logo

চিরতার উপকারিতা

চিরতার উপকারিতা
ছবি: দ্য পাহাড়ি স্টোরি

প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বা হজমশক্তি উন্নত করতে ঘরোয়া টোটকার কথা উঠলেই চিরতার নাম চলে আসে। তেতো স্বাদের চিরতার বহু বছর ধরেই ঘরোয়া টোটকা হিসেবে বেশ কদর রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই ডায়াবেটিস, জ্বর বা লিভারের নানা সমস্যায় চিরতা ব্যবহার হয়ে আসছে। এখনও ঘরোয়া চিকিৎসায় ঔষধি গাছ হিসেবে এর কদর একটুও কমেনি।

চিরতা আসলে কী?

চিরতা হলো এক ধরনের তেতো স্বাদের ভেষজ উদ্ভিদ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় বহু বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। সাধারণত এর ডালপালা ও পাতা গুঁড়া করে, পানিতে ভিজিয়ে, চায়ের সঙ্গে বা ক্যাপসুল আকারে খাওয়া হয়। তেতো স্বাদের কারণে আয়ুর্বেদে একে ‘বিটার টনিক’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ছবি: এক্সপোর্টার্স ইন্ডিয়া
ছবি: এক্সপোর্টার্স ইন্ডিয়া

প্রাচীনকাল থেকেই এটি ঘরোয়া চিকিৎসায় একটি কার্যকরী ঔষধি গাছ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে রক্ত পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে নানা ছোটখাটো রোগ দূর করতে চিরতার বেশ কদর আছে।

চিরতার ১০ স্বাস্থ্য উপকারিতা

চিরতা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি ভেষজ। চিরতার দারুণ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নিন-

রক্ত পরিষ্কার করে: চিরতার সবচেয়ে বড় গুণ হলো এটি রক্তে জমে থাকা দূষিত পদার্থ বা টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। ফলে রক্ত পরিষ্কার থাকে, যার প্রভাব পড়ে পুরো শরীরের স্বাস্থ্যের ওপর।

ত্বক উজ্জ্বল ও ব্রণমুক্ত রাখে: যাদের প্রায়ই ব্রণের সমস্যা বা নানা ধরনের ত্বকের সমস্যা হয়, তাদের জন্য চিরতা বেশ উপকারী। এটি ভেতর থেকে শরীরকে পরিষ্কার করে ত্বককে সুস্থ ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।

ছবি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
ছবি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

পেটের সমস্যা ও কৃমিনাশক: হজমশক্তি বাড়াতে আর পেটের নানা সমস্যা দূর করতে চিরতার পানি খাওয়া বেশ পুরোনো এক ঘরোয়া টোটকা। এ ছাড়া এটি প্রাকৃতিক কৃমিনাশক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

লিভারের সুরক্ষায়: লিভারের প্রদাহ বা যকৃতের নানা সমস্যা কমাতে চিরতার কার্যকারিতা রয়েছে। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতেও সাহায্য করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেকেই চিরতা ভেজানো পানি খেয়ে থাকেন। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী। তবে এর আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি কমাতে সহায়ক: উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হাঁপানির মতো শ্বাসকষ্টের সমস্যা কমাতেও চিরতা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

জ্বর সারাতে আয়ুর্বেদী ওষুধ: আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, নিয়মিত নিয়ম মেনে চিরতার পানি পান করলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে জ্বর দ্রুত নিরাময় হয়।

কিডনি সুরক্ষিত রাখে: চিরতায় থাকা কিছু বিশেষ জৈব উপাদান শরীরের ফ্রি র‍্যাডিকেলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কিডনিকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

ছবি: ফার্মইজি
ছবি: ফার্মইজি

পরজীবীর বিরুদ্ধেও লড়াই করে: চিরতার মধ্যে অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক বা পরজীবিনাশক গুণ আছে। এটি শরীরের ক্ষতিকর কৃমি ও অন্যান্য পরজীবী দূর করতে সাহায্য করে।

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ঘরোয়া টোটকা: ভারত উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় বহু আগে থেকেই ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় চিরতা ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশেষ করে এর কার্যকারিতা বাড়াতে অন্য উপাদানের সঙ্গে এটি ব্যবহার করা হতো।

তবে যাদের বিশেষ কোনো শারীরিক জটিলতা আছে, তারা খাওয়ার আগে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিতে পারেন।

চিরতা কীভাবে খাবেন?

