ভয় বা প্রিয় গান শুনে গায়ে কাঁটা দেয় কেন

ঠান্ডা বাতাস লাগা, ভয় পাওয়া কিংবা প্রিয় কোনো গান শুনে হঠাৎ গায়ে কাঁটা দেওয়া অনেকের কাছেই পরিচিত একটি অনুভূতি। বিষয়টি যতটা সাধারণ, এর পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও ততটাই আকর্ষণীয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, গায়ে কাঁটা দেওয়া শুধু আবেগের প্রকাশ নয়। এটি শরীরের স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়ার ফলে ঘটে।
হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস লাগতেই শরীর শিরশির করে উঠল। কিংবা ভয়, প্রবল উত্তেজনা বা প্রিয় কোনো গান শুনে হঠাৎ গায়ে কাঁটা দিল। এমন অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই হয়েছে। কিন্তু কেন এমন হয়? এটি কি শুধু আবেগের প্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে শরীরের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গায়ে কাঁটা দেওয়া শরীরের একটি স্বাভাবিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া। এটি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের এমন একটি প্রক্রিয়া, যা শরীরকে দ্রুত কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং দুশ্চিন্তার কারণ নয়।
গায়ে কাঁটা দেওয়া আসলে কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গায়ে কাঁটা দেওয়াকে বলা হয় পাইলোইরেকশন। আমাদের শরীরের প্রতিটি লোমকূপের গোড়ায় খুব ছোট একটি পেশি থাকে। কোনো বিশেষ উদ্দীপনা পেলে এই পেশিগুলো সংকুচিত হয়। তখন লোম খাড়া হয়ে যায় এবং ত্বকে ছোট ছোট দানার মতো উঁচু অংশ দেখা যায়। এটিই গায়ে কাঁটা দেওয়া।
কেন গায়ে কাঁটা দেয়?
ঠান্ডা লাগলে
ঠান্ডা আবহাওয়ায় গায়ে কাঁটা দেওয়া সবচেয়ে সাধারণ ঘটনা। শরীরের তাপমাত্রা কমে গেলে মস্তিষ্ক শরীরের তাপ ধরে রাখার চেষ্টা করে। তখন লোমকূপের পেশি সংকুচিত হয়ে লোম খাড়া করে দেয়। মানুষের ক্ষেত্রে এতে খুব বেশি উপকার না হলেও, ঘন লোমওয়ালা প্রাণীদের শরীরে এটি তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
ভয় বা উত্তেজনার সময়
হঠাৎ ভয় পাওয়া, দারুণ উত্তেজিত হওয়া, প্রবল আনন্দ, বিস্ময় বা দুঃখের মতো আবেগও গায়ে কাঁটা দিতে পারে। কারণ এসব অনুভূতির সময় শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটিই ফাইট অর ফ্লাইট প্রতিক্রিয়া নামে পরিচিত। এই অবস্থায় শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে প্রস্তুত হয় এবং তারই অংশ হিসেবে গায়ে কাঁটা দিতে পারে।
প্রিয় গান বা আবেগঘন দৃশ্য দেখলে
কখনো কোনো গান, সিনেমার দৃশ্য, অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য বা বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়লেও গায়ে কাঁটা দিতে পারে। এই অনুভূতিকে ফ্রিসন বলা হয়। এটি মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
প্রাণীদের ক্ষেত্রে কেন এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
বিড়াল, কুকুরসহ অনেক প্রাণী ভয় পেলে বা হুমকির মুখে পড়লে শরীরের লোম ফুলে ওঠে। এতে তারা আকারে কিছুটা বড় দেখায়, যা শত্রুকে ভয় দেখাতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষের গায়ে কাঁটা দেওয়ার বৈশিষ্ট্যও সেই বিবর্তনীয় উত্তরাধিকার। তবে মানুষের শরীরে এখন লোম অনেক কম থাকায় এর ব্যবহারিক প্রয়োজন প্রায় নেই।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
বেশির ভাগ সময় গায়ে কাঁটা দেওয়া স্বাভাবিক। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। যেমন—
- কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বারবার গায়ে কাঁটা দেওয়া
- এর সঙ্গে তীব্র উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণ থাকা
- মৃগীরোগের অন্য লক্ষণও দেখা দেওয়া
- মেরুদণ্ডে আঘাতের পর উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথা ও গায়ে কাঁটা একসঙ্গে হওয়া
- ত্বকে দীর্ঘদিন ধরে খসখসে বা ছোট ছোট দানা থেকে যাওয়া
এ ধরনের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গায়ে কাঁটা দেওয়া আর কেরাটোসিস পিলারিস কি এক?
না, দুটি এক নয়।
গায়ে কাঁটা দেওয়া কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে যায়। এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
অন্যদিকে কেরাটোসিস পিলারিস হলো ত্বকের একটি সাধারণ সমস্যা। এতে লোমকূপে কেরাটিন জমে ছোট ছোট খসখসে দানা তৈরি হয়, যা দীর্ঘদিন থাকতে পারে।
ভয়, উত্তেজনা, আনন্দ, ঠান্ডা আবহাওয়া বা প্রিয় কোনো গান শুনলেও গায়ে কাঁটা দিতে পারে। এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং এর পেছনে রয়েছে স্নায়ুতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে যদি কোনো কারণ ছাড়াই বারবার এমন হয় বা এর সঙ্গে অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
.png)





