মার্কারি বিষক্রিয়া কী, কীভাবে হয় ও লক্ষণ কী

মার্কারি বা পারদ একটি প্রাকৃতিক ধাতু। অল্প পরিমাণে এটি পরিবেশে স্বাভাবিকভাবেই থাকে। তবে শরীরে অতিরিক্ত মার্কারি জমে গেলে তা বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে। এটি মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মার্কারি বিষক্রিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে বেশি মার্কারি থাকা কিছু মাছ ও সামুদ্রিক খাবার খাওয়া। এ ছাড়া শিল্পকারখানা, ভাঙা পারদযুক্ত থার্মোমিটার বা কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শ থেকেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মার্কারি কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে?
মার্কারি বিভিন্ন উপায়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যেমন-
- বেশি মার্কারি থাকা মাছ বা সামুদ্রিক মাছ নিয়মিত খেলে
- মার্কারির বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে গেলে
- কিছু শিল্প বা গবেষণাগারে কাজের সময় সংস্পর্শে এলে
- কিছু রাসায়নিক বা মার্কারি থাকা পণ্যের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মার্কারির ক্ষতিকর প্রভাব বেশি হতে পারে। গর্ভবতী নারী, গর্ভের শিশু, স্তন্যদানকারী মা, ছোট শিশু, যেসব ব্যক্তি নিয়মিত বেশি মার্কারি থাকা মাছ খান এবং মার্কারি ব্যবহার হয় এমন কোনো জিনিস বা এমন কর্মক্ষেত্রে কর্মরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মার্কারির ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দেয়।
মার্কারি বিষক্রিয়ার লক্ষণ কী?
লক্ষণ নির্ভর করে কী ধরনের মার্কারির সংস্পর্শে এসেছেন এবং কত দিন ধরে হয়েছেন।
সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- হাত কাঁপা
- হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশ অনুভূতি
- পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া
- হাঁটতে ভারসাম্য হারানো
- দৃষ্টিশক্তির সমস্যা
- স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়া
- মাথাব্যথা
- মুখে ধাতব স্বাদ
- বমি বমি ভাব বা বমি
- শ্বাসকষ্ট বা কাশি, যদি মার্কারির বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে শরীরে যায়
কোন মাছে মার্কারি বেশি থাকতে পারে?
সব মাছে সমান পরিমাণ মার্কারি থাকে না। সাধারণত বড় আকারের এবং দীর্ঘজীবী শিকারি মাছের শরীরে মার্কারির পরিমাণ বেশি জমে।
উদাহরণ হিসেবে- সোয়ার্ডফিশ, হাঙর, কিং ম্যাকারেল ও কিছু ধরনের টুনা।
অন্যদিকে ছোট আকারের অনেক মাছ এবং কম মার্কারি থাকা মাছ পরিমিত পরিমাণে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মাছ বাছাইয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
মার্কারি বিষক্রিয়া ধরা পড়ে কীভাবে?
চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, কাজের ধরন এবং সম্ভাব্য সংস্পর্শের ইতিহাস জানার পর প্রয়োজন হলে কিছু পরীক্ষা করতে পারেন।
এর মধ্যে থাকতে পারে রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা
চিকিৎসা কী?
প্রথম ধাপ হলো মার্কারির উৎস থেকে দূরে থাকা।
বিষক্রিয়া গুরুতর হলে হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শরীর থেকে মার্কারি বের করে দিতে বিশেষ ধরনের ওষুধ, যাকে কিলেশন থেরাপি বলা হয়, ব্যবহার করা হয়। তবে এটি শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দেওয়া হয়।
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
- একই ধরনের বড় সামুদ্রিক মাছ বারবার না খেয়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ খান।
- গর্ভাবস্থায় মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
- ভাঙা মার্কারি থার্মোমিটার ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করবেন না।
- মার্কারি ব্যবহৃত কর্মস্থলে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন।
- শিশুদের নাগালের বাইরে মার্কারি থাকা যন্ত্রপাতি রাখুন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন
যদি মার্কারির সংস্পর্শে আসার পর নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
- শ্বাস নিতে কষ্ট
- তীব্র কাশি
- বারবার বমি
- হাত-পা কাঁপা
- দৃষ্টিশক্তি বা ভারসাম্যের সমস্যা
- আচরণ বা স্মৃতিশক্তিতে হঠাৎ পরিবর্তন
মার্কারি বিষক্রিয়া খুব সাধারণ না হলেও এটি একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বেশি মার্কারি থাকা মাছ খাওয়া বা মার্কারির বাষ্পের সংস্পর্শে এলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস, কর্মক্ষেত্রে সতর্কতা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
.png)


