logo
Advertisement

ইন্ডাকশন নাকি ইনফ্রারেড, কোন চুলায় রান্না দ্রুত ও বিদ্যুৎ খরচ কম

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ইন্ডাকশন নাকি ইনফ্রারেড, কোন চুলায় রান্না দ্রুত ও বিদ্যুৎ খরচ কম
ইন্ডাকশন আর ইনফ্রারেড চুলা দেখতে প্রায় একই হলেও কাজের পদ্ধতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। ছবি: ওয়ান্ডা শেফ

গ্যাসের দাম বাড়া, রান্নার ঝামেলা কমানো কিংবা ঘরে রান্নার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখার কথা ভাবলে এখন অনেকেই বিদ্যুৎচালিত চুলার দিকে ঝুঁকছেন। বাজারে এখন দুটি চুলা বেশ জনপ্রিয়, ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড।

Advertisement

দুটিকেই বাইরে থেকে প্রায় একই রকম দেখতে। সাধারণত কালো কাচের ওপর রান্নার জায়গা চিহ্নিত করা থাকে। কিন্তু দেখতে একই হলেও ভেতরের প্রযুক্তি একেবারেই আলাদা। ফলে রান্নার গতি, বিদ্যুৎ খরচ, কোন ধরনের হাঁড়ি বা কড়াই ব্যবহার করা যাবে এবং ব্যবহারের পর চুলা কতটা গরম থাকবে, এসব ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে।

তাই নতুন চুলা কেনার আগে শুধু দাম বা দেখতে কেমন, তা না দেখে কোনটি আপনার রান্নার ধরন ও বাসনের সঙ্গে বেশি মানানসই, সেটি জানা জরুরি।

ইন্ডাকশন চুলা কীভাবে কাজ করে?

ইন্ডাকশন চুলার কাচের নিচে থাকে তামার কুণ্ডলী। এটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। সেই চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে উপযুক্ত ধাতুর হাঁড়ি বা কড়াইয়ের তলায় সরাসরি তাপ তৈরি হয়।

অর্থাৎ ইন্ডাকশনে প্রথমে চুলার কাচ গরম হয় না। বরং চুলার ওপর রাখা উপযুক্ত পাত্রের তলাটিই গরম হয়ে যায়। এ কারণে পাত্র সরিয়ে নিলে সাধারণত চুলা নিজে খুব বেশি গরম থাকে না।

এই প্রযুক্তির কারণে ইন্ডাকশনে রান্না তুলনামূলক দ্রুত হয় এবং তাপের অপচয়ও কম হয়।

ইনফ্রারেড চুলা কীভাবে কাজ করে?

ইনফ্রারেড চুলার পদ্ধতি আলাদা। এর কাচের নিচে থাকে একটি তাপ উৎপাদনকারী উপাদান, যা রান্নার সময় প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে। সেই তাপ কাচের মধ্য দিয়ে ওপরে থাকা হাঁড়ি বা কড়াইতে পৌঁছে খাবার রান্না করে।

তাই ইনফ্রারেড চুলার ক্ষেত্রে রান্নার সময় কাচের ওপরের অংশও বেশ গরম হয়ে যায়। চুলা বন্ধ করার পরও কিছু সময় সেখানে তাপ থেকে যায়।

এ কারণে রান্না শেষ হওয়ার পরও ইনফ্রারেড চুলার ওপর হাত দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়।

কোন চুলায় কোন বাসন ব্যবহার করা যায়?

এখানেই দুই চুলার সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

ইন্ডাকশনে এমন পাত্র ব্যবহার করতে হয় যার তলায় চৌম্বকীয় ধাতু রয়েছে। ঢালাই লোহা ও অনেক ধরনের স্টিলের পাত্র ইন্ডাকশনে ব্যবহার করা যায়। সাধারণ অ্যালুমিনিয়াম, কাচ বা মাটির পাত্র সরাসরি ইন্ডাকশনে কাজ করবে না, যদি না তার তলায় চৌম্বকীয় উপাদানের বিশেষ স্তর থাকে।

অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলায় প্রায় যেকোনো সমতল তলার তাপসহনীয় পাত্র ব্যবহার করা যায়। অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, কাচ, সিরামিক কিংবা মাটির কিছু পাত্রও ব্যবহার করা সম্ভব।

তাই বাড়িতে আগে থেকেই নানা ধরনের বাসন থাকলে এবং নতুন করে সব বাসন বদলাতে না চাইলে ইনফ্রারেড চুলা বেশি সুবিধাজনক হতে পারে।

কোনটিতে রান্না দ্রুত হয়?

