আজ আন্তর্জাতিক কফি দিবস: দেশে বদলাচ্ছে কফির গল্প

সকালের ঘুম কাটাতে এক কাপ গরম কফি, কাজের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে কফির আড্ডা কিংবা বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে কফির কাপে চুমুক, অনেকের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে এই পানীয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে কফিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সংস্কৃতি, ব্যবসা ও বিশাল এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই কফির গল্প এখন আর শুধু ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইথিওপিয়া বা ভিয়েতনামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকাতেও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে কফি চাষ।
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কফি দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কফি দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের আওতায় প্রথমবারের মতো এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হচ্ছে। কফির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং এর সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি সামনে আনাই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কফির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের জীবন
আমরা যখন এক কাপ কফি হাতে নিই, তখন তার পেছনে থাকা দীর্ঘ পথটির কথা অনেক সময় মনে থাকে না। একটি কফির বীজ থেকে গাছ, গাছ থেকে ফল, এরপর ফল সংগ্রহ, বীজ আলাদা করা, শুকানো, প্রক্রিয়াজাত করা, ভাজা এবং সবশেষে কাপে পৌঁছানো পর্যন্ত অনেক মানুষের শ্রম জড়িয়ে থাকে।
আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ কৃষক পরিবার কফি চাষের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কফি শুধু একটি জনপ্রিয় পানীয় নয়, অনেক পরিবারের আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
জাতিসংঘের নতুন সিদ্ধান্তেও কফির এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। কফি উৎপাদন ক্ষুদ্র কৃষক, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশে কফি চাষের গল্প
বাংলাদেশে কফি চাষের কথা শুনলে অনেকের কাছেই বিষয়টি নতুন মনে হতে পারে। তবে দেশের পাহাড়ি এলাকায় কফি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে বেশ কয়েক দশক আগে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পসংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬১ থেকে ১৯৬২ সালের দিকে চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা কফির চারা অন্যান্য ফলের চারার সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় রোপণ করেছিল। তবে তখন কফি বিক্রি ও প্রক্রিয়াজাত করার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষক পরে গাছ কেটে ফেলেন।

অর্থাৎ বাংলাদেশে কফির সম্ভাবনা নতুন নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতির কারণে এই সম্ভাবনা বড় আকারে কাজে লাগানো যায়নি।
কেন পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষের সম্ভাবনা বেশি
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি পরিবেশ কফি চাষের জন্য সম্ভাবনাময় বলে সরকারি গবেষণা ও প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অঞ্চলের পাহাড়ি জমি, মাটি, তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের বৈশিষ্ট্য কফি গাছের জন্য উপযোগী হতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক নথিতে তিন পার্বত্য জেলার মোট জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশে কফি চাষের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটও পাহাড়ি এলাকায় কফির বিভিন্ন জাত ও বংশগত উপাদান নিয়ে গবেষণা করছে। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে রোবাস্তা কফির একাধিক জার্মপ্লাজম নিয়ে গবেষণা হয়েছে। রাঙামাটির রাইখালী এলাকাতেও কফি নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে।
রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে বাড়ছে আগ্রহ
কফি চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গত কয়েক বছরে পাহাড়ি এলাকায় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে কফি চাষের এলাকা বাড়ানো, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০২৫ সালেও রাঙামাটিতে কফি ও কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর, কাপ্তাই ও কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষি কর্মকর্তারা অংশ নেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কার্যালয়ের তালিকাতেও পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় কৃষি ও উদ্যানতত্ত্বভিত্তিক কার্যক্রমের উপস্থিতি দেখা যায়। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় কৃষি সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে।
বাংলাদেশের কফিতে আরবিকা ও রোবাস্তা
বিশ্বে কফির অনেক জাত থাকলেও আরবিকা ও রোবাস্তা সবচেয়ে পরিচিত দুই ধরনের কফি।
বাংলাদেশেও এই দুই ধরনের কফি নিয়ে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে আরবিকা ও রোবাস্তা উভয় ধরনের কফির জার্মপ্লাজম নিয়ে কাজের তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে কোন ধরনের কফি বেশি মানানসই, কোন জাত থেকে ভালো ফলন পাওয়া যেতে পারে এবং কীভাবে গাছের রোগবালাই ও অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলা করা যায়, সেসব বিষয় খুঁজে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি নথিতে বলা হয়েছে, দেশে ইতোমধ্যে রোবাস্তা ধরনের একটি কফির জাত বারি কফি-১ হিসেবে অবমুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরবিকা ধরনের আরেকটি জাত নিয়ে কাজ চলছে।
কফি চাষ শুধু গাছ লাগানোর বিষয় নয়
কফি চাষের সম্ভাবনা থাকলেই যে সহজে বড় উৎপাদন সম্ভব হবে, বিষয়টি এমন নয়। কফি গাছের পরিচর্যা, ছায়া ব্যবস্থাপনা, পানি, সার, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ফল সংগ্রহের সময়ের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণাতেও কফি চাষে সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত ছায়ার প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। কফি গাছে বিভিন্ন পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়েও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
পাহাড়ি জমির ঢাল, মাটিক্ষয় এবং পানির ব্যবস্থাপনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলে ঢালু জমি, ভারী বৃষ্টিতে মাটিক্ষয়, মাটির অম্লতা এবং সেচের সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যা রয়েছে। তাই এই এলাকায় টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সামনে বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশে কফির বাজার মূলত আমদানিনির্ভর। দেশের মানুষ কফি খাওয়ার অভ্যাস বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কফির চাহিদাও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের পাহাড়ি এলাকায় কফি উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কফির চাষ পাহাড়ি কৃষিতে বৈচিত্র্য আনতেও সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে এমন জমিতে যেখানে প্রচলিত কৃষিপদ্ধতিতে সব সময় একই ধরনের ফসল উৎপাদন করা সহজ নয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ফলনশীল ফসল হিসেবে কফি নিয়ে ভাবার সুযোগ রয়েছে।

তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, ভালো মানের চারা সরবরাহ, প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি এবং বাজারের সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ বাড়ানো।
কারণ শুধু কফি উৎপাদন করলেই হবে না। সেই কফিকে ভালোভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে পৌঁছে দিতে পারলেই কৃষক প্রকৃত অর্থে লাভবান হবেন।
এক কাপ কফির পেছনে পাহাড়ের গল্প
একসময় বাংলাদেশের পাহাড়ে কফির চারা লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পর্যাপ্ত বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় সেই উদ্যোগ বড় পরিসরে এগোয়নি। কয়েক দশক পর আবার সেই কফিকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আজ বাংলাদেশের কোনো পাহাড়ি বাগানে যখন কফি গাছে ফল ধরে, তখন সেটি শুধু একটি কৃষিপণ্যের ফলন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের নতুন স্বপ্ন, গবেষকদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষা এবং দেশের কৃষিকে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা।

আন্তর্জাতিক কফি দিবসে তাই কফির কাপের দিকে তাকানোর পাশাপাশি সেই কাপের পেছনে থাকা কৃষকের কথাও মনে করা যায়। বিশ্বের লাখ লাখ কৃষক পরিবারের মতো বাংলাদেশের পাহাড়ি কৃষকরাও যদি কফি চাষ থেকে স্থায়ী আয় ও ভালো বাজার পান, তাহলে দেশের কফির গল্প একদিন আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।