logo

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে মা-বাবার যেসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে মা-বাবার যেসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি
ছবি: দ্য অন্নপূর্ণা এক্সপ্রেস

সন্তান কীভাবে ভালো থাকবে তা নিয়ে মা-বাবার চিন্তার শেষ নেই। প্রতিটি মা-বাবাই চান তাদের সন্তান ভালো থাকুক, শৈশব উপভোগ করুক, জীবনে সফল হোক। সন্তানের জন্য ভালো স্কুল, উন্নত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে তারা অনেক পরিশ্রম করেন।

কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও অনেক সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত থেকে যায়। তা হলো সন্তান মানসিকভাবে আসলে কতটা ভালো আছে। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তবে শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা যা অনুভব করে, অনেক সময়ই তা বলে বোঝাতে পারে না।

পরীক্ষায় ভালো ফলাফল, দামি উপহার বা ঘুরতে নিয়ে যাওয়াই একটি শিশুর সুখের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বরং শিশুরা সবচেয়ে বেশি স্বস্তিতে থাকে, যখন তারা পরিবারের মানুষদের কাছে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা পায়। নিজের মনের কথা নির্ভয়ে বলতে পারে, কোনো সমস্যায় পড়লে তারা জানে যে, পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ আছে।

ভারতের প্রখ্যাত শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মাইকেল গুজডার শিশুদের প্রকৃত সুখ ও বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।

ভালো ফলাফল মানেই শিশু ভালো আছে, এমন না

অনেক অভিভাবক সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল, স্কুলের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনেক বেশি চিন্তা করেন। সন্তান পড়াশোনায় ভালো করছে কি না, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে কি না, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কি না, এসবের খোঁজ রাখেন।

কিন্তু ভালো ফলাফল করলেই একটি শিশু মানসিকভাবে ভালো আছে, এমনটা ভাবা উচিত না। বাইরে থেকে হাসিখুশি ও সফল মনে হলেও তার ভেতরে উদ্বেগ, ভয় বা নানা ধরনের মানসিক চাপ থাকতে পারে। তাই শুধু পড়াশোনার খোঁজ না নিয়ে সন্তান মানসিকভাবে কেমন আছে, সেটিও জানার চেষ্টা করুন।

শিশুদের সুখের জন্য কী প্রয়োজন?

শিশুদের সুখী থাকার অর্থ প্রতিদিন আনন্দে মেতে থাকা না। বড় হওয়ার সময় তাদের মন খারাপ, হতাশা, ভয় ও দুশ্চিন্তার মতো অনুভূতির মুখোমুখি হতে হয়। তাদেরকে এসব অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে।

একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবারের কাছে নিজেকে নিরাপদ মনে করা। সবাই তাকে অনেক ভালোবাসে এই অনুভূতিটা খুব জরুরি। সে যেন জানে, ভুল করলেও পরিবারের মানুষ তাকে বুঝবে, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকবে।

এ ছাড়া বন্ধুদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অন্যের প্রত্যাশা পূরণের চাপ ছাড়াই নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগও তার মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানকে শুধু প্রশ্ন না করে তার কথাও শুনুন

অনেক অভিভাবক প্রতিদিন সন্তানকে জিজ্ঞেস করেন, স্কুল কেমন হলো, পড়া শেষ হয়েছে কি না, পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে বা কার সঙ্গে খেলতে গিয়েছে। এসব প্রশ্ন প্রয়োজনীয় হলেও সব সময় সন্তানের মনের অবস্থা বোঝার জন্য যথেষ্ট না।

সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যেন সে নিজের সমস্যা ও অনুভূতির কথা স্বাচ্ছন্দ্যে বলতে পারে। প্রতিটি সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ার দরকার নেই। কখনো কখনো বাচ্চারা শুধু চায়, কেউ তার কথা মন দিয়ে শুনুক।

সন্তান কোনো সমস্যার কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গে বকাঝকা বা উপদেশ দেওয়া শুরু করলে সে পরবর্তী সময়ে সমস্যার কথা জানানো বন্ধ করে দিতে পারে। তাই আগে তার কথা শুনতে হবে, অনুভূতি বুঝতে হবে। দরকার হলে পরেও পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।

সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব দিন

এখনকার সময়ে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বদলে গেছে। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল যোগাযোগ তাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। এ কারণে অভিভাবকদেরও সন্তানদের চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। শুধু নিজের সিদ্ধান্ত সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না।

কোনো বিষয়ে সন্তানের মতামত মা-বাবার সঙ্গে না মিললেও তা মন দিয়ে শোনা উচিত। সে নিজের কথা ঠিকভাবে জানাতে না পারলেও তার কথার গুরুত্ব থাকতে পারে।

এমনকি মা-বাবা কোনো ভুল করলে সেটি স্বীকার করাও জরুরি। এতে সন্তানের কাছে অভিভাবকের সম্মান কমে না। বরং সে শেখে যে ভুল থেকে সবাই শিক্ষা নিতে পারে।

দাদা-দাদি ও নানা-নানির সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ

শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদেরও ভূমিকা আছে। দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে শিশুরা পরিবারের ইতিহাস, পুরোনো দিনের গল্প ও নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

তাদের কাছ থেকে শিশুরা পারিবারিক বন্ধন, দায়িত্ববোধ ও জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে পারে। এই সম্পর্কগুলো শিশুর মধ্যে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও শিশুদের পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া উচিত।

শিশুরা যা দেখে, তা থেকেই শেখে

শিশুদের শুধু উপদেশ দিয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায় না। তারা বড়দের আচরণ দেখেও অনেক কিছু শেখে। পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, মতবিরোধ হলে কীভাবে সমাধান করেন বা কঠিন পরিস্থিতিতে কেমন আচরণ করেন, শিশুরা সেসব লক্ষ্য করে।

তাই সন্তানকে ধৈর্য্য, সততা ও অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা দিতে হলে অভিভাবকদের নিজেদের আচরণেও এসব গুণের চর্চা করতে হবে।

শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় উপহার কী?

একটি শিশুর সুন্দর শৈশবকে শুধু পরীক্ষার ভালো ফলাফল বা দামি উপহারের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় না। বরং সে পরিবারে কতটা ভালোবাসা ও গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তান যেন জানে, জীবনে ব্যর্থ হলেও পরিবারের কাছে তার গুরুত্ব কখনো কমবে না। সে নির্দ্বিধায় নিজের সমস্যা জানাতে পারবে এবং পরিবারের কাছ থেকে সহযোগিতা পাবে।

বড় হওয়ার পর শিশুরা হয়তো ছোটখাটো ঘটনাগুলো মনে রাখবে না। কিন্তু পরিবার থেকে তারা কেমন আচরণ পেয়েছে, তাদের কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়েছে আর বিপদের সময় পাশে কাউকে পেয়েছে কি না, সেই স্মৃতি দীর্ঘদিন থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: Gulf News