logo

কাঁটাচামচে কেন চারটি কাঁটা থাকে, জানলে অবাক হবেন

কাঁটাচামচে কেন চারটি কাঁটা থাকে, জানলে অবাক হবেন
ছবি: এপিকিউরিয়াস

খাবার টেবিলে কাঁটাচামচ খুবই পরিচিত একটি জিনিস। চাউমিন, নুডলস, পাস্তা থেকে শুরু করে মাংস, সবজি বা সালাদ, নানা ধরনের খাবার খেতে এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কখনও কি খেয়াল করেছেন, সাধারণ কাঁটাচামচে বেশির ভাগ সময় চারটি কাঁটা বা টাইন থাকে?

তিনটি নয়, পাঁচটিও নয়, কেন চারটি!

আসলে এই নকশার পেছনে রয়েছে কয়েক শতকের ইতিহাস। কাঁটাচামচ সব সময় এমন ছিল না। প্রথম দিকের খাবার পরিবেশনের কাঁটাচামচে সাধারণত দুটি কাঁটা থাকত। সময়ের সঙ্গে মানুষের খাবারের ধরন, খাওয়ার অভ্যাস এবং টেবিলের শিষ্টাচার বদলেছে। সেই সঙ্গে বদলেছে কাঁটাচামচের নকশাও।

কাঁটাচামচের শুরুটা কেমন ছিল? কাঁটাচামচের মতো দেখতে বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যবহার বহু পুরোনো। প্রাচীন মিশর, গ্রিস, রোম এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে খাবার রান্না বা পরিবেশনের কাজে কাঁটার মতো সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক অর্থে ব্যক্তিগত খাবার খাওয়ার কাঁটাচামচের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক।

ব্যক্তিগত খাবারের কাঁটাচামচের ব্যবহার বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন। ১১শ শতকে বাইজেন্টাইন রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুই কাঁটার কাঁটাচামচ ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে এটি ইতালিতে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে ইউরোপের অনেক জায়গায় কাঁটাচামচ দ্রুত জনপ্রিয় হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ হাত, ছুরি ও চামচ দিয়েই খাবার খেত।

প্রথম দিকে কাঁটা ছিল মাত্র দুটি

প্রথম দিকের ব্যক্তিগত কাঁটাচামচে সাধারণত দুটি লম্বা কাঁটা থাকত। মাংসের টুকরো গেঁথে ধরার জন্য এই নকশা বেশ কার্যকর ছিল।

কিন্তু ছোট বা নরম খাবারের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিত। দুটি কাঁটার মাঝখানের ফাঁক দিয়ে খাবার পড়ে যেতে পারত। ফলে খাবার ধরে রাখা কঠিন হতো।

বিশেষ করে ইউরোপের খাবারের ধরন বদলাতে শুরু করলে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পাস্তার জনপ্রিয়তাও কি ভূমিকা রেখেছিল?

ইতালিতে পাস্তা জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে কাঁটাচামচের ব্যবহারও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাস্তার মতো খাবার ধরতে দুটি কাঁটার চেয়ে বেশি কাঁটা সুবিধাজনক ছিল।

ইতালিতে কাঁটাচামচ ধীরে ধীরে খাবার খাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামে পরিণত হয়। অন্যদিকে ইউরোপের অনেক অংশে এটি তখনও বিলাসী বা অপ্রয়োজনীয় বস্তু হিসেবে বিবেচিত হতো।

ছবি: ইসোরপাবলিক
ছবি: ইসোরপাবলিক

পরে ইউরোপে খাবারের ধরন ও টেবিলের শিষ্টাচারে পরিবর্তন আসার সঙ্গে কাঁটাচামচও আরও ব্যবহারিক হয়ে ওঠে।

তাহলে চারটি কাঁটাই কেন?

চারটি কাঁটা খাবার ধরার ক্ষেত্রে একটি ভালো ভারসাম্য তৈরি করে।

দুটি কাঁটার তুলনায় চারটি কাঁটা খাবারকে বেশি স্থিরভাবে ধরে রাখতে পারে। আবার কাঁটাগুলোর মধ্যে কিছুটা ফাঁক থাকায় খাবার গেঁথে নেওয়া এবং তুলেও নেওয়া সহজ হয়।

মাংসের টুকরো, সবজি, পাস্তা কিংবা অন্য নরম খাবার ধরার ক্ষেত্রেও চার কাঁটার নকশা কার্যকর। কাঁটাচামচের মাথা সামান্য বাঁকানো হলে খাবার ধরে রাখা আরও সহজ হয়।

অর্থাৎ চারটি কাঁটা শুধু দেখতে সুন্দর বলেই জনপ্রিয় হয়নি। ব্যবহারিক সুবিধাও এর জনপ্রিয়তার বড় কারণ।

পাঁচটি কাঁটা দিলে সমস্যা কোথায়?

তাহলে পাঁচটি বা ছয়টি কাঁটা দিয়ে কাঁটাচামচ বানালে তো খাবার আরও ভালোভাবে ধরা যাওয়ার কথা। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়।

কাঁটার সংখ্যা বাড়লে কাঁটাচামচের মাথা চওড়া হতে পারে। কাঁটাগুলো খুব কাছাকাছি হয়ে গেলে খাবার গেঁথে নেওয়ার সুবিধাও কমতে পারে। একই সঙ্গে কাঁটাচামচ ভারী ও কম আরামদায়ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ইতিহাসে পাঁচ কাঁটার নকশার চেষ্টাও হয়েছিল। তবে চার কাঁটার নকশাই ধীরে ধীরে বেশি প্রচলিত হয়ে ওঠে।

চার কাঁটার কাঁটাচামচ কবে জনপ্রিয় হয়?

