পানি খাওয়ার কথা মনে থাকে না, ৭ অভ্যাসেই হতে পারে সমাধান

সারাদিন কাজের ব্যস্ততা। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা বা কফি, তারপর কাজে বসা। কখন যে দুপুর হয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হয়তো এক গ্লাস পানি পান করা হলো। এরপর আবার কাজ, ফোন, যানজট, পড়াশোনা কিংবা সংসারের ব্যস্ততা। সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ মনে পড়ে, আজ তো প্রায় পানিই খাওয়া হয়নি।
অনেকের দৈনন্দিন জীবন এমনই। পানি খাওয়া দরকার, এটা আমরা সবাই জানি। তারপরও নিয়ম করে পানি খাওয়ার কথা মনে থাকে না। বিষয়টি শুধু আলসেমি বা ইচ্ছার অভাব নয়। ব্যস্ততা, অভ্যাসের অভাব এবং তৃষ্ণার সংকেতকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেও এমন হতে পারে।
শরীরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পানি। রক্ত সঞ্চালন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, কোষের স্বাভাবিক কাজ, হজম এবং বর্জ্য বের করে দেওয়ার মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে পানি প্রয়োজন। শরীর থেকে ঘাম, প্রস্রাব ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নিয়মিত পানি বের হয়ে যায়। তাই সেই ঘাটতি পূরণ করাও জরুরি।
তাহলে পানি খাওয়ার কথা বারবার ভুলে যাই কেন? আর কীভাবে এই অভ্যাসটি সহজে ঠিক করা যায়?
তৃষ্ণা পেলেই পানি খাব, এই অভ্যাস কি যথেষ্ট?
তৃষ্ণা শরীরের একটি স্বাভাবিক সংকেত। শরীরে পানির ঘাটতি হলে মস্তিষ্ক আমাদের পানি পান করার তাগিদ দেয়। কিন্তু ব্যস্ত জীবনে শুধু তৃষ্ণার ওপর নির্ভর করলে অনেক সময় নিয়মিত পানি পান করা হয়ে ওঠে না।
কাজে মনোযোগ দেওয়ার সময় আমরা শরীরের ছোটখাটো সংকেত অনেক সময় খেয়াল করি না। দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, মিটিং, পড়াশোনা, বাইরে ছুটে বেড়ানো কিংবা যাতায়াতের ব্যস্ততায় পানি খাওয়ার বিষয়টি সহজেই পিছিয়ে যায়।
এ ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকের তৃষ্ণার অনুভূতিও কমে যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রেও তৃষ্ণা পাওয়ার বিষয়টি সব সময় যথেষ্ট নির্দেশক নাও হতে পারে।
তাই তৃষ্ণা লাগলে পানি পান করা যেমন জরুরি, তেমনি দিনের নিয়মিত কিছু কাজের সঙ্গে পানি খাওয়ার অভ্যাস জুড়ে দেওয়াও কাজে আসতে পারে।
ব্যস্ততার মধ্যে পানি খাওয়ার কথা ভুলে যাই কেন?
পানি খাওয়া এমন একটি কাজ, যার জন্য সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা থাকে না। আমরা নাশতার সময় চা খাই, দুপুরে খাবার খাই, রাতে খাবার খাই। কিন্তু পানি খাওয়ার জন্য আলাদা কোনো সময় না থাকলে সেটি অন্য কাজের ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে।
মুঠোফোনে বার্তা আসে, কাজের চাপ থাকে, কারও সঙ্গে কথা বলতে হয়, কোথাও যেতে হয়। এসব জরুরি কাজের তুলনায় পানি খাওয়াকে মস্তিষ্ক অনেক সময় অপেক্ষা করতে পারে এমন বিষয় হিসেবে ধরে নেয়।
তাই শুধু মনে রাখার চেষ্টা না করে পানি খাওয়ার জন্য ছোট ছোট সংকেত তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
শরীরে পানির ঘাটতি হলে কী হয়?
শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় পানি কমে গেলে পানিশূন্যতা হতে পারে। এর শুরুতে তৃষ্ণা, মাথাব্যথা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্তি এবং প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
পানিশূন্যতা বেশি হলে মাথা ঘোরা, দ্রুত হৃদ্স্পন্দন, বিভ্রান্তি এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যাও হতে পারে।
তবে প্রতিদিন কতটা পানি প্রয়োজন, তার একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা সবার জন্য একই নয়। বয়স, শরীরের আকার, খাবারের ধরন, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া এবং ঘামের পরিমাণের ওপর পানির প্রয়োজন বদলে যায়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায়, যেমন বাংলাদেশের গ্রীষ্মে, ঘামের কারণে শরীর থেকে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই পানি খেতে পারেন
দিনের শুরুতেই পানি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা সহজ একটি উপায়।
ঘুম থেকে উঠে মুখ ধোয়া বা দাঁত ব্রাশ করার পর এক গ্লাস পানি খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন। এতে পানি খাওয়াকে আলাদা কোনো কাজ হিসেবে মনে রাখার প্রয়োজন হবে না। বরং প্রতিদিনের পরিচিত একটি কাজের সঙ্গে সেটি যুক্ত হয়ে যাবে।
তবে ঘুম থেকে উঠেই প্রচুর পরিমাণ পানি একসঙ্গে পান করার প্রয়োজন নেই। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাভাবিক পরিমাণ পানি পান করাই যথেষ্ট।
খাবারের সঙ্গে পানি খাওয়ার অভ্যাস করুন
নাশতা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবারের সঙ্গে পানি রাখুন।
এতে দিনে অন্তত কয়েকবার পানি খাওয়ার একটি স্বাভাবিক সুযোগ তৈরি হবে। চাইলে খাবার শুরু করার আগে বা খাবারের সঙ্গে পানি পান করতে পারেন।
এই পদ্ধতির সুবিধা হলো, পানি খাওয়ার কথা আলাদা করে মনে রাখার প্রয়োজন হয় না। খাবারের সময় এলেই পানি খাওয়ার সংকেত পাওয়া যায়। নিয়মিত করলে এটি দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
পানির বোতল চোখের সামনে রাখুন
পানি খাওয়ার কথা মনে রাখার সবচেয়ে সহজ কৌশলগুলোর একটি হলো পানির বোতলটি এমন জায়গায় রাখা, যেখানে বারবার চোখে পড়ে।
অফিসে কাজ করলে টেবিলের পাশে, পড়ার সময় বইয়ের পাশে, আর গাড়িতে থাকলে হাতের নাগালে পানির বোতল রাখতে পারেন।
কারণ পানি চোখের সামনে থাকলে পান করার সুযোগটিও বারবার মনে পড়ে। আর বোতলটি যদি ব্যাগের ভেতর বা টেবিলের নিচে লুকানো থাকে, তাহলে সেটি মনে পড়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
ফোনে মনে করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন
যারা নিয়মিত পানি খেতে ভুলে যান, তাদের জন্য মুঠোফোনের অনুস্মারক বেশ কাজে আসতে পারে।
সারাদিন ঘন ঘন শব্দ করার মতো অনুস্মারক দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দিনের কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ে মনে করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। যেমন-
- সকালে কাজ শুরু করার সময়
- দুপুরের খাবারের আগে
- বিকেলে কাজের মাঝখানে
- সন্ধ্যায়
- শরীরচর্চার আগে বা পরে
কয়েক দিন এভাবে চলার পর হয়তো আর অনুস্মারকের প্রয়োজন হবে না। পানি খাওয়ার অভ্যাস নিজেই তৈরি হয়ে যেতে পারে।
অন্য অভ্যাসের সঙ্গে পানি খাওয়াকে মিলিয়ে নিন
নতুন কোনো অভ্যাস তৈরি করার সহজ উপায় হলো সেটিকে আগে থেকেই থাকা কোনো অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করা।
যেমন, প্রতিবার চা বা কফি বানানোর আগে এক গ্লাস পানি পান করা যেতে পারে। অথবা বাথরুম থেকে বের হওয়ার পর পানি পান করার অভ্যাস করা যায়।
হাঁটাহাঁটি বা শরীরচর্চা করলে তার আগে ও পরে পানি পান করতে পারেন। এভাবে একটি পরিচিত কাজই পানি খাওয়ার সংকেত হয়ে উঠবে।
একসঙ্গে অনেক পানি পান করার দরকার নেই
সারাদিন পানি খাওয়া হয়নি বুঝতে পেরে সন্ধ্যায় একসঙ্গে অনেকটা পানি পান করা ভালো অভ্যাস নয়।
একবারে অতিরিক্ত পানি পান করলে শরীর প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিতে পারে। তাই দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে পানি পান করা বেশি স্বাভাবিক পদ্ধতি।
অর্থাৎ সকাল থেকে পানি না খেয়ে রাতের দিকে হঠাৎ কয়েক লিটার পানি পান করার বদলে সারা দিনে নিয়মিত পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
শুধু পানি নয়, খাবার থেকেও কিছু পানি পাওয়া যায়
আমরা যে পানি পান করি, তার পাশাপাশি খাবার থেকেও শরীর কিছু পানি পায়।
তরমুজ, শসা, কমলা, পেয়ারা, বিভিন্ন সবজি এবং ঝোল বা স্যুপজাতীয় খাবারে পানির পরিমাণ বেশি। তাই সুষম খাবারও শরীরের মোট পানির চাহিদা পূরণে কিছুটা ভূমিকা রাখে।
তবে পানি খাওয়ার বিকল্প হিসেবে শুধু পানিসমৃদ্ধ খাবারের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
চা-কফি খেলেই কি পানির প্রয়োজন মিটে যায়?