চিরতার স্বাস্থ্য উপকারিতা তো জানলেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কখন, কীভাবে খেলে চিরতার সম্পূর্ণ উপকারিতা পেতে পারেন।

চিরতা মূলত ভেজানো পানি হিসেবে খালি পেটে সেবন করা হয়। রাতে ঘুমানোর আগে ৫ থেকে ১০ গ্রাম চিরতা বা ১ চা চামচ চিরতার গুঁড়া এক গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে সেই পানি ছেঁকে পান করতে পারেন।

চিরতা চা হিসেবেও খেতে পারেন। ১ চা চামচ চিরতার গুঁড়া ২ কাপ পানিতে দিয়ে ১০ থেকে ১২ মিনিট ভালোভাবে ফুটিয়ে নিন। পানি শুকিয়ে যখন অর্ধেক হয়ে যাবে, তখন ছেঁকে হালকা গরম অবস্থায় পান করতে পারেন। তিতা ভাব কমাতে এর সঙ্গে সামান্য মধু বা আদার রস মিশিয়ে নিতে পারেন।

ছবি: ডিপোজিট ফটোস
ছবি: ডিপোজিট ফটোস

বর্তমানে অনেক আয়ুর্বেদিক কোম্পানি চিরতার নির্যাসযুক্ত ক্যাপসুল বাজারজাত করছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা খেতে পারেন। চাইলে চিরতার পাতার রস বের করে তার সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়েও খাওয়া যায়।

চিরতার সুফল পেতে দুটি বিষয় মাথায় রাখবেন-

পরিমাণমতো খাওয়া: প্রতিদিন না খেয়ে সপ্তাহে ৩ থেকে ৫ দিন চিরতার পানি পান করতে পারেন।

বিরতি দিয়ে খাওয়া: আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, টানা ২ থেকে ৩ সপ্তাহ চিরতা খেয়ে কিছুদিন বিরতি দেওয়া ভালো।

প্রতিদিন খাওয়া কি নিরাপদ?

বিশেষজ্ঞরদের মতে, চিরতার অনেক গুণ থাকলেও এটি অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে ক্ষতি করতে পারে। একটানা দীর্ঘকাল প্রতিদিন খাওয়া একেবারেই উচিত না। কিছুদিন খেয়ে মাঝখানে বিরতি দিতে হবে। চিরতা অত্যন্ত ঠান্ডা প্রকৃতির, এর স্বাদ খুব তেতো। আপনার জন্য চিরতা কতটুকু উপকার করতে পারে, এটা আপনার শারীরিক অবস্থার ওপরই নির্ভর করবে।

শরীরের অভ্যন্তরীণ গঠন অনুযায়ী এটি একেক জনের ওপর একেক রকম প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন- যাদের শরীর স্বভাবগতভাবেই ঠান্ডা প্রকৃতির, তারা বেশি চিরতা খেলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া একটানা দীর্ঘদিন অতিরিক্ত খেলে তা লিভারের ওপর বাড়তি চাপ ফেলতে পারে। এ ছাড়া ডয়াবেটিস রোগীরা দীর্ঘদিন খেলেও বিপদ হতে পারে। অতিরিক্ত তেতো হওয়ার কারণে এটি বেশি খেলে বমিভাব বা লো প্রেশার হতে পারে।

ছবি: ফার্মইজি
ছবি: ফার্মইজি

তাই শারীরিক অবস্থা বুঝে বিরতি দিয়ে খেতে পারেন। এক্ষেত্রে একজন পুষ্টি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করলে ভালো হয়।

কাদের জন্য চিরতা ক্ষতিকর হতে পারে?

সব ভেষজ উপাদান সবার জন্য সমানভাবে উপকারী না। কিছু ক্ষেত্রে চিরতা সেবনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি-

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী: গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে চিরতা খাওয়া নিরাপদ কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। তাই এই সময়ে এটি এড়িয়ে চলাই ভালো।

পাকস্থলীতে আলসার থাকলে: আপনার যদি অন্ত্রে বা পাকস্থলীতে আলসার থাকে, তবে চিরতা খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। এটি পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।

অস্ত্রোপচারের আগে: সার্জারি বা অস্ত্রোপচারের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে চিরতা খাওয়া বন্ধ করতে হবে। কারণ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

ডায়াবেটিস থাকলে: এ ছাড়া যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ খাচ্ছেন, তারা চিরতা খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। কারণ ওষুধ আর চিরতা একসঙ্গে মিলে রক্তের শর্করা অতিরিক্ত কমিয়ে দিতে পারে।

পেটের গোলযোগ: অতিরিক্ত তেতো হওয়ার কারণে পেট খারাপ, বমি ভাব বা ডায়রিয়া হতে পারে।

সুস্থতার জন্য আপনার নিজেকেই সচেতন থাকতে হবে। যে কোনো ভেষজ উপাদান নিয়মিত ডায়েটে বা চিকিৎসায় যুক্ত করার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন

সুস্থতার জন্য শুধু একটি জিনিসের ওপর নির্ভর করা বোকামি। চিরতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। যেমন- নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, ভাজাপোড়া ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা, শরীরচর্চা করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমানো।

আপনার শরীর বা স্বাস্থ্য অনুযায়ী চিরতা খাওয়া পুরোপুরি নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো হয়।

তথ্যসূত্র:

Pharmeasy: Chirata: Benefits, Side Effects, Precautions and More

Apollo 24/7: Chirata: Ayurvedic Uses, Benefits And Side Effects

Ask Ayurveda: can we drink chirata daily

India.com: Top 10 Health benefits of Chirata