logo

শীতকালে ঠান্ডা পানিতে গোসল উপকারী নাকি ঝুঁকিপূর্ণ, কী বলছেন চিকিৎসকরা

শীতকালে ঠান্ডা পানিতে গোসল উপকারী নাকি ঝুঁকিপূর্ণ, কী বলছেন চিকিৎসকরা
ছবি: মেন’স হেলথ

শীতকালে ঠান্ডা পানিতে গোসল করা অনেকের কাছেই ভয়ের ব্যাপার। তাই অনেকে গরম পানি দিয়ে গোসল করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সুস্থ থাকার উপায় হিসেবে ঠান্ডা পানিতে গোসল করার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

কেউ মনে করেন, ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে ও মানসিক দৃঢ়তা আসে। আবার কেউ একে অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি বলে মনে করেন। তবে শীতকালে ঠান্ডা পানিতে গোসল করা কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি? নাকি এটি শরীরের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে?

চিকিৎসকদের মতে, ঠান্ডা পানির কিছু সম্ভাব্য উপকারিতা থাকলেও সবার জন্য এটি নিরাপদ না। বিশেষ করে যাদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, তাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

শীতকালে ঠান্ডা পানিতে গোসল নিয়ে প্রচলিত ধারণা ও বাস্তবতা

প্রচণ্ড শীতেও ঠান্ডা পানিতে গোসল করার অভ্যাসকে অনেকে শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা হিসেবে দেখেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি বুঝতে হলে এর উপকারিতা ও ঝুঁকি দুটোই বিবেচনা করা দরকার।

এ বিষয়ে ভারতের ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. অজয় কুমার গুপ্ত কিছু প্রচলিত ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে কি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে?

অনেকের ধারণা, নিয়মিত ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যায়। তবে এই ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এলে শরীরে কিছু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তার মানে যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যায়, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভালো রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা ও প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া শীতকালে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানিতে গোসল করে শরীরকে অসুস্থ করে ফেললে তা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নাও হতে পারে।

যত ঠান্ডা পানি, তত বেশি উপকার

ঠান্ডা পানিতে গোসলের ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, পানি যত বেশি ঠান্ডা হবে, তত বেশি উপকার পাওয়া যাবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা সঠিক না।

হঠাৎ শরীরে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ঢাললে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মাথা ঘোরা, শ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়া বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে হঠাৎ ঠান্ডা পানির সংস্পর্শ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

তাই দীর্ঘ সময় ঠান্ডা পানিতে থাকা বা হঠাৎ শরীরে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ঢেলে দেওয়া উচিত না। ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করতে চাইলে অল্প সময়ের জন্য করা ভালো।

যারা ঠান্ডা পানিতে গোসল এড়িয়ে চলবেন

শীতকালে ঠান্ডা পানিতে গোসল সবার জন্য নিরাপদ না। বিশেষ কিছু শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকেরা এ ধরনের অভ্যাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। যাদের ক্ষেত্রে ঠান্ডা পানিতে গোসল ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে-

  • হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
  • অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ আছে এমন ব্যক্তি।
  • হাঁপানি বা অ্যাজমার রোগী।
  • রেনডস ফেনোমেনন বা ঠান্ডায় হাত-পায়ের রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যাওয়ার সমস্যা আছে এমন ব্যক্তি।
  • আগে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ইতিহাস আছে।
  • তীব্র উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটির সমস্যা আছে।
  • বয়স্ক মানুষ, যাদের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।

এ ধরনের শারীরিক সমস্যা থাকলে ঠান্ডা পানিতে গোসল শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে চাইলে যেসব নিয়ম মানবেন

যারা সুস্থ, তাদেরও ঠান্ডা পানিতে গোসল করার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, হুট করে বরফঠান্ডা পানিতে গোসল না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস করা ভালো।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন-

• প্রথমে স্বাভাবিক বা হালকা গরম পানিতে গোসল করুন।

• গোসলের শেষে ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের জন্য অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা পানি ব্যবহার করতে পারেন।

• হঠাৎ করে পুরো শরীর বরফঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে দেবেন না।

• দিনের শুরুতে গোসল করার অভ্যাস করতে পারেন।

• গোসলের সময় অস্বস্তি, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করুন।

• বুকে ব্যথা অনুভব করলে ঠান্ডা পানির সংস্পর্শ থেকে সরে এসে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

তবে এই সময়সীমা সবার জন্য নিরাপদ এমন না। ব্যক্তিভেদে শারীরিক অবস্থা ও সহনশীলতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শীতকালে ঠান্ডা পানিতে গোসল করার কিছু সম্ভাব্য উপকারিতা থাকলেও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং কিছু মানুষের জন্য এটি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া