সাধারণভাবে ইন্ডাকশন চুলায় রান্না দ্রুত হয়। কারণ এতে তাপ সরাসরি পাত্রের তলায় তৈরি হয়। মাঝখানে কাচের পৃষ্ঠকে গরম করার প্রয়োজন পড়ে না।

বিশেষ করে পানি ফুটানো বা দ্রুত কোনো খাবার গরম করার ক্ষেত্রে ইন্ডাকশনের সুবিধা বেশি বোঝা যায়।

ইনফ্রারেড চুলায় প্রথমে তাপ উৎপাদনকারী অংশ গরম হয়, এরপর কাচ এবং তারপর পাত্র গরম হয়। ফলে একই কাজ করতে তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে।

তবে রান্নার সময় চুলার ক্ষমতা, পাত্রের আকার ও উপাদান এবং কী রান্না করা হচ্ছে, এসবের ওপরও ফলাফল নির্ভর করে।

বিদ্যুৎ কোনটিতে কম খরচ হয়?

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত ইন্ডাকশন এগিয়ে। বিভিন্ন তুলনামূলক বিশ্লেষণে ইন্ডাকশনের কার্যকারিতা প্রায় ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইনফ্রারেড চুলার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে কম, কারণ তাপ প্রথমে কাচের পৃষ্ঠে তৈরি হয় এবং সেখান থেকে পাত্রে যায়।

অর্থাৎ একই ধরনের রান্নার ক্ষেত্রে ইন্ডাকশন সাধারণত কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।

তবে বাস্তবে মাসিক বিদ্যুৎ বিল কত হবে, তা শুধু চুলার ধরন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। চুলার ক্ষমতা, প্রতিদিন কতক্ষণ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কী ধরনের রান্না করা হচ্ছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তার দিক থেকে কোনটি ভালো?

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইন্ডাকশনের কিছু সুবিধা রয়েছে।

ইন্ডাকশন চুলায় মূলত পাত্রই গরম হয়। ফলে পাত্রের আশপাশের কাচ তুলনামূলকভাবে কম গরম থাকে। অনেক মডেলে পাত্র সরিয়ে নিলে চুলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলার কাচ সরাসরি গরম হয়। রান্নার সময় এবং রান্না শেষ হওয়ার পরও সেটি বেশ কিছু সময় গরম থাকতে পারে। ফলে অসাবধান হলে হাত পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বাড়িতে ছোট শিশু থাকলে এই বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত।

পরিষ্কার করা কোনটি সহজ?

দুটিই সাধারণ গ্যাসের চুলার তুলনায় পরিষ্কার করা সহজ হতে পারে, কারণ দুটিরই সমতল কাচের পৃষ্ঠ রয়েছে।

তবে ইন্ডাকশনের ক্ষেত্রে কাচের পৃষ্ঠ তুলনামূলকভাবে কম গরম থাকায় খাবার ছলকে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে শক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে পরিষ্কার করাও কিছুটা সহজ হতে পারে।

ইনফ্রারেড চুলায় কাচ অনেক বেশি গরম হওয়ায় রান্নার সময় ঝোল বা খাবার পড়ে গেলে তা পৃষ্ঠে লেগে শুকিয়ে বা পুড়ে যেতে পারে। তাই পরিষ্কার করার আগে চুলা পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

ইন্ডাকশনের অসুবিধা কী?

ইন্ডাকশনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো পাত্রের বিষয়টি।

আপনার রান্নাঘরে থাকা সব হাঁড়ি, কড়াই বা পাতিল ইন্ডাকশনে ব্যবহার করা যাবে না। ফলে ইন্ডাকশন কেনার পর নতুন করে কিছু পাত্র কিনতে হতে পারে।

কোনো পাত্র ইন্ডাকশনে ব্যবহার করা যাবে কি না, তা বোঝার একটি সহজ উপায় হলো পাত্রের তলায় চুম্বক ধরানো। চুম্বক আটকে গেলে সাধারণত সেটি ইন্ডাকশনে ব্যবহারের উপযোগী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে পাত্রের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনাও দেখে নেওয়া ভালো।

ইনফ্রারেডের অসুবিধা কী?

