় কিছু প্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। পাখিদের অনেক সময় বাসায় ফিরে যেতে দেখা যায়, আর নিশাচর প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক সময়ের আগেই সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

এ ধরনের আচরণ মূলত আলো ও পরিবেশের আকস্মিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গ্রহণের সময় তারাও দেখা যেতে পারে

পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় আকাশ এতটাই অন্ধকার হয়ে যায় যে উজ্জ্বল কিছু নক্ষত্র ও গ্রহও দেখা যেতে পারে।

তবে কোন নক্ষত্র বা গ্রহ দেখা যাবে, তা নির্ভর করে গ্রহণের সময় আকাশের অবস্থান, সময় এবং ওই মুহূর্তে কোন জ্যোতিষ্ক দিগন্তের ওপরে রয়েছে তার ওপর।


পূর্ণ সূর্যগ্রহণ খুব দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় না

পূর্ণগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের পুরো চাকতি ঢেকে রাখার সময় খুবই সীমিত। একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে পূর্ণগ্রহণ সাধারণত কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না।

উদাহরণ হিসেবে, ২০২৬ সালের ১২ আগস্টের পূর্ণ সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্ণগ্রহণের সময় অধিকাংশ স্থানে দুই মিনিটের কম হবে। কেন্দ্রীয় পথের কিছু জায়গায় এটি আড়াই মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হবে।

পৃথিবীতে সূর্যগ্রহণ নিয়মিতই ঘটে

সূর্যগ্রহণকে বিরল ঘটনা মনে হলেও পৃথিবীতে প্রতিবছর একাধিক সূর্যগ্রহণ ঘটে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে বছরে সাধারণত দুই থেকে তিনটি সূর্যগ্রহণ হতে পারে।

তবে একই জায়গা থেকে বারবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা অত্যন্ত বিরল। কারণ পূর্ণগ্রহণের চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর একটি তুলনামূলক সরু পথে অগ্রসর হয়।

সূর্যগ্রহণ বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

সূর্যগ্রহণ শুধু আকাশ দেখার একটি সুযোগ নয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সূর্যের করোনা ও সৌরবায়ু সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ ঢাকা পড়ে যাওয়ায় করোনার এমন কিছু অংশ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়, যা স্বাভাবিক সময়ে দেখা কঠিন। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে সূর্যগ্রহণ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সূর্যগ্রহণ দেখার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

সূর্যগ্রহণের সময় খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো নিরাপদ নয়। আংশিক সূর্যগ্রহণের সময়ও সাধারণ সানগ্লাস চোখকে নিরাপদ রাখে না। সঠিক মানের সৌরগ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা বা নিরাপদ সৌর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।

শুধু পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পূর্ণতার কয়েক মুহূর্তে, যখন চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল চাকতিকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়, তখনই সরাসরি দেখা নিরাপদ হতে পারে। পূর্ণতার আগে ও পরে আবার চোখের সুরক্ষা ব্যবহার করতে হবে।

সূর্যগ্রহণ আমাদের চোখের সামনে মহাকাশের জ্যামিতির এক অসাধারণ প্রদর্শন। সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী যখন নির্দিষ্ট অবস্থানে চলে আসে, তখন কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো বদলে যায়, দেখা দেয় সূর্যের লুকিয়ে থাকা করোনা, বদলে যেতে পারে প্রাণীদের আচরণ এবং বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে যায় সূর্যের বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণের বিশেষ সুযোগ।

আর আজ, ১২ আগস্ট ২০২৬, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। এর পূর্ণতার পথ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন এবং উত্তর-পশ্চিম পর্তুগালের একটি ছোট অংশের ওপর দিয়ে গেছে। উত্তর গোলার্ধের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আংশিক গ্রহণ দেখা যাচ্ছে।

সূত্র:বিবিসি