চা ও কফি থেকেও শরীর কিছু তরল পায়। তাই এগুলো পান করলে শরীর একেবারেই পানি পায় না, এমন ধারণা ঠিক নয়।
তবে অতিরিক্ত চা-কফির ওপর নির্ভর না করে সাধারণ পানিকে পানীয়ের প্রধান উৎস হিসেবে রাখা ভালো। বিশেষ করে চিনি মেশানো কোমল পানীয় বা মিষ্টি পানীয়ের বদলে পানি বেছে নেওয়া ভালো অভ্যাস।
গরমে পানি খাওয়ার দিকে বেশি নজর দিন
বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে। বাইরে কাজ করা, দীর্ঘ সময় রোদে থাকা কিংবা শরীরচর্চা করার সময় পানির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
তাই বাইরে বের হওয়ার সময় পানির বোতল সঙ্গে রাখুন। ঘাম বেশি হলে নিয়মিত পানি পান করুন। অসুস্থতা, জ্বর, বমি বা ডায়রিয়ার সময়ও শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে যেতে পারে। তখন পানিশূন্যতা এড়ানো আরও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্রাবের রংও কিছুটা ধারণা দিতে পারে
শরীরে পানির ঘাটতি হলে প্রস্রাব সাধারণত গাঢ় হতে পারে। তাই প্রস্রাবের রং নিজের পানির অভ্যাস সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা দিতে পারে।
তবে শুধু প্রস্রাবের রং দেখে শরীরে কতটা পানি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা উচিত নয়। কোনো ওষুধ, খাবার বা অন্য শারীরিক কারণেও প্রস্রাবের রং বদলাতে পারে।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি খেতেই হবে?
সবার জন্য একই পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয় না। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের প্রয়োজন আর একজন ক্রীড়াবিদ বা প্রচণ্ড গরমে বাইরে কাজ করা মানুষের প্রয়োজন এক নয়।
তাই দিনে ঠিক আট গ্লাস পানি না খেলেই শরীরে পানির ঘাটতি হয়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। মোট তরল গ্রহণের প্রয়োজন ব্যক্তি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলায়।
নিজের তৃষ্ণা, প্রস্রাবের রং, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং অসুস্থতার বিষয়গুলো বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পানি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে আজ থেকেই যা করতে পারেন
খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। আজ থেকেই কয়েকটি ছোট অভ্যাস শুরু করা যায়।
প্রথমত, সকালে উঠে পানি পান করুন।
দ্বিতীয়ত, খাবারের সময় পানির বোতল বা গ্লাস পাশে রাখুন।
তৃতীয়ত, কাজের টেবিলে সব সময় পানি রাখুন।
চতুর্থত, মুঠোফোনে দিনে কয়েকটি অনুস্মারক দিন।
পঞ্চমত, শরীরচর্চা বা বাইরে যাওয়ার সময় পানি সঙ্গে রাখুন।
ষষ্ঠত, একসঙ্গে অনেক পানি না খেয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে পান করুন।
সপ্তমত, পানি খাওয়ার অভ্যাসকে অন্য পরিচিত কাজের সঙ্গে যুক্ত করুন।
এভাবে পানি খাওয়ার বিষয়টি স্মৃতির ওপর নির্ভর না করে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে যাবে।
কখন শুধু পানি পান করলেই হবে না?
যদি প্রচণ্ড পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, দ্রুত হৃদ্স্পন্দন বা শ্বাস-প্রশ্বাস এবং প্রস্রাব একেবারে কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, তাহলে শুধু পানি পান করে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া দরকার।
আবার কিডনি, হৃদ্যন্ত্র বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে কতটা পানি পান করা উচিত, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা ভালো। কিছু রোগে অতিরিক্ত পানি পান করাও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
পানি খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্যস্ততা, কাজের চাপ এবং নিয়মিত অভ্যাসের অভাবেই অনেক সময় সারাদিনে প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করা হয়।
এর সমাধানও খুব কঠিন নয়। পানি খাওয়ার কথা মনে রাখার চেষ্টা করার চেয়ে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা ভালো, যাতে পানি খাওয়ার সুযোগ বারবার সামনে আসে।
পানির বোতল চোখের সামনে রাখা, খাবারের সঙ্গে পানি পান করা, সকালে পানি খাওয়া এবং মুঠোফোনে কয়েকটি অনুস্মারক দেওয়া, এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে কাজে আসতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সারাদিন পানি না খেয়ে শেষে একসঙ্গে অনেক পানি পান করার বদলে নিয়মিতভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী তরল গ্রহণ করা। পানি খাওয়াকে আলাদা কোনো কাজ না বানিয়ে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করাই সবচেয়ে সহজ সমাধান।
সূত্র:মিডিয়াম