ইনফ্রারেড চুলায় প্রায় সব ধরনের পাত্র ব্যবহার করা গেলেও এর কাচ প্রচণ্ড গরম হয়ে যায়। রান্না শেষ করার পরও সেই তাপ কিছুক্ষণ থাকে।

এ ছাড়া ইন্ডাকশনের তুলনায় তাপ নিয়ন্ত্রণে প্রতিক্রিয়া কিছুটা ধীর হতে পারে এবং একই রান্নায় বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

তবে যাঁদের কাছে বিভিন্ন ধরনের পাত্র রয়েছে এবং নতুন বাসন কেনার ঝামেলা এড়াতে চান, তাঁদের জন্য এই সীমাবদ্ধতা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কোনটি আপনার জন্য ভালো?

আপনি যদি দ্রুত রান্না করতে চান, বিদ্যুৎ সাশ্রয়কে গুরুত্ব দেন এবং ইন্ডাকশন উপযোগী পাত্র ব্যবহার করতে রাজি থাকেন, তাহলে ইন্ডাকশন চুলা ভালো পছন্দ হতে পারে।

বিশেষ করে নিয়মিত রান্না করা পরিবারে, যেখানে গ্যাসের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎচালিত চুলা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে, সেখানে ইন্ডাকশন সুবিধাজনক হতে পারে।

অন্যদিকে, আপনার বাড়িতে অ্যালুমিনিয়াম, মাটির হাঁড়ি, কাচ বা অন্যান্য ধরনের পাত্র বেশি থাকলে এবং সেগুলোই ব্যবহার করতে চাইলে ইনফ্রারেড চুলা বেশি উপযোগী।

সহজভাবে বললে, দ্রুত রান্না, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও তুলনামূলক নিরাপত্তা চাইলে ইন্ডাকশন, আর পাত্রের স্বাধীনতা চাইলে ইনফ্রারেড।

কেনার আগে যে বিষয়গুলো দেখবেন

চুলা কেনার আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা জরুরি।

চুলার ক্ষমতা: বেশি ক্ষমতার চুলা দ্রুত রান্না করতে পারে, তবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরনও বিবেচনা করতে হবে।

পাত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য: ইন্ডাকশন কিনলে আপনার বর্তমান হাঁড়ি-কড়াই ব্যবহার করা যাবে কি না আগে পরীক্ষা করুন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা: অতিরিক্ত গরম হলে বন্ধ হয়ে যাওয়া, পাত্র না থাকলে চালু না হওয়া এবং স্বয়ংক্রিয় বন্ধের মতো সুবিধা আছে কি না দেখুন।

তাপ নিয়ন্ত্রণ: একাধিক তাপমাত্রা বা শক্তির স্তর থাকলে রান্নার ধরন অনুযায়ী তাপ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

কাচের মান: যেহেতু দুই ধরনের চুলাতেই কাচের পৃষ্ঠ থাকে, তাই ভালো মানের তাপসহনীয় কাচ ব্যবহার করা হয়েছে কি না দেখা উচিত।

বিদ্যুৎ সংযোগ: চুলার ক্ষমতা অনুযায়ী ঘরের বৈদ্যুতিক সংযোগ উপযুক্ত কি না নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

ইন্ডাকশন আর ইনফ্রারেড চুলা দেখতে প্রায় একই হলেও কাজের পদ্ধতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইন্ডাকশন সরাসরি পাত্র গরম করে বলে দ্রুত রান্না হয়, বিদ্যুতের ব্যবহার তুলনামূলক কম এবং রান্নার পৃষ্ঠও তুলনামূলকভাবে কম গরম থাকে। তবে এর জন্য উপযুক্ত পাত্র প্রয়োজন।

অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলায় প্রায় সব ধরনের সমতল তলার পাত্র ব্যবহার করা যায়। তাই বাড়িতে থাকা বাসন বদলাতে না চাইলে এটি সুবিধাজনক। তবে এর কাচ রান্নার সময় অনেক গরম হয়ে যায় এবং ইন্ডাকশনের তুলনায় তাপের অপচয় কিছুটা বেশি হতে পারে।

তাই কোনটি সেরা, তার একক উত্তর নেই। আপনার রান্নার অভ্যাস, ঘরে থাকা পাত্র, বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয় এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে ভালো।

সূত্র: টিভি ৯