চার কাঁটার কাঁটাচামচের নির্দিষ্ট একজন আবিষ্কারক বা একটি মাত্র মুহূর্তের কথা বলা কঠিন। নকশাটি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের জেফারসন প্যাটারসন পার্ক ও জাদুঘরের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম চার কাঁটার কাঁটাচামচের একটি নকশা প্রায় ১৭৬০ সালের দিকে দেখা যায়। ১৯শ শতকে এসে চার কাঁটার কাঁটাচামচ প্রায় নিয়মিত নকশায় পরিণত হয়।

অন্যদিকে ইতিহাসভিত্তিক সূত্রগুলো জানায়, ১৭শ শতকের শেষ দিকে ইউরোপে তিন ও চার কাঁটার কাঁটাচামচের ব্যবহারও দেখা যেতে শুরু করে।

অর্থাৎ চার কাঁটার কাঁটাচামচ একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময়ের নকশাগত পরিবর্তন ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এটি জনপ্রিয় হয়েছে।

কাঁটাচামচ একসময় ছিল বিতর্কিত

আজ খাবার টেবিলে কাঁটাচামচ খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু ইউরোপে এর ব্যবহার একসময় অস্বাভাবিক বলে মনে করা হতো।

মধ্যযুগে অনেক মানুষ হাত দিয়েই খাবার খেতেন। কাঁটাচামচ ব্যবহারকে কেউ কেউ অতিরিক্ত বিলাসিতা হিসেবেও দেখতেন। এমনকি ধর্মীয় ব্যক্তিদের মধ্যেও এটি নিয়ে আপত্তি ছিল।

ছবি: হিস্টরি.কম
ছবি: হিস্টরি.কম

তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের খাবারের ধরন ও টেবিলের আচরণ বদলে যায়। ধীরে ধীরে কাঁটাচামচও সাধারণ খাবার টেবিলের অংশ হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের একটি মজার তথ্য হলো, ১৭শ শতকের পর ইউরোপে কাঁটাচামচের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৮শ শতকের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি খাবার টেবিলের পরিচিত সরঞ্জামে পরিণত হয়।

সব কাঁটাচামচে কিন্তু চারটি কাঁটা থাকে না

চার কাঁটার নকশা সাধারণ খাবার কাঁটাচামচে সবচেয়ে বেশি দেখা গেলেও সব ধরনের কাঁটাচামচে একই সংখ্যা থাকে না।

বিশেষ খাবারের জন্য আলাদা ধরনের কাঁটাচামচ রয়েছে। কিছু ডেজার্ট বা বিশেষ খাবারের কাঁটাচামচে তিনটি কাঁটা থাকতে পারে। আবার কিছু বিশেষ ব্যবহারের কাঁটাচামচে দুটি কাঁটাও দেখা যায়।

অর্থাৎ চার কাঁটা হলো সাধারণ টেবিল ফর্কের প্রচলিত নকশা, সব ধরনের কাঁটাচামচের বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়।

কেন কাঁটাচামচের কাঁটাগুলো চিকন?

কাঁটাগুলো চিকন হওয়ারও ব্যবহারিক কারণ আছে। চিকন ও আলাদা কাঁটা খাবারে সহজে ঢুকতে পারে। আবার কাঁটাগুলোর মাঝখানে ফাঁক থাকায় খাবার গেঁথে নেওয়া যায়।

যদি কাঁটাগুলো অনেক বেশি মোটা বা খুব কাছাকাছি হয়, তাহলে খাবার ধরার সুবিধা কমতে পারে।

তাই কাঁটার সংখ্যা, পুরুত্ব, দূরত্ব এবং কাঁটাচামচের মাথার আকৃতি, সবকিছু মিলিয়েই এর ব্যবহারিক নকশা তৈরি হয়েছে।

চার কাঁটার নকশা এত দিন টিকে গেল কেন?

এর সহজ উত্তর হলো, এটি দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য বেশ কার্যকর।

একটি সাধারণ কাঁটাচামচ দিয়ে মাংস গেঁথে ধরা যায়, নরম সবজি তোলা যায়, পাস্তা ধরা যায় এবং ছুরি দিয়ে খাবার কাটার সময় সেটিকে স্থির রাখা যায়। একই সঙ্গে এটি খুব বেশি চওড়া বা ভারীও নয়।

ফলে চার কাঁটার নকশা বহু বছরের ব্যবহারে একটি পরিচিত মানে পরিণত হয়েছে। মেরিল্যান্ডের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহের তথ্যও দেখায় যে ১৮শ শতকের পর এই নকশার বিস্তার বাড়তে থাকে।

খাবার টেবিলে প্রতিদিন ব্যবহার করা কাঁটাচামচের চারটি কাঁটা আসলে দীর্ঘ ইতিহাসের ফল। একসময় যেখানে দুটি কাঁটাই ছিল সাধারণ, সময়ের সঙ্গে মানুষের খাবারের ধরন ও ব্যবহারের প্রয়োজন অনুযায়ী নকশা বদলেছে।

চার কাঁটার কাঁটাচামচ খাবারকে ভালোভাবে ধরে রাখে, মাংস বা সবজি গেঁথে নেওয়া সহজ করে এবং পাস্তার মতো খাবার সামলাতেও সুবিধা দেয়। ফলে ধীরে ধীরে চার কাঁটার নকশাই সাধারণ খাবার কাঁটাচামচের সবচেয়ে পরিচিত রূপ হয়ে উঠেছে।

অর্থাৎ খাবার টেবিলে রাখা এই ছোট্ট সরঞ্জামটির নকশার পেছনেও রয়েছে মানুষের খাবারের অভ্যাস, প্রযুক্তি ও কয়েক শতকের পরিবর্তনের গল্প।

সূত্র: টিভি